মার্গে অনন্য সম্মান শংকর ব্রহ্ম (সেরার সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৮১
বিষয় – আত্মত্যাগ

গল্প হলেও সত্যি

(সৈনিক থেকে হাইজ্যাকার)

ফ্রান্সের আর্লি বিমান বন্দর। ১৯৭১ সালের এক উজ্জ্বল সকাল। এয়ার পোর্ট জুড়ে সাজ সাজ রব। জার্মান ভাইস চ্যান্সেলার ফ্রান্সে আসছেন। বিমান বন্দরের বাইরে, ট্যাক্সী করে এসে নামলেন এক দীর্ঘকায় সুদর্শন যুবক।
নাম তার জ্যা কুঁয়ে। কোমড়ে, অন্তর্বাসে আর মোজার ভিতরে গুঁজে রাখা রিভলবারের ভাগ করা আলাদা আলাদা অংশ। ইমিগ্রেশনের সিকিউরিটির মেটাল ডিটেকটারে ধরা পড়ল না সেটা। রান ওয়েতে দাঁড়ানো পাকিস্তানের
PIA – 711 নম্বরের বিমানটি। বেলা তখন সকাল এগারোটা। সিঁড়ি দিয়ে গটগট করে বিমানে উঠে পড়লেন সেই যুবক।
একটু পরেই বিমান ছেড়ে দিল। দশ মিনিট
যেতে না যেতেই অর্লি এয়ার পোর্টের রেডিও বার্তায় খবর ভেসে এলো, আমি বিমানটি ছিনতাই করেছি। আমার শর্ত না মানলে আমি এক্ষুনি বিমানটি উড়িয়ে দেবো, আমার ব্যাগে শক্তিশালী বোমা আছে। অর্লি এয়ার পোর্টের কর্মকর্তাদের মধ্যে তুমুল আলোড়ণ সৃষ্টি হল।
বিমান বন্দরে রেড এলার্ট জারী করা হল।
তারা যোগাযোগ করলেন জ্যা কুঁয়ের সঙ্গে।
তারা জানতে চাইলেন, কি তার দাবী? কেন সে বিমান হাইজ্যাক করেছে?
জ্যা কুঁয়ে জানলেন,বাংলা দেশের মুক্তি যোদ্ধাদের জন্য বিশ টন ওষুধ পাঠাতে হবে,
তাহলেই বিমানটি সে নিরাপদে রানওয়েতে নামতে দেবে। এবং নিরিহ যাত্রীদের কোন ক্ষতি করবে না। কতৃপক্ষ তার কথায় রাজী হলেন। কিন্তু কতৃপক্ষের চালাকি ধরতে না পারায় জ্যা কুঁয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়লেও তার কথা মতো বাংলাদেশে, মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে ওষুধ পৌঁছে গিয়েছিল। বড় বড় আইনজীবিরা তার হয়ে লড়লেও বিচারে তার পাঁচ বছরের জেল হয়ে যায়। অবশ্য নিষ্ঠা ও নিয়মানুবর্তী মেনে চলার জন্য দু বছর পরই সে মুক্তি পায়। ততদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রর মর্যাদা পেয়ে গেছে।
কিন্ত তিনি তারপর একবারও বাংলাদেশে আসেননি তিনি।
কে এই জ্যা কুঁয়ে?
তিনি একসময় ফরাসী সৈনবাহিনীতে কাজ করতেন। সৈনবাহিনীর ধরা বাঁধা নিয়ম তার পছন্দ না হওয়ায়, তিনি সেখান থেকে সেচ্ছা অবসর নেন। তার কিছুদিন পর তিনি জড়িয়ে পড়েন এক কট্টরবাদী সংগঠন (ও এস এ)-এর সঙ্গে। পরে তিনি আন্দ্রে মার্লোর লেখা পড়ে, তার ভক্ত হয়ে ওঠেন। মার্লো ছিলেন উদারপন্থী মানসিকতার লোক। জ্যা কুঁয়েও কট্টরপন্থী সংগঠন ছেড়ে দিয়ে, উদারপন্থী হয়ে ওঠেন। মার্লোর লেখা পড়েই তিনি জানতে পারেন, বাংলাদেশ নামক একটি দেশ পাকিস্থানের সঙ্গে থাকতে চাইছে না, তার স্বাধীনতা ঘোষণা করছে।মার্লো সেই স্বাধীনতার সপক্ষে লেখা লিখেছেন। সেটা পড়েই জ্যা কুঁয়ে ভাবতে থাকেন, কি ভাবে বাংলাদেশের মুক্তি যোদ্ধাদের সহয়তা করা যায়? সে ভাবনা ভাবতে ভাবতেই বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা তার মাথায় আসে। যা ভাবা, তাই কাজ। তিনি প্রফেশনাল হাইজ্যাকার ছিলেন না।বাংলাদেশ মুক্তি যোদ্ধাদের সহায়তার করার জন্য, সে সেই প্রথম ও শেষ, বিমান ছিনতাই করার মতো এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসেন। তার জন্য জেলও খাটেন।
কিন্তু মার্লোর লেখা পড়ার আগে তিনি বাংলাদেশ নামক দেশটির কথা পর্যন্ত জানতেন না। কোথায় তার ভৌগোলিক অবস্থান তাও তার অজানা ছিল। কোনদিন বাংলাদেশ দেখারও সৌভাগ্য তার হয়নি। এর কথা কি স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষেরা জানেন? মনে রেখেছেন ক’জনে তাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কোন মর্যাদাও পাননি সেখান থেকে। তিনি যা করেছেন, তা করেছেন তার হৃদয়ের টানে। কী বিষম নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ। ভাবতেও অবাক লাগে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।