সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৩০)

ইচ্ছামণি

পর্ব ৩০

পেছন ফিরতেই ভিরমি। হুবহু রুমার মতো দেখতে একই পোষাক পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে কি? রান্নাঘরের দরজায় তো আয়না লাগানো নেই। চমক কাটতেই খেয়াল হল বাইরের ঘর ঠিকমতো বন্ধ করার আগেই এই মেয়েটা এসে ঢুকে পড়েনি তো? মাথাটায় কেমন ঘোর ভাব। স্বপ্ন নয় তো?
মেয়েটা মনের কথা যেন টের পেয়ে বলল, “দরজা বন্ধই আছে। আর আপনিও স্বপ্ন দেখছেন না। কাপড়গুলো যদি বলেন তো কেচে দিতে পারি। আপনার গায়েরটাও তো কাচা দরকার।
“আপ- তুত্‌তুমি কে?”
“আমি আপনার ইচ্ছা পূরণের দাসী ভাবতে পারেন। ঐ আঙুর পাথরটার জিনও ভাবতে পারেন। পাথরটা সাবধানে রেখে দেবেন। যার কাছে পাথর, আমি তার। তারই রূপ ধারণ করি, তার কাজ করে দিই।”
“বাজে বোকো না! আমায় ফলো করে আমার বাড়িতে ঢুকেছ কী মতলবে? এক্ষুণি চেঁচিয়ে লোক ডাকছি।” বলল বটে কিন্তু জোর পেল না। অবিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে না। পাথরটা হাতের মুঠোয় ধরল রুমা।
“আমি যেতেই পারি পাথরটা ফেরৎ নিয়ে। তাতে আপনারই লোকসান।”
পাথরখানা আরও শক্ত করে ধরে রুমা বলল, “একটা সেমি প্রেশাস স্টোন বাগিয়ে কেটে পড়তে চাও? নাকি তুমি সত্যিই পাথরখানার জিন। আমার সব কাজ করে দেবে? কাপড় কাচতে পারবে খালি হাতে?”
“চোখের নিমেষে হয়ত পারব না। তবে কাজটা ভালোই হবে।”
মেয়েটা ওয়াশিং মেশিন থেকে জামাগুলো বার করে একটা প্লাস্টিকের গামলায় রাখা মাত্র বিদ্যুৎ চলে এল।
“ম্যাডাম, কারেন্ট তো চলে এসেছে। মেশিনেই কাচি?”
রুমা দেখল রান্নাঘর পরিস্কার, ঘর গোছানো, বিছানা তোলা, গুবলুকে বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে ডেকে এনে স্নান করানো, খাওয়ানো অনেক কাজ পড়ে আছে। মেয়েটাকে সেগুলোর কয়েকটাতে জুতে দিয়ে নিজে কাপড় নিয়ে পড়লে পরিশ্রম কম। মেশিনটা দালান কাম খাবার ঘরের এক কোণে ফিট করা আছে। তাই পাখার হাওয়ায় বসে বই পড়তে পড়তেও কাচা যায়।
তবে শুনতেই মেশিন। সেমি অটোমেটিক কাপড় কাচার যন্ত্রে সমানে নিজেকে লেগে থাকতে হয়। বারবার জল ভরা, জল বার করা, জট পাকানো জামার জট খুলে ওয়াশটাব থেকে স্পিনটাবে দেওয়া। তার ওপর ব্রহ্মরোদে ছাদে গিয়ে মেলে আসা। সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। আর ছাদে যাওয়া মানে বাড়িউলি শম্পাদির এক ঝাঁক তির্যক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। মহিলার ধারণা মেশিনে কাপড় কাচলে যেমন জল বেশি খরচ হয়, তেমনি বিদ্যুতের লাইনে চাপ পড়ে। প্রয়োজনীয় অয়্যারিং করা নিয়েও অশান্তি করেছিল দুই কর্তা-গিন্নি – মেশিন কেনার আগে তাদের অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল। রুমাকে ভেজা কাপড় নিয়ে ছাতে যেতে দেখলেই শর্ট-সার্কিটের গল্প শোনায়। বেশি কিছু বলা যায় না। শুধু বাড়ির মালিক বলে নয়; গুবলুকে সময় অসময়ে কাছে না রাখলে একা একা সংসার সামলানোই মুশকিল হয়ে যেত।
কাপড় কাচার সময়টা কেমন যেন আচ্ছন্ন অবস্থায় পেরিয়ে গেল। খাবার টেবিলে কাগজ আর সাপ্তাহিক পত্রিকা দেখে মনে হল, সে পড়ছিল। অথচ নাইটিতে হলুদের দাগ, গলদঘর্ম চেহারা বলছে সে রীতিমতো খেটে পরিশ্রান্ত। কিন্তু মেশিনে কাপড় ফেলে তদারকি করা ছাড়া আর কী কাজ করেছে কিছুতেই মনে করতে পারছে না। বস্তুত, কিছু করার কথাও নয়। ঐ পাথরটার জিনকেই তো যা যা করার তার নির্দেশ দিয়ে এই ঘরে পাখার তলায় বসেছিল। সত্যিই পাথরের জিন তো? নাকি রুমার মনে ভুল? কিন্তু ও যে একটু আগে ঐ মেয়েটার সঙ্গে অত কথা বলল, রীতিমতো জেরা করল। কোনও চোর ছ্যাঁচোড় নয় তো? না না। রুমা স্পষ্ট দেখেছে। পৃথিবীতে প্রকৃতিতে অনেক কিছুই ঘটে যার ভৌতবিজ্ঞানে যাদের ব্যাখ্যা হয় না। হয়তো অনেক পরে জবাব মেলে। কিন্তু তার আগেই মানুষ সেইসব ঘটনাকে অলৌকিক বলে প্রচার করে দেয়। এই আঙুরপাথর কন্যার ব্যাপারটাও হয়তো সেই রকম আপাত অলৌকিক কোনও ব্যাপার। হয়তো প্রকৃতিতেই এর কোনও ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে, আজকের তারিখে যা মানুষের কাছে নিছক অলীক কল্পনা, ফ্যান্টাসি।
রুমার জীবনে কি কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটতে পারে না? কোনও কোনও ক্ষেত্রে বা কোনও কোনও মানুষের বেলায় ও দেখেছে তার মধ্যে অদ্ভূদ ইচ্ছাশক্তি বা চেতনা কাজ করে। অর্কপ্রভর বেলাতেও তো করেছিল। সেই ইচ্ছাশক্তির জোরে অর্ক সম্পর্কে বেশ কিছু অনুমান আভ্রান্ত মিলে গিয়েছিল, কিন্তু সম্পর্কটাকে জোড়া দেওয়া যায়নি। কিন্তু অর্কদা যে ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছে, তা অন্যের কাছে শোনার আগে থেকেই যেন রুমার চেতনায় ধরা পড়েছিল। এমনকি ওখানে কোন হস্টেল বা পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকার বদলে কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে থাকবে, চান্দ্রেয়ীর সঙ্গে যে আর যোগাযোগ থাকবে না, বরং হবু শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে মোলাকাত হবে – এই তথ্যগুলোরও পূর্বাভাস পেয়েছিল। পরিচিত মহলে ভবিষ্যৎবাণী করলে তা মিলে যাওয়ার পর তারা হয় ভাবত অর্কর কাছে সব জেনে নিয়ে বলেছে, অথবা কোনও অলৌকিক ক্ষমতার বলে প্রিমোনিশন। রুমার এইসব সাতপাঁচ ভাবনার মধ্যে স্পিনটাব খুলতে না খুলতেই মেয়েটা এসে জানাল ওর সব কাজ শেষ। এবার শুধু গুবলুকে নিয়ে আসতে হবে স্নানাহার করাতে। মেয়েটার খাওয়ার পর একটা মুসম্বির রস করে দেয় রুমা। রুমার মতো দেখতে জিনটা জানাল মুসম্বির রস বানিয়ে রান্নাঘরে চাপা দেওয়া আছে। ও জানল কী করে? গুবলুর খাবারও তো বেড়ে চাপা দেওয়া আছে। বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না। অবশ্য সত্যিই জিন জাতীয় কেউ হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তাকেও তো নির্দেশ দিতে হয়। রুমা কখন এতসব করতে বলল? নাকি বলেছে? রুমা কি কাপড় কাচার ফাঁকে ফাঁকে ঘুমিয়ে পড়ছিল।
“ম্যাডাম আপনি মেয়েকে ডাকুন, আমি কাপড়গুলো ছাদে দিচ্ছি। যে বালতি করে রুমা কাপড় নিয়ে যায়, ঠিক সেই বালতিতেই কাচা কাপড় মেশিন থকে বার করে নিয়ে গেল।
ছাদে কাপড় শুকোতে যাবার পথে যথারীতি বাড়িওয়ালির তলব, “মেশিনে কেচেছ, না? কত ইলেকট্রিক পোড়ে, কত জল খরচ হয়। পাম্পের জন্য যা বিল আসে না -“
“ইলেট্রিকের তো আলাদা মিটার। পাম্পটাও না হয় আলাদা করে দিন যদিও আমরা এমন কিছু জল খরচ করি না”। বাহ্! ওই মেয়েটা কী সুন্দর রুমার মনের কথাগুলো দিব্যি শুনিয়ে দিল শম্পা চৌধুরীকে। ঐ প্রস্তরকন্যা বোঝা যাচ্ছে মুশকিল আসান হয়ে এসেছে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।