অণুগল্পে শান্তনু ভট্টাচার্য

পুটু
সব বাচ্চারাই কি সুন্দর হেসে খেলে বেড়ায়। কিন্তু পুটু কোথাও যেতে একেবারেই পছন্দ করেনা। সব সময় মায়ের কোলে অথবা মা এর আশেপাশে। সে মা গাছে বা মাটিতে যেখানেই থাকুন না কেন।
মা কোথাও বসে থাকলে তার আশেপাশেই খেলাধুলা করে। বিরক্ত করে এমন নয় বরং, কখনো মায়ের উকুন বেছে দেয়, হাত-পা টিপে দেয়। আশেপাশের ডালপালা থেকে কয়েকটা ফল ছিঁড়ে এনে মাকে দেয়। কিন্তু পুটুর এই সব সময় লেপ্টে থাকাটা মায়ের পছন্দ নয়। তাই মা আকারে ইঙ্গিতে, কখনো ধমকানিতে বুঝিয়ে দেয় পুটুকে যে সব সময় মা, মা করাটা তিনি কিন্তু একেবারেই ভালো চোখে দেখছেন না।
পুটু মাকে বোঝালো যে সে তো মাকে বিরক্ত করছে না! শুধু তাঁর সান্নিধ্যটুকুই চায়। আর তাঁকে একটু সেবা করতে চায়। এতেই তার আনন্দ। অবুঝ মা পুটুর মনের ভাষা টুকু বুঝলো না। হঠাৎই একদিন পুটুকে ফেলে দিয়ে সে অনেক দূরে কোথাও চলে গেল। অনেক খুঁজেও পুটু তার মাকে দেখতে পেল না।
পুটু মন খারাপ নিয়ে সেখানেই বসে আছে আর চোখের জল ফেলছে। রাত্রি গভীর, গাছ তলায় সেই একই জায়গায়, কিছু খায়নি।
পরদিন সকালে তার অন্য সঙ্গীরা অজ্ঞান অবস্থায় গাছ তলায় পড়ে থাকতে দেখে। উঠিয়ে আঁচলা ভরে জল এনে চোখে মুখে ছিটিয়ে দিল, দুটো ফল এগিয়ে দিল কিন্তু সে খেতে নারাজ। সে তো “মা” পাগল, মা মা করেই কেঁদে ভাসাচ্ছে।
অতঃপর কয়েকজন অনেক খুঁজে তার মাকে সেখানে নিয়ে এলো। মা প্রথমে একটু হতবাক হলেও, পরে তিরস্কারের মাত্রাটা আরো খানিক বেড়ে গেল। যাইহোক, একটু হাতে করে খাইয়ে পুটুকে চাঙ্গা করল। নিয়ে গেল এ গাছ থেকে ওগাছে। সেখানে আবার চলল তিরস্কারের পালা। পুটু আর সইতে পারল না। মা তাকে নিয়ে গাছটার অনেক উপরের ডালে। পুটু তার নরম হাত দুটি দিয়ে মা কে আঁকড়ে এতক্ষণ জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু, এবার সেই পেলব হাত দুখানি একটি একটি করে মায়ের শরীর থেকে ছাড়িয়ে নিল।
মা বুঝেও যেন বুঝতে চাইল না, ভাবলো এও বোধ হয় বাছার নতুন কোন খেলা। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই মাটিতে পুটুর দেহটা নিথর হয়ে এলো। চলে গেল সে অভিমানে।
বিরক্ত করার অভিপ্রায় তো পুটূর কোনদিন ছিলো না। নিজেকে তাঁরই আর এক সত্ত্বা মনে করে, সেই মা কে তো সে , শুধু ভালবেসে তাঁর সান্নিধ্য টুকু সদা সর্বদা উপভোগ করত। এটাই কি ছিল তার দোষ?