এক মাসের গল্পে সুপর্ণা বোস (পর্ব – ১)

চাঁদের কণা

_যতবার তাকে আমি চাঁদ দেখিয়েছি! সে আমার আঙুলই দেখেছে।চাঁদ দেখেনি !
কথাগুলো বলতে বলতে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাসছিলেন মিলি।তাঁর হাসির ওপর পাতলা মেঘের ছায়া পড়ছিল বারবার।তাঁর ঝকঝকে চোখ।সুউচ্চ কপাল।দীর্ঘ সতের বছরের লড়াইয়ের ভাগ‍্য দিয়েছে তাকে।প্রথম যেদিন একমাত্র পুত্রের অটিজিম ডায়াগনোজড হল।মিলি কিছুতেই সেই সত‍্যকে মেনে নিতে পারেনননি।শোকের মতই অনুভূতি হয়েছিল।হারিয়ে ফেলার মত।লালিত স্বপ্ন।নস‍্যাৎ করতে চাইছিলেন।ভুল! নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।পাগলের মত ইন্টারনেট হাতড়াচ্ছিলেন।চেকলিস্ট মিলিয়ে দেখছিলেন কতগুলি লক্ষণ মিলছে।তখনো মনে হচ্ছিল যদি কেউ বলেন, ডায়াগনোসিসটা ভুল ছিল!নিজের সঙ্গে নিজে দরাদরি করছিলেন।নরমাল যখন নয় তখন নিশ্চয়ই সাংঘাতিক প্রতিভাধর! আইনস্টাইনের মতই!শেয়ার ডেল‍্যুজনের মতই সেই ভাবনা ছড়িয়ে যাচ্ছিল পরিবারের অন‍্যান‍্যদের মধ‍্যেও।ভিতরে একটা উথালপাথাল।ঝড়।আমারই?কেন? কেন?ক্রোধ হতাশা অবসাদ।এক সময় ভিতর থেকে শান্ত হলেন।বোধহয় মেনে নিলেন খানিকটা।

শুরু করলেন বিষয়টা জানতে।বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ওয়ার্কশপ অ‍্যাটেন্ড করতে লাগলেন।একটি সেমিনারে গেলেন।ভদ্রমহিলা একজন অটিস্টিক বাচ্চার মা একইসঙ্গে একজন সাইকোলোজিস্ট।তিনি তাঁর জার্ণির কথা বলছিলেন।সেইসঙ্গে বোঝাচ্ছিলেন বিষয়টা কি? অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅডার।মিলি বুঝতে পারলেন, এই শুরু।এখনো অনেক পথ হেঁটে যেতে হবে।তবু মনের গোপনে সেই দুরাশাটুকু বেজে উঠত, অন্তত একবার যদি কেউ বলেন, ‘ সব ঠিক হয়ে যাবে’।মিলি বিশ্বাস করবেন মন প্রাণ দিয়ে।
আমেরিকায় অনেক রকম সুযোগ সুবিধা থাকলেও এইসব দিনগুলিতে দেশের মাটির জন‍্যে মনকেমন করে মিলির।দেশে ফোন করেন নিজের দাদাকে।
_ভীষণ একা লাগছে রে দাদা।এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমার সোনা অটিস্টিক।কোথাও ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো?
দাদা নিজেও একজন ডাক্তার।তিনি পরামর্শ দিলেন ব‍্যাঙালোরে নিমহ‍্যান্স এ দেখাতে।সেখানে শেখর শেষাদ্রীর মত চিকিৎসকরা আছেন।দেশে ফিরলেন মিলি।নিমহান্সের ডাক্তাররাও একই কথা বললেন।আর তো কোনো সন্দেহ রইল না।দোলাচলেরও আর জায়গা নেই কোনো।

দীর্ঘ সতের বছর পর আজ।মার্চের এক মেঘলা সকালে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই সেমিনার হলে বসে অনেক মানুষ তাঁর লড়াইয়ের কথা শুনছেন।জানলার কাচের বাইরে থেকে থেকেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নাবছে। মিলি হেসে হেসে তাঁর সবথেকে কঠিন সময়ের স্মৃতি পরিক্রমন করছেন। স্মৃতিতে ভেসে উঠছে বিদেশের আর্লি ইন্টারভেনশন সেন্টারের একটা সবুজ প্রান্তর। মিলি দেখছেন তাঁর সোনা।ফুটফুটে সুন্দর বছর চারেকের বাচ্চা।হেঁটে চলে যাচ্ছে আপনমনে।ক্রমশ দূরে! বহু দূরে! মিলি তার নাম ধরে ডাকছেন।শুধু ডাকছেন নয়,চিৎকার করে ডাকছেন! চিৎকার করতে করতে তাঁর গলা চিরে যাচ্ছে।অথচ সোনা ফিরেও তাকাচ্ছে না!ও কি শুনতে পাচ্ছে না?ওকি জানে না ওকে ওর মা কিই নামে ডাকে?মিলির অভিমান হচ্ছে। মিলির সমস্ত পৃথিবী জুড়ে আছে ও।অথচ মিলি জানেন না কী করলে ওর পৃথিবীতে তার একটু জায়গা হবে! চোখ ফেটে জল আসছে মিলির।তবু কখনো নিয়তিকে দোষারোপ করেননি।তাঁর শিক্ষা। বিজ্ঞানমনস্কতা তাঁকে এসব অ‍্যালাউ করে না।অথচ সেই দিনের সেই ঘটনা দুঃস্বপ্নের মত হন্ট করে আজও।এতবছর পরেও আজ এই মুহূর্তেও শরীরে রোমহর্ষ হচ্ছে। কান্না পাচ্ছে তাঁর। চোখ থেকে বেরিয়ে পড়ার আগেই সেই অশ্রুগুলোকে হাসির সিলভার ফয়েলে মুড়ে ফেলছিলেন মিলি।এই শক্তি তাঁর ভিতরে নিহিত ছিল।

চিকিৎসকেরা কিভাবে ভেঙেছিলেন সেই শোকসংবাদ?মিলির মনে আছে,ডক্টর বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় বলেছিলেন,জীবন খেলার মাঠের মতই।যোগ‍্য ব‍্যাটসম‍্যানকেই তো কঠিন বল দেওয়া হয়! প্রকৃতিও আপনাকে কঠিন বল দিয়েছে যোগ‍্য বলেই। সহজ নয় বিষয়টা।মানুষ এক নির্মাণের নাম।একতাল কাদামাটি নিয়ে সর্ব প্রথম মা ই তো গড়ে তুলতে শুরু করেন শিশুটিকে।শাস্ত্রে আছে, মা পার্বতী তাঁর শরীরে মাখা হলুদবাটার রূপটান ঘষে তুলে সেই দিয়ে গনেশকে গড়েছিলেন।অথচ আপনাকে প্রকৃতি একদলা কাদামাটি নয় বরং এক টুকরো পাথর দিয়েছেন।তাই আপনার কাজটা কঠিন ছিল। ভীষণ কঠিন।প্রতিদিনের ধৈর্য্য ও চেষ্টার ছেনি বাটালি দিয়ে আজ দীর্ঘ সতের বছর ধরে মূর্তি গড়ছেন। একই সঙ্গে আপনি নিজেকেও নতুন করে গড়ছিলেন।এক শক্ত ডানার মা পাখি।অবয়ব ফুটছিল ক্রমশ। হয়ত।

ওর স্নানের জলের গামলায় খেলনা রেখে কিছু শেখাবার চেষ্টা করতেন।কালার অ‍্যাসেসমেন্ট করে জেনেছিলেন, লাল রং ওর প্রিয়।আপনি সমস্ত কিছুতে লাল ব‍্যবহার করার চেষ্টা করতেন।যেমন লাল সব্জি,লাল ফল। অথচ তেমন কোনো ফল হচ্ছিল না। কিছুই শিখছিল না ও।স্নান করাবার সময় সাবান মাখাতে মাখাতে বলতেন,দেখো সোনা, এটা সাবান! গায়ে মাখে!দেখো তো কী সুন্দর গন্ধ… মিলির সমস্ত উদ‍্যম বৃথা যাচ্ছিল। অসহায় লাগছিল। ওকে কিই শেখাবেন মিলি? সাবান, গন্ধ, না হাত?

মাঝে আরো ছটা বছর কেটে গেল।এবারে স্কুলের দরজায় দরজায় কড়া নাড়ার পালা।স্কুলগুলো এমন ব‍্যবহার করছিল যেন ওকে পেটে ধরে কী ভীষণ পাপ করে ফেলেছেন মিলি।একের পর এক স্কুল থেকে বিতাড়িত হচ্ছিলেন।যেন পরীক্ষায় ফেল করছেন। কেউ বলেছিল তাদের কাছে স্পেশাল ইনফ্রাস্ট্রাক্চার নেই।কেউ বললো,অন‍্য গার্জেনরা আপত্তি করবে।জেদ আর অভিমান মিলে ঠিক করলেন আর কোনো স্কুলের দরজাতেই যাবেন না।

রেড ফ্ল‍্যাগস।বারো মাসের মধ‍্যে সচরাচর হাঁটতে শেখার কথা অথচ ষোলো মাস পেরিয়ে যাচ্ছে।দু বছরের মধ‍্যে অন্ত পঞ্চাশটা ওয়ার্ড বলতে পারে।আড়াই বছরের মধ‍্যে ছোট ছোট সেন্টেন্স বলতে পারে।
স্পেশাল এডুকেটারের স্ট্রাক্চারাল টিচিং ট্রেনিং নিলেন মিলি।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।