সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শক্তিনাথ ভট্টাচার্য্য (পর্ব – ১১)

হোয়াটস্অ্যাপে পরকীয়া – ১১

( কিছুক্ষণ বাদে মোহনা নেট খুলল… সন্ধ্যের সময় মেয়েকে পড়াতে দিয়ে এসেছে… আগে  ওর বাবা নিয়ে আসত’… এখন ওকে রাতেও নিয়ে আসতে হচ্ছে… কিন্তু, এখন নিজের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ওর মনেহল, ও কি সত্যিই এমন বলতে চেয়েছিল!!… অন্য অভিজ্ঞতার রেশ চলে এসেছে অনাবধানতায়!… খারাপ লাগছে।… লিখল…)
—    কে কোথায় যাবে…!?
কোথাও যাওয়া যায়-ই না আসলে…  তাই তো বারবার ফিরে আসতে হয়… 🙂
আমি তো যাবো এখন..  মেয়েকে আনতে… এত বকলে কি আমার মনখারাপ হয় না…!?… রাস্তায় কিছু হলে!?
(খানিকক্ষণ পর, মেয়েকে খেতে দিয়েই ব্যস্ত হয়ে নেট খুলে দেখে, অর্কপ্রভ আর কিছু লেখেনি..)
মোঃ :   কোথায় গেলেন…!?
(কোন উত্তর নেই।  আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ইমোজীতে জানালো…)
মোঃ :      ❤ U … 🙂
(তবু অন্য তরফে কোন সাড়াশব্দ নেই….)
মোঃ :   তবু চুপ করে থাকবেন তো…!?  ঠিক আছে… তবে তাই…!!
অনেক বকা খেলাম তো…  আরো খেতে রাজি আছি 🙂
(না,. . বিরাট আঘাত দিয়ে ফেলেছি হয়তো… মন থেকে ঠিক এটা চাইনি…  তাহলে কখনো মাত্র এই ক’দিনে কারো কাছে এভাবে নিজেকে প্রকাশ করা যায়!!…  উনি কি এটুকু বুঝবেন না!!… কান্না এলো মোহনার।… কী করে যে ওনার সংগে এখন কথা বলি!!… অনেক রাতে, মোহনা এসব ভাবতে ভাবতে লিখল…)
—    বাকি লেখাগুলো পড়িনি ঠিক করে…  কাল উত্তর দেবো… যদি গ্রাহ্য হয় তবেই অবশ্য…!
” ভালোবাসি”…  না বললে… আর বিরক্ত করবো না…! 🙂
শুভরাত্রি।
[ আজও সারারাত শুয়ে শুয়ে উসখুস করেছে মোহনা, ভাল করে ঘুমোতে পারেনি… বারেবারেই মনেহয়েছে, কেমন করে যে বোঝাই, আমি এমন নই,… আমি তো সত্যিই চেয়েছিলাম ওর মত এমন একজন মানুষের সঙ্গে আমার প্রেমের ভাব আদানপ্রদান করি… মাঝে মাঝে মনের মধ্যে এমন ভাব এসেছে যেন উনি আমার খুব কাছের মানুষ, যাকে ‘তুমি’ করে সব কথা বলতে ইচ্ছে করে!…  কিন্তু, কী কথায় কী ভাবে যে সব কেমন হয়ে গেল!! তবু, ভরসা হচ্ছে, ব্লক করে দেন নি তো!! ]
(সকালে উঠেই ওর নেট খোলার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই লিখল….)
মোঃ —
কথার প্রলাপ দমকা ঝড়ে
ওলটপালট একনিমেষে,
বৃষ্টি তো নয়, রক্ত ঝরে,
কান্নার স্রোত তাইতে মেশে।
দুদিন ধরে সারারাত ঘুমোতে পারিনি। মনের কথাগুলো চার লাইনের মধ্যে আনমনা হয়ে আটকে পড়েছে…  বেরোতে পারছে না!!
আপনার লেখাগুলি বারবার পড়ছিলাম…
এমন আবেগী লেখেন কি করে আপনি… !??
এই জন্যই বুঝি বার বার ফিরে ফিরে আসতে হয়…  আবেগের তীরে বিদ্ধ হতে হয়…!
[ অর্কপ্রভ্রর উত্তরের প্রতীক্ষায় দু’ঘণ্টা কেটে গেছে…। কোন সাড়া মেলেনি। মোহনার মনেহল, আজ সারাদিন, ও নিজের মনের কথা সহজভাবে উজাড় করে দেবে অর্কপ্রভর কাছে, যা কিছু বিভ্রান্তি দূর করার শেষ চেষ্টা করবে।… ]
(এরপর, সারাদিন ধরে যখনই যা মনে হয়েছে লিখতে থাকল কিছুক্ষণ পরে পরেই…)
—   আমায় ভালোবাসতে হবে না….
ক্ষমা চেয়ে নিলাম…
আপনি যখন আর কিছু বলবেন না…  তখন আর বিরক্ত করাটা সম্মানজনক নয়…  আমার জন্য এবং অবশ্যই আপনার জন্য !
তবে এবার আমার কষ্ট হচ্ছে… যদিও, কষ্টের মধ্যে এক হৃদয়বিদারী আনন্দ আছে…  সেটি ভারি মূল্যবান ….!
[ এখন মেয়েকে শুধু পড়াতে নিয়ে গেলেই হয়না। গানের ক্লাস আছে, আঁকার ক্লাস আছে..  কোন না কোনদিন একটা না একটা থাকেই। সবকিছুই তো একাহাতে সামলাতে হয়! তার মাঝেই অস্বস্তির কাঁটাটা লেগেই রয়েছে। কোন মেসেজ আসেনি।
গতকাল বিভু ফোন করেছিল, এ সপ্তাহে আসতে পারবে না কাজ আছে। এই এক ব্যাপার!… পুরুষমানুষ অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেলেই কাজের চাপ বেড়ে যায়…  বাড়ী ফিরতে পারে না। কাজ যে কী বাড়ে সে অভিজ্ঞতা তো বিয়ের পরে ভিনরাজ্যে একসঙ্গে থেকে দেখে এসেছে! প্রতি সন্ধ্যাতেই সব কলিগরা একসঙ্গে মদ্যপানের আসর বসায়!…  কম ঝামেলা হয়েছে!! সে থাক।
মনের বিক্ষিপ্ত ভাবটা কিছুতেই আর কাটছে না এখন!… ওনাকে এইভাবে বলাটা ঠিক হয়নি, বারে বারে মনেহচ্ছে… নাহয়, নিজেই সরে আসত!! ]
(মোহনা লিখল…)
আর কত শাস্তি দেবে তুমি আমায়…!?
আর অমন বলবো না কক্ষনো …  sorry…
আমি বেজায় অবুঝ..  একদম ভালো নই…
কিন্তু কেনো জানিনা কষ্ট হচ্ছে ভারি…
ভালোবাসি বুঝি…  তাই…
পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলাম…

(অনেকক্ষণ পরে আবার ..)
মোঃ–      এমন চুপ করে থাকলে কিন্তু আমার আরো বেশি বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে হচ্ছে….  তবে আমি কি করবো এবার…!? 🙂

—       অন্যায় করলে…  দূরে সরিয়ে দিয়ে…  এই নাকি ভালোবাসা… হুম্…!??  🙂

আর সেই যে হঠাৎ করে চুপ করে গিয়েছিলেন…  তখন আমার খারাপ লাগেনি…!? তার শাস্তিটা কোথায় যাবে তবে…!?  🙂
—       বার বার খুলে খুলে দেখছি whatsapp…  মনে হচ্ছে শ্বাস নিয়ে বুক ভরছে না…. এভাবে আমি পাগল হয়ে যাবো যে…  তার বেলা…!?
তাতে কিচ্ছু যাবে আসবে না…  তাই না…!?

তবে এবারের পর আর আমি whatsapp খুলবো না…  আর আসবো না বিরক্ত করতে…

[ সারাদিন ধরে মাঝে মাঝে লিখেও কোন উত্তর পায়নি মোহনা। রাত হয়ে গেছে…  একটা বিচ্ছেদের কষ্ট এবার যেন পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে দম বন্ধ করে গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে… কাজের ফাঁকে ফাঁকে অজান্তে চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে!
মোহনার মনেহল, আগে যাদের সঙ্গে কিছু না কিছু ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল সেখানে সেই সম্পর্কের মধ্যে সচেতনতার একটি অদৃশ্য আড়াল অবচেতনই টেনে দিত… কিন্তু, ডাক্তারবাবুর ক্ষেত্রে সেই অবচেতনই যেন চেতনারূদ্ধ হয়ে গেছে!…  সে কি ওনার সহজতা, স্পষ্টবাদিতা, অকপটতা কিংবা আমাকে ‘স্বচ্ছন্দে ত্যাগ করতে পারেন’ বলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার ক্ষমতা, নাকি, আরও অন্য কিছু, যা ওনাকে আমার এত কাছের মানুষ বলে ভাবতে বাধ্য করছে!
উনি বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও যখন বললেন, ওনার ‘শ্রীরাধা’ আছেন তার নাম ‘মণিকর্ণিকা ’, আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম।… হঠাৎ, একরাশ শূন্যতায় ডুবে গেলাম…  যার কাছে সব কিছু সমর্পণ করবো বলে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েছিলাম, সেখানে তাহলে আমার স্থান নেই!!… তীব্র লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলতে ইচ্ছে করেছিল… কিন্তু, পরক্ষণেই মনেহল, ইনিই আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল…  কারণ, কেবলমাত্র ইনিই সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন, বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও কেন কাউকে অন্য আশ্রয় খুঁজতে হয়!… আমার গায়ে অন্ততঃ কোন সন্দিগ্ধ মনের অন্ধকার ছায়ার স্পর্শ এসে লাগবে না!… সে কি কম কথা!! পুরুষদের কি চিনি না!!… ঘনিষ্ঠভাবে মেশার পরে মেয়েটির চরিত্র নিয়েই অন্যদের সঙ্গে বাজে কথা রটাবে! ডাক্তারবাবুকে তা মনেহয়নি… মনেহয়েছে, একটি নিভৃত আশ্রয়।
আচ্ছা, ‘আশ্রয়’ মানে কি শুধু চার দেওয়ালের আশ্বাস!… সে কি কোন আকাশ নয়, যেখানে নির্ভয়ে ডানা মেলা যায়!!… মনেহল, ওনার তো ‘রাধারানী’ আছেন, আমি তো ‘মীরাবাঈ’ হয়ে ওনাকে পেতে চাইতেই পারি, যেমন উনি ভেবেছেন!…
মনের বিরাট শূন্যতাটা হঠাৎই ভরে গেল সমর্পণের ভাবে…  লজ্জা ঢেকে গেল প্রেমে… মনেহল, আমি মীরাবাঈ-ই, কিংবা এ যুগের ‘কমললতা’!! ]
( আজ রাতে শেষবারের মত মোহনা লিখল..)
🙂
” ভাবেরও লীলায় নাহয় ভরিতো আঁখি..
আমারে না হয় আরো কাছে নিতে ডাকি…
না হয় শোনাতে মরমের কথা মোর দুটি হাত ধরে…
ওগো…  না হয় রহিতে কাছে…. ” 🙂
এতকিছু শিখেছেন…..  এতদিন ধরে…!? ক্ষমা করতে হয়…  শেখেননি…!? হুম্…!? 🙂
কি করলে আঘাত প্রশমিত করতে পারবো…  সেটাও তো আমায় জানতে হবে… নইলে পারবো কি করে…!?  🙂
চুপ করে থাকতেও তো কষ্ট হচ্ছে!…  হচ্ছে না…!? 😊
শুভরজনী। 😊
[ রাতেও অর্কপ্রভর কোন উত্তর আসেনি। তবু মোহনার মনেহল, নিজের কথা কিছু তো বলা সম্ভব হচ্ছে… নিজেকে অন্যরূপে ভেবে আনন্দও হল মনে।… মীরাবাঈ!!…
মায়ের কথা মনে পড়ল। অনেকদিন হল, মা চলে গেছেন। মা ভাল গান গাইতেন। ছোটবেলায় মায়ের কণ্ঠে শুনেছে মীরার ভজন, ‘পহিলহি রাগ, নয়ন ভঙ্গ ভেল’।… মা বলতেন,  রেডিওতে পঙ্কজ মল্লিক মহাশয়ের ‘সংগীত শিক্ষার আসর’ থেকে শিখেছিলেন। আরও অনেক গান।…
মীরার ভজন গুনগুন করতে লাগল মোহনা। …  সব গানের শেষে, ‘মীরাকে প্রভু গিরিধারী নাগর’! আচ্ছা!!…  মীরার কাছেও তো গিরিধারী ‘নাগর’ই ছিলেন!!… মীরাও তো সিংহদুয়ার খুলে বেরিয়ে এসেছিলেন নাগরের উদ্দেশে!!…  সে কি পরকীয়া নয়!!! ]
( পরের দিন সকালে, অর্কপ্রভর তরফে কোন মেসেজ আশা না করেই মোহনা সময়মত মাঝে মাঝে লিখতে শুরু করল…)
—    আমিও ভেবেছিলাম…  আর খুলবোই না whatsapp…  🙂
আপনার চেয়ে আমার বুদ্ধি কম, অভিজ্ঞতা কম…  অনেক কিছুই কম…
তবু সকালে উঠে মনে হলো…  ভালোবাসা যদি অভিমান কে অতিক্রম করে ফেলে…  তবে তার সামনে মাথা নোয়ানোই শ্রেয়…! 🙂
জানেন…  এই বোবা শব্দ (টাইপ করা) যতই মুখর হোক…  ভাব প্রকাশে অসমর্থ … এটা তার সবথেকে বড়ো অসঙ্গতি…  এক ভাবে লেখা হয়… কঠিন শব্দ তাকে অন্য ভাবে প্রকাশ করে ফেলে….  তাতে সহজপাঠের ‘অ’ ‘আ’ ‘ক’ ‘খ’ গুলো কেমন দুর্বোধ্য ফরাসী ভাষার মতো হয়ে যায়…  🙂
জানেন কি…!?  🙂
” ভাবেরও লীলায় না হয় ভরিতো আঁখি……..”….  এই সুর আমায় ছেড়ে আজ আর যাবে না….. 🙂
” তৃষিত নয়ন ভানুসিংহ কুঞ্জ পথমে চাহিয়া….
মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে
মৃদুল গান গাহিয়া… “
আমি অতটা খারাপ নই যতটা আপনি মনে করেন 🙂… কী করে বলি, বিশ্বাস করুন!! 😒😒😒

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।