মার্গে অনন্য সম্মান শংকর ব্রহ্ম (সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্যপরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৬৪
বিষয়- প্রতীক্ষা
প্রতীক্ষা
প্রথমে বুঝতে পারিনি সে ছিল একটা বাঘিনী।
তার গড়গড় আওয়াজ শুনেছিলাম শুধু। অন্ধকারে সে এসে আমার পাশে শুয়ে পড়ল, আধো আলোতে দেখে বুঝলাম সে বাঘিনী।শুয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ল, তার গা থেকে লতা পাতার ভেজা তাজা গন্ধ আসছিল।একটি বন্য প্রাণীর গন্ধ যা আমাকে মোহিত করেছিল সাময়িক ভাবে। প্রথমে গা ভেজা ছিল, তার ত্বক থেকে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়ে, আমার চারপাশে এক গভীর শীতলতা সৃষ্টি করেছিল।
রাতে আমি ভাল ঘুমিয়েছি। সেও ছিল চুপচাপ এবং মনেহয় তারও ভাল ঘুম হয়েছে।
সকালে যখন তার ঘুম ভাঙল,সে ঘর থেকে বেরিয়ে,নদীটার দিকে তাকিয়ে রইল,যেটা সাতরে সে এসেছিল।
আমি তাকে,আমার কাছে আসবার জন্য ইশারা করলাম এবং কিছু মাংস খেতে দিলাম।
আশা করেছিলাম,সে হয়তো কাছে এসে আমার সাথে কিছু কথা বলবে, কিন্ত সে ছিল নীরব; তবে সময়ে সময়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল ,চোখ দেখে মনে হচ্ছিল কিছুই বলার নেই তার। অবশেষে. আমি তার সাথে কথা বলার প্রত্যাশা ছেড়ে দিলাম।
আমি তাকে বলতে গেছিলাম,
‘বেশ কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে বাইরে যাব, তোমাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমার না ফেরা পর্যন্ত, তা বেশ কিছুদিন হতে পারে,তুমি কি বাড়ির বাইরে না ভিতরে থাকতে চাও?
আমি দরজাটি তালাবন্ধ করব কিনা জানতে চাইলাম? সে কোন উত্তর না দিয়ে শুয়ে পড়ল দ্বারপ্রান্তে, আমি জানতাম যে আমার ঘর বন্ধ করার দরকার নেই, আমি একাই চলে গিয়েছিলাম।
ফিরে এসে আমি দেখি,সে খোলা চোখে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে উঠে বসল।
বাড়িটি যেমন ছিল তেমনি আছে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম এবং তার জন্য আমি কিছু মাংস নিয়ে এসেছি, জানালাম।ধরে নিয়ে ছিলাম যে সে আমার ভাষায়,আমার কথা বুঝতে পারছে।
তার কিছুদিন পর আমি যখন নদীর ধারে মাছ ধরতে যেতাম তখন সে প্রায়ই আমার সঙ্গে যেত,গিয়ে পাশে বসে থাকত। আমি যে মাছটি ধরতাম,তা মনোযোগ দিয়ে দেখতো।
যখন আমি বনের মধ্যে কাঠ কাটতে যেতাম (সেখানে সে ছিল)সেও আমার সঙ্গে যেত এবং প্রতি রাতে সে আমার পাশে শুয়ে ঘুমাত। তারপর সে একদিন আমাকে ছেড়ে চলে গেল কিছু না বলে, এক ভোর বেলা।
সে যাবার আগে আমাকে স্পর্শ করে জাগাতে চেষ্টা করেছিল এবং তাকিয়ে ছিল আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে. আমি বুঝতে পারিনি মোটেই যে সে চলে যাবে , তারপর সে ধীরে ধীরে উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে, নদীর দিকে বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল দেখে, আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সাঁতার কেটে নদীর ওপারে সে চলে গেল। তখনও টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল।
আমি ভাবতে পারিনি যে চিরদিনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
আমি এখনও আশা করি যে সে আবার ফিরে আসবে আমার কাছে।
আমি আজকাল আর নদীতে মাছ ধরতে যাই না,
বা যাই না বনে কাঠ কাটতে।
আমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি,আর ভাবি তার কথা। যেদিন সে প্রথম এসেছিল,মনে পড়ে যায়। আনন্দ যেন সে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলে গেছে।
আজকাল আমি ঘুমোতে যাওয়ার আগে, একবার হলেও তার কথা ভাবি। ভাবি,যে একদিন হয়তো সে ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে থাকবে। ঘুমের মধ্যে,আমি তার গাঢ় শ্বাস ফেলার শব্দে জেগে উঠে তাকে দেখতে পাব।আমি একাই শুয়ে থাকি আজকাল।ঘুম আসে না আর, তার কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে যায়।
আমি বাইরে বেরিয়ে এসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি একদৃষ্টিতে তার ফেরার প্রতীক্ষায়।