T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সুমন্ত বন্দোপাধ্যায়

মনের আকাশ
মন । এই মন বলতে আমরা কি বুঝি? সাধারণ ভাবে মন বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো- বুদ্ধি এবং বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ যা চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছে এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মন কি? এবং কিভাবে কাজ করে?- সে সম্পর্কে বহু রকমের তথ্য প্রচলিত আছে। যার চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছিল সেই মূলতঃ প্লেটো, এরিস্টটল ও অন্যান্য প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের সময়কাল থেকে ।
এরিস্টটল মনে করতেন -Mind is “the part of the soul by which it knows and understands” (De Anima iii 4, 429a9 – 10; cf .
প্লেটো ছিলেন আদর্শবাদী, তাঁর মতে ধারণাটাই হচ্ছে একমাত্র বাস্তব, অন্য আর কিচ্ছু নয় । বাস্তববাদী প্লেটো মনে করতেন- Ideas do not depend for t his exi st ence on human mind, but they are sel f -exi st ent .
মন-র সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয় । তবে এই ভাবে বলা যেতে পারে, মন হলো এমন কিছু যা নিজের অবস্থা এবং ক্রিয়াগুলি সম্পর্কে সচেতন । মনের স্বরূপ লক্ষণ হলো চেতনা যার থেকে মনকে জড়ো থেকে আলাদা করা
হয়।
সাধারণত মনকে তিনটি ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করা হয়:
প্রথমত মন বলতে চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা-এই মানসিক কাজ গুলোর সমষ্টিগত রূপ বোঝায় । দ্বিতীয়ত-মন বলতে চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা -এই মানসিক কাজগুলো থেকে স্বতন্ত্র দেহাতিরিক্ত এক স্থান, অপরিবর্তিত আধ্যাত্মিক সত্তাকে বোঝায় এবং তৃতীয়ত- মন বলতে বোঝায় এক মূর্ত আধ্যাত্মিক ঐক্যের সম্বন্ধ যা চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়, অথচ যা নিজের স্বাতন্ত্র্য না হারিয়ে এই সমস্ত মানসিক কাজের ভেতর দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে ।
অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়- প্রথমটি হলো মন এর অভিজ্ঞতামূলক মতবাদ, পরেরটা আধ্যাত্মিক-মতবাদ এবং শেষেরটা ভাববাদীদের মতবাদ ।
খ্রিস্টপূর্ব কালীন সময় থেকেই দার্শনিকেরা মনের চরিত্র্য নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন । মানব মন এবং দেহের যে সম্পর্ক তা নিয়ে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশের দার্শনিকরা ভাবিত হয়েছেন এবং তাদের মত প্রকাশ করেছেন । দার্শনিকদের চিন্তাবলী দুটি স্রোতে বিভক্ত: এক দিকে- মন এবং দেহ পৃথক এই দ্বৈততা এবং বিপরীতে – মন এবং দেহ অভিন্ন এই একসূত্রিতা ।
গানের বা কবিতার ‘মন’ শব্দটি আসলেই আমরা দেখি কথক বা গায়ক বুকে হাত দেন । যেনো মন ওখানেই আছে! গান আছে- ‘আমার বুকের মধ্যেখানে, মন যেখানে…।’ বাস্তবিক মন বুকের মধ্যে কেন কোথাও থাকে না । মন বলে আলাদা কিছু নেই। দর্শন ও মনোবিজ্ঞানও তাদের সংজ্ঞা পাল্টে নিয়েছে বিজ্ঞানের পথ ধরে। এখন আমরা জানি মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শারীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে উঠে। মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোন কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয় । মন হলো এমন কিছু যা নিজের অবস্থা এবং ক্রিয়াগুলি সম্পর্কে সচেতন। বুকের মধ্যে হৃদপিন্ড থাকে, হৃদয় বলতে আমরা যে মনটা বুঝি তেমন কিছু থাকে না। হৃদপিন্ড রক্তসঞ্চালন করে। বিশুদ্ধ রক্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় কোষে। হৃদপিন্ড অকেজো হয়ে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত । অবশ্য এখন পেসমেকারও লাগানো হয় । আচ্ছা আমাদের ভালবাসা ছেড়ে গেলে বুকে ধক করে ওঠে কেন? ছ্যাঁকা খাওয়ার আঘাতটা লাগে আসলে মস্তিষ্কে সেই ধাক্কায় সংকট তৈরি হয় রক্তসঞ্চালনে তাই অনুভবটা হয় বুকে । মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত
শারীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মনের ভাব গড়ে উঠে। বাস্তবিক মন বলে আলাদা কিছু নেই । এখন আমরা ‘মনে থাকে’ বলতে বুঝি মগজে থাকে মানে মেমোরি সেলে সংরক্ষিত থাকে। মন মস্তিষ্কের সাথে প্রায় অনুরূপ এবং স্নায়ুসংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপ। মনকে চেতনা প্রবাহের মতো চিত্রিত করা হয় যেখানে অনুভূতি এবং মানসিক চেতনা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় ৷
মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা বদলে গেছে । এখন মনোবিজ্ঞান হল এমন এক বিজ্ঞান যা মানসিক অবস্থার সরাসরি তদন্ত করে । আনন্দ, ভয় বা আবেশের মতো দৃঢ় মানসিক অবস্থার তদন্ত করতে এটি সাধারণত অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করে । মনোবিজ্ঞান এই মানসিক অবস্থাগুলি একে অপরের সাথে আবদ্ধ করে এমন আইনগুলি অনুসন্ধান
করে।
যেহেতু মানসিক প্রক্রিয়া গুলো শারীরিক প্রক্রিয়াগুলোর সাথে অন্তরঙ্গ ভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগুলো মানুষের যে বিবরণ গুলো দেয় তা মনের দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আচ্ছা ভালবাসা চিহ্নটা এমন কেন? আসলে হৃদপিন্ডের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু মনে করা হতো মন থাকে বুকের ভেতর। আসলে সেখানে থাকে হৃদপিন্ড। ভাবা হতো সেখানেই হৃদয় থাকে । আর হৃদয়ের বিনিময়ই হল ভালবাসা। তাই ভালোবাসার চিহ্ন ও হৃদপিন্ড । এটাও ভুল । ভালবাসার বোধটা তৈরি হয় মস্তিষ্কেই ।
কারুর বাহ্যিক অভিব্যক্তি দেখে তার মনের কথা সকলে বুঝতে পারে না । কিন্তু কেরিয়ার এক্সপার্টদের মত হলো, মানুষের বাহ্যিক আচরণ লক্ষ্য করে যাঁরা অন্যের মন পড়তে পারেন, পেশাগত জীবনে তাঁরাই কিন্তু উন্নতি করতে পারেন । এমন কি, মনোবিদদের মতে এই ক্ষমতা আয়ত্ত করতে পারলে জীবনের বহু ঝড়-ঝাপটা অক্লেশে সামলে নেওয়া সম্ভব ।
১৯৬৬ সালের এক ব্রিটিশ টেলিভিশন শো ‘লাই টু মি’ থেকে বিষয়টি প্রথম মনোবিদদের নজর কাড়ে । পরবর্তীকালে এ নিয়ে কাজ করেন দুজন গবেষক – হ্যাগার্ড ও আইজ্যাক্স । মনোবিদের সঙ্গে রোগীর অকথিত ভাব বিনিময়ের সন্ধান করতে গিয়ে তাঁরা আবিষ্কার করেন বিভিন্ন ‘মাইক্রোমোমেন্টারি এক্সপ্রেশন’ গুলো । মানসিক রোগের চিকিৎসা করাতে আসা রোগীদের চলচ্চিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবের বহিঃপ্রকাশ পর্যালোচনা করার পর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় অসতর্ক ভঙ্গিমা পরীক্ষা করলে সংশ্লিষ্ট মানুষের অন্তরের ভাবনার নাগাল পাওয়া সম্ভব ।
বলে রাখা ভালো এই ‘মাইক্রোমোমেন্টারি এক্সপ্রেশনস’ শব্দবন্ধনীটি আসলে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী পল একম্যানের মস্তিষ্কপ্রসূত । মিথ্যা ভাষণ নিয়ে সুদীর্ঘ গবেষণার পর ‘টেলিং লাইস’ বইয়ে এই বিষয়ে নিজস্ব বিবৃতি লিপিবদ্ধ করেছিলেন তিনি ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মুখের ভঙ্গিমাগুলো অনেক সময়ই আড়াল করা গেলেও সূক্ষ্ম ভঙ্গিমাগুলোকে লুকোনো মুশকিল । আর সাধারণ চোখে ধরা না পড়া সেই সমস্ত অভিব্যক্তি নজর করলে মানুষের মনের মধ্যে পুষে রাখা আনন্দ, ভালোবাসা, রাগ, দুঃখ, ঘৃণা, ভয় এবং বিস্ময় বুঝতে পারা কঠিন নয়। তবে এর জন্য সেকেন্ডের ১/১০ বা ১/৩০ ভাগ সময় খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন । এই বিদ্যা আয়ত্ত করার প্রাথমিক কিছু টিপস্ দেখে নেওয়া যাক-
আনন্দ: ঠোঁটে খেলে যায় চকিত হাসির রেখা। মুখের এই অংশে প্রধান জাইগোম্যাটিক পেশি ঠোঁটের দুই প্রান্তে টান ধরিয়ে উপর দিকে ঠেলে তোলে । চোখের পাশের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়ায় চামড়া কুঁচকে যায়। চোখের নীচের পাতা ফুলে ওঠে ।
ভালোবাসা: মনে প্রেমের ভাব উৎপন্ন হলে মুখে পরিতৃপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঠোঁটের দুই প্রান্ত শক্ত হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায় । নীচের ঠোঁট শক্ত হয়ে যায়। মাথা অল্প ঝুঁকে পড়ে ।
ভয়: ভ্রূ-এর পেশি সঙ্কোচনের ফলে তার দৈর্ঘ্য দৃশ্যত হ্রাস পায় । চোখের ওপরের পাতা খুলে যায়, কুঁকড়ে যায় । ঠোঁটের দুই প্রান্ত বিস্ফারিত হয়।
নীচের পাতা
ক্ষোভ: এই ভাব হলে ভ্রু যুগল তুলনামূলক ভাবে গর্তে ঢুকে যায় । পেশি শক্ত হয়ে গিয়ে চোখের নীচের পাতা এবং নাকের উপরিভাগ কুঁচকে যায় ।
লজ্জা: লজ্জা পেলে মানুষ সরাসরি কারও চোখের দিকে তাকাতে পারে না । দৃষ্টি নিম্নগামী হয় । নীচের ঠোঁট চেপে বসে । উপরের ঠোঁটও অনড় হয়ে পড়ে ।
বিস্ময়: অবাক হলে মানুষের ভ্রূ যুগল ধনুকের মতো বেঁকে যায় । ঠোঁট দু’টির মধ্যে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে ।
ফ্লার্টিং: এই অবস্থায় মুখে হাসি খেলে যাওয়ার পাশাপাশি মাথাও একদিকে কাত হয়ে যায়। দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ থাকে । ঠোঁটের দুই প্রান্ত চওড়া হয় । হনু উঁচু হয়ে ওঠে ।
বিনয়: হাসিতে খানিক কৃত্রিমতা লক্ষ্য করা যায়। তবে চোখের আশেপাশে কোনও পরিবর্তন হয় না । ঠোঁটের প্রান্ত দু’টি পেশি সঙ্কোচনের ফলে ওপর দিকে ওঠার চেষ্টা করে।
‘মন’ নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সদগুরু বলছেন- ‘মন’ হল একটা দারুণ যন্ত্র । কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বেশির ভাগ মানুষই এর অসীম ক্ষমতা ভাঙিয়ে লাভবান হওয়ার বদলে দুর্ভোগই পোহান । সদগুরু এখানে দেখাচ্ছেন, কীভাবে যোগের সাহায্যে মনের শ্রেষ্ঠ ফল পাওয়া সম্ভব। তাঁর মতে – যোগ প্রক্রিয়ার পুরোটাই হল, মনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যাওয়া। আসলে যতক্ষণ আপনি মনের সীমার মধ্যে আছেন, আপনার অতীতই আপনাকে শাসন করে। কেননা মন হল স্রেফ কিছু অতীতের সঞ্চয় । এখন আপনি যদি জীবনকে শুধু মনের চশমা দিয়েই দেখেন, তাহলে আপনার ভবিষ্যৎকে তো হুবহু আপনি অতীতের মতোই গড়বেন – না কিছু বেশি, না কিছু কম, এই পৃথিবীই কি তার যথেষ্ট প্রমাণ নয় ? কেননা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা অমনই নানা কিছু ভাঙিয়ে আমরা কী কী সুবিধা পেয়েছি, তাতে কিস্যু যায়-আসে না। আদতে আমরা কি ইতিহাসের একই দৃশ্যকেই বারবার ঘটিয়ে যাচ্ছি না? আপনারা যদি নিজেদের জীবনকে একটু খুঁটিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন সেখানেও একই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। কেননা ওই যে, যতক্ষণ মনের চশমা দিয়ে দেখবেন, ততক্ষণই তো পুরোনো অভিজ্ঞতার হিসেবেই আপনি চলতে থাকবেন । অতীতকে আসলে আপনারা শুধু মনের ভিতরেই বয়ে বেড়ান । মন সক্রিয় থাকা মানেই অতীতেরও বেঁচে থাকা। ধরুন, মন যদি এই মুহূর্তেই কাজ বন্ধ করে দেয়, তখন আপনাদের অতীত কি আর থাকবে ? দেখুন, এখানে কোনও অতীত নেই, আছে শুধুই বর্তমান এবং সেটাই একমাত্র বাস্তব । কিন্তু তবু অতীত রয়ে গেছে আমাদের মনের মাঝখানে । অথবা অন্যভাবে বলা যায়, মনই হল কর্ম। তাই মনকে যদি আপনি শ্রেষ্ঠ করে তুলতে পারেন, তাহলে একই সঙ্গে কর্মের বন্ধনকেও অনেক উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে পারবেন । আর যদি ভাবেন, ওগুলোকে একে একে উন্নত করবেন, তবে তার জন্য দশ লক্ষ বছরও লেগে যেতে পারে। কেননা ওই সমাধান প্রক্রিয়া চলার মধ্যেও তো আপনার নতুন নতুন কর্মের তালিকা বাড়তেই থাকবে ।
অর্থাৎ আপনার কর্মের পুরনো সঞ্চয় মোটেই কোনও সমস্যা নয় । আপনাকে শুধু শিখতে হবে, কীভাবে নতুন সঞ্চয় গড়া আটকানো যায় । ওটাই হল আসল ব্যাপার। পুরনো সঞ্চয় একদিন নিজেই খসে যাবে, ওটা নিয়ে তেমন কিছুই
করতে হবে না । কিন্তু মূল ব্যাপার হল, আপনাকে শিখতে হবে, নতুন সঞ্চয় না গড়েও কীভাবে থাকা যায় । এটা করতে পারলে পুরনো সঞ্চয়কে ত্যাগ করা ভীষণ সহজ।
তিনি বলছেন মনকে যদি অতিক্রম করতে পারেন, তবেই কর্মের বন্ধনকেও পুরোপুরি কাটাতে পারবেন । তার জন্য আপনাদের কোনও সমাধান খুঁজতে হবে না, কারণ নিজের কর্মের সঙ্গে যুঝতে যাওয়া মানেই তো কোনও অস্তিত্বহীনের নাগাল খোঁজা । এটাই তো মনের একটা ফাঁদ। অতীতের কোনও অস্তিত্ব নেই, কিন্তু আপনার কারবার তবু সেই অস্তিত্বহীনের সঙ্গেই। তাকে নিয়ে এমনভাবে চলেছেন, যেন ওটাই বাস্তব । আসলে এর সবটাই হল বিভ্রম আর মন হল এরই সূত্রপাত । তাই মনকে যদি একবার এর ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে একই সঙ্গে সব কিছুরই উন্নত সাধন সম্ভব ।
যদি মনের যাবতীয় পরিবর্তন আর পরিবেশনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন, একমাত্র তখনই আপনারা এই মনকে যেভাবে ও যেদিকে খুশি চালাতে পারবেন । পারবেন জীবনের ক্ষেত্রে তার প্রচণ্ডতম প্রভাবটিকে ব্যবহার করতে । কিন্তু যদি এই মনের মধ্যেই রয়ে যান, মনের প্রকৃতিটিকে তবে কখনোই আর বুঝতে পারবেন না ।
ঠিক এই কথাটাই এক বৈজ্ঞানিক জাফরি আল-ক্বাদরী,যুক্তরাষ্ট্র (’কিভাবে মানুষের মন বদলাবেন’প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২০, ১০: ৩০), এই কথাটাই বোঝাতে গিয়ে বললেন- ‘যদি আপনি আমাকে বছর দুয়েক আগে প্রশ্ন করতেন, , কীভাবে কারও মতামতকে প্রভাবিত করে নিজের অনুকূলে যায়, আমি হয়তো আপনাকে একদম একটা ভিন্ন উত্তর দিতাম । একজন বিজ্ঞানী হিসেবে হয়তো আমি আপনাকে বলতাম যে বিষয়ভিত্তিক তথ্য-উপায় ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপরে নির্ভর করতে । শুধু প্রমাণযোগ্য এবং পরীক্ষাযোগ্য সত্যের ওপরে নিজের মতামতের একটা শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তারপর যাঁর মন বদলাতে চান, তাঁকে সেই নির্ভুল সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান । যাবে কোথায়? মানতেই হবে যে সে ভুল বকছে। কিন্তু ভুল, একদম ভুল সেই প্ৰক্ৰিয়া!’
প্রতিপক্ষকে সত্যের ডামাডোলে চাপা দিয়ে, সব কুসংস্কার আর ভুল ধারণাকে চিড়ে চ্যাপ্টা করার এই মানসিকতা বিজ্ঞানমনস্ক বা যুক্তিবাদী তরুণদের মধ্যে খুব দেখা যায় । বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যে সত্য, মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে কোটি ডলার খরচের যুদ্ধ যে আসলে কাজ করছে না, বিবর্তন যে চোখের সামনে অহরহ ঘটছে, ঝুঁকিহীনভাবে ব্যবসা যে অলাভজনক, এ ধরনের সত্যগুলো যারা বিশ্বাস করে না, তাদের কিন্তু যতই তথ্য–উপাত্ত দিয়ে যুক্তি বোঝানো হোক, তারা তা মানবেই না, বরং নিজের মতামতে আরও গেঁড়ে বসবে।
সত্য যত কঠিনই হোক না কেন, মানুষের মন যেন তার চেয়েও বেশি কঠিন । মানুষের চিন্তার ধারা যত না সত্যকে অনুসরণ করে, তার চেয়ে বেশি অনুসরণ করে তার অভিজ্ঞতার ছায়াকে, আর তার সন্দেহবাতিক পূর্বধারণাকে । আপনি যতই নির্ভরযোগ্য তথ্য কিংবা পরীক্ষালব্ধ ফলাফল নিয়ে আসুন না কেন, একবার যে মনস্থির করে ফেলেছে এক বিষয়ে, তাকে পুরোপুরি ভুল স্বীকার করানো কিন্তু সহজ নয় । কেন নয়?
কারণ, নতুন তথ্য পেলে আমরা সেটাকে গ্রহণ করি যদি সেটা আমাদের ধারণার সঙ্গে মিলে যায় আর সেটাকে বর্জন করি, যদি তা না হয় । এই প্রক্রিয়াটা অবচেতন মনেই ঘটে, এমনকি খুব খোলা মনের মুক্তবুদ্ধির মানুষও এই দোষ থেকে মুক্ত নয় । অসুবিধাজনক সত্যকে আমরা কম গুরুত্ব দিতে থাকি আর সুবিধাজনক মিথ্যাকে আমরা প্রশ্রয় দিতে থাকি এই আশা নিয়ে যে তা যেন সত্য হয় । এই কারণেই দেখা যায় বড় বড় কর্পোরেট অফিসে মিডিওকার কর্মীরা চাকরি হারান না । কারণ, তাঁকে প্রাথমিকভাবে চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে ঠিক ছিল না, সেটা কেউ স্বীকার করতে চায় না। অন্য উদাহরণ দিলে বলা যায়, চিকিৎসকেরা এখনো খাবারে স্নেহজাতীয় উপাদানের ক্ষতির কথা রোগীকে বলে থাকেন, যদিও আধুনিক গবেষণা বলছে, আসলে ফ্যাট নয়, চিনি হলো বেশির ভাগ
ক্ষতির কারণ । শুরুর ভুলকে নতুন সত্যের আলোকে স্বীকার না করার এই প্রবণতার উদাহরণ শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে নয়, জাতীয় পর্যায়েও প্রচুর দেখা যায় । এই প্রবণতার নাম হলো Confirmation Bias.
যদি এখনো বিশ্বাস না করে থাকেন যে আসলে আমরা সবাই Confirmation Bias-এর শিকার, তাহলে বলি একটু ভেবে দেখুন তো, মনে কোনো প্রশ্ন আসার পরে তা Google Search করে আপনি কি সব কটা লিঙ্ক ক্লিক করে পড়ে একটা নিরপেক্ষ ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন নাকি আপনি খুঁজতে থাকেন কোন লিঙ্কের তথ্য আপনার পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, আর সেটাই আদ্যোপান্ত পড়েন । আপনি যদি প্রথম দলের হয়ে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহে আপনি অসাধারণ!মনে মনে ভাবছেন, যদি সত্য দিয়ে মানুষের মন না বদলায়, তাহলে কি দিয়ে বদলায়? মিথ্যা দিয়ে? আসলে তাও নয় ।মনকে পালানোর রাস্তা দিন মানুষ ভুল স্বীকার করতে চায় না । ভুল স্বীকার এড়াতে এমন ভয়ংকর সব কাজ করে বসে যে ফলাফল আরও খারাপ হয় । তাই সেই পথে না হাঁটাই ভালো । তার চেয়ে বরং একটা অজুহাত দাঁড় করান । যার মন বদলাতে চান, তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর আগে, তার আগের সিদ্ধান্তকে ভুল না বলে বলুন, ‘সেটাই সবচেয়ে ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল সেই সময়ের জন্য।’ তার কাছে যতটা তথ্য ছিল, তার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে সঠিক ছিল । নতুন তথ্য বা ফলাফল যেহেতু এসেছে, তাই আগের ভালো ও সঠিক সিদ্ধান্তকে আবার বিবেচনা করার সময় এসেছে ।আমরা কি সেটা করি? না করি না । বরং বলে ফেলি, ‘কী, বলেছিলাম না আগে?’ ‘এমন ভুল মানুষ করে?’ ‘কী, বুদ্ধির মাথা খেয়েছিলে?’ ‘উচিত শিক্ষা হয়েছে, আগে ভাবোনি কেন?’
(তথ্য সূত্র :১) উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে ২) ঈশা.সদগুরু. ও.আর.জি ৩)জাফরী আল-ক্বাদরী, যুক্তরাষ্ট্র)