একটা চৌকির ওপর এক বৃদ্ধ শুয়ে আছেন।অল্প ফাঁক করা মুখ।হাতের কাছে বেডপ্যান।
উনি আমার জ্যাঠামশাই।ওঁর সঙ্গে দেখা করতেই আজ গ্রামের বাড়িতে এসেছি।গতকাল জেঠিমা মারা গেছেন।ঠিক কী কী ঘটনা ঘটেছিল তা নিয়ে আর এক পর্ব কথাবার্তা হচ্ছে জেঠতুতো দাদাদের সঙ্গে।বাড়িতে অন্য দু-চারজন আত্মীয়স্বজনও আছে।যারা এ গ্রামেই কাছাকাছি থাকে।শুনতে শুনতে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।আমি বুঝে উঠতে পারছি না এবার ঠিক কী বলা উচিৎ। কিভাবে স্বান্তনা দেব,কী কী বাক্য বলব যখন ভেতরে ভেতরে গোছাচ্ছি একটা বাচ্চা ঘরে ঢুকল।জেঠতুতো দাদার মেয়ে।সে নেহাতই শিশু।বয়েস ছয়।কিছুই বোঝে নি।মৃত্যুকে সেভাবে কেই বা কবে বুঝেছে।এসেই প্রশ্ন করল,দাদু,ও দাদু!
যে লোকটা বেডপ্যান নিয়ে শুয়ে আছে,যে লোকটার স্ত্রী একদিন আগে মারা গেছে,এতদিন সংসার করার স্মৃতি যার বারবার মনে পড়ছে,মনে পড়ছে পুরনো খুনসুটি থেকে রাগ কিংবা অভিমানের সেসব দাম্পত্য কথা,সে মানুষ এ অমোঘ প্রশ্নের কী উত্তর দিতে পারে?
আমি জ্যাঠামশাইয়ের দিকে ফিরে তাকালাম।জ্যাঠামশাই নির্লিপ্তভাবে বললেন,ভালো।
আজ জ্যাঠামশাইয়ের ওই একটা শব্দ আমাকে অনেকক্ষণ চুপ করিয়ে রেখেছিল।আমি শিখলাম,ছোটদের সামনে কখনো ভেঙে পড়তে নেই।তাদের ভেঙে দিতে নেই।শত দুঃখ আর যন্ত্রণার মধ্যেও তারা যেন ভাবে আলো আছে। আলো আছে সামনে।
যখন ফিরছি, দেখলাম, মাঠের ওপর,গাছের ওপর বিকেলের রোদ নরম হয়ে এসেছে।আলো ক্রমশ কমতে কমতে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।সূর্যাস্ত হচ্ছে দূরে কোথাও…
গাড়িটা খেজুরি থানার মোড় থেকে বাঁক নিয়েই জোরে দুলে উঠল।এদিকটায় রাস্তা এত খারাপ বারবার গাড়ি জার্কিংয়ে দুলে উঠছে।জানলার দিকে আনমনে তাকিয়ে ছিলাম।জেঠিমার মৃত্যু নিয়ে একটু ভার হয়ে ছিল মন।একটু থতমত খেয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকালাম। আরে একটু দেখে চালাও। এবার তো টায়ারটা যাবে। ড্রাইভার চোখ না সরিয়েই বলল,দেখছেন তো,এখানে রাস্তা কী খারাপ।তার ওপর আবার লোকজন হর্ণ দিলেও সরে না।
মেজাজটা বিগড়ে গেল।এজেন্সি থেকে এক একটা এমন ড্রাইভার দেয়, মুখে মুখে কথা বলে।সবাই যে এমন তা নয়।তবে এই ছোকরা বড্ড বেড়ে পাকা।সকাল থেকে দেখছি,কিছু বললেই ওর একটা উত্তর রেডি।এদিকে আবার রাস্তাও চেনে না।আসার সময় পাশকুড়া দিয়ে ঘুরিয়ে এনেছে।ভুল রাস্তা দিয়ে এতটা ঘোরানোর জন্য যখন ওকে বললাম,আরে তুমি রাস্তা চেনো না? তখনো ও একটা রেডিমেড উত্তর দিয়েছিল, আমি ভেবেছিলাম ,আপনিই রাস্তা চেনেন।বলে দেবেন।
– আরে আমিই যদি সব রাস্তা বলে দেব তো তোমায় কী জন্য হায়ার করলাম!এত রাস্তা মনে রাখা যায়!
– কী করব? দাঁড়াব? ড্রাইভারের কথায় সম্বিত এল।সকালের স্মৃতি থেকে বর্তমানে ফিরে এলাম।সামনে তাকিয়ে দেখি,একটা লোক সামনের রাস্তায় হাত নাড়ছে। ড্রাইভার আবার বলল,কী করব? দাঁড়াব?
– দাঁড়াও।
লোকটা জানলার কাচের কাছে এগিয়ে এসে বলল, আমাকে একটু লিফট দেবেন? প্লিজ! আমি নন্দকুমার ব্রিজের আগে নেমে যাব।
একটু ভাবলাম।গন্ডগোলে লোক নয়তো! একপলক দেখলাম।সাধারণ চেহারা।গ্রাম্য, কিন্তু একটু শহুরে হবার চেষ্টা আছে।মানে পোষাক তাই জানান দিচ্ছে। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম,আকাশ কালো হয়ে এসেছে মেঘে। বৃষ্টি পড়ছে সামান্য। টিপটিপ করে।বললাম, উঠে আসুন।
উঠেই লোকটা ধপাস করে ওর পিঠের ব্যাগটা ওর আর আমার মাঝের বসার জায়গায় রেখে দিল।আমি বললাম,ব্যাগটা পেছনে রাখতে পারেন।লোকটা একটু ইতস্তত করে বলল,ও সরি।
ব্যাগটা পেছনে রাখার সময় মনে হল, ওর ব্যাগে শুধুমাত্র গোলাকার কিছু একটা আছে।ঢকঢক করছে।আমি জানলার দিকে মুখ ফেরালাম।
একটা গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট খুলে লোকটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো, সিগারেট? বললাম,না ঠিক আছে।
– আপনার কি চলে না? মানে ননস্মোকার?
হাত বাড়িয়ে একটা তুলে নিলাম।লোকটা একটা দেশলাই জ্বালালো। নিভে গেল হাওয়ায়। দ্বিতীয় আর একটা জ্বালানোর চেষ্টা করল।কিন্তু সেটাও নিভে গেল।গাড়ি ছুটছে আর জানলা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে। তৃতীয়টা জ্বালাতে যাবে,আমি পকেট থেকে লাইটারটা জ্বালিয়ে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
সিগারেটের প্রথম টানটা দিয়ে লোকটা আমার লাইটারের দিকে তাকিয়ে বলল,বাহ। এই মিউজিকটা কিন্তু দারুণ। ও আমার নামটা বলা হয়নি।আমি ব্রহ্মজিত মাইতি।মনে করাই,সেই যে, বন্ধুরা আমায় ছোটবেলায় ব্রহ্মদৈত্য বলে ডাকত…
-ডাকতো মানে?
– ডাকতো মানে,আগে।ছোটবেলার কথা।এখন তো আর…
– কী?
– মানে, জানেনই তো, এখন আর ডাকার সুযোগ কোথায়?
– কেন?
– মানে, আর তো কেউ নেই।আসলে কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ আর বিশেষ…
– কেন?
লোকটা একটু এদিক,ওদিক তাকাল।তারপর একটু ঝুঁকে বলল,আমি এমন একটা জায়গায়, এমন বাজে অবস্থায় আটকে গেছি, বুঝলেন, কারুর সাথেই আর কোনও যোগাযোগ করতে পারছি না।মানে চাই,কিন্তু কিছুতেই করতে পারি না।
-হুম।
– একই জায়গায় আটকে আছি।আর ভাল লাগছে না।
– কর্মক্ষেত্রে ট্রানসফার সংক্রান্ত বিষয়?
– না, না, না, একেবারেই নয়।ব্যাপারটা বোঝাতে পারলাম না।আসলে…
এই এই কী করছেন কী, বলে হুমড়ি খেয়ে বিপদকালীন তৎপরতায় সটান দরজাটা বন্ধ করলাম।কাচটা আর একটু তুলে দিলাম। লোকটার গায়ের কাছ থেকে সরে আসার সময় বুঝতে পারলাম, একটা আঁসটে গন্ধ আছে ওর গায়ে।সেসব অগ্রাহ্য করে উত্তেজিত হয়ে বললাম, কী চাইছেন কী আপনি?এক্ষুনি একটা বিরাট বিপদ ঘটত…
লোকটা চুপ করে গেল।বসে রইল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে।বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, বৃষ্টির বেগ বাড়ছে।জানলার কাচের ওপর জল এসে ঝাপসা করে দিচ্ছে চারপাশ। আমাদের গাড়িটা শা শা করে সামনে এগোচ্ছে।বাইরেটা অন্ধকার। শুধু উল্টোদিক থেকে আসা লরি বা বাসের আলো চোখে এসে পড়ছে।একটা বাজার বোধহয় পাস করল।মনে হল,অন্ধকার সমুদ্রে যেন একটা দ্বীপ জেগে উঠেছে।আলো জ্বলছে।সেই আলোয় তাকিয়ে দেখলাম, লোকটা আমার দিকেই কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
বড্ড অস্বস্তি হল।বললাম, হ্যাঁ, কী একটা বলছিলেন যেন!
যেন ঠিক এ মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষায় ছিল লোকটা। বলল, হ্যাঁ, ওই আটকে থাকার ব্যাপারটা।
– হ্যাঁ, বলুন।
– বলছিলাম, এবার আর ভাল লাগছে না।তিন বছর হয়ে গেল।একটু যদি…লোকটা থেমে গেল।
– একটু যদি! আমি জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকালাম ওর দিকে।
– আর কতদিন এই ব্যাগটা নিয়ে ঘুরব বলুন তো? এবার তো একটা সমাপ্তি দরকার।
– হুম।
তাল দেবার জন্য সায় দিলাম।
– কী হুম! আপনি তো চাইলে পারেন! একটু দেখুন না যদি!
কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়লাম।একটা লোক।যাকে চিনি না,জানি না,তাকে কী আবার দেখব! এই তো মুশকিল।খেতে পেলে শুতে চাই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। লিফট চাইল।দিলাম।এখন আবার,একটু কথা যেই বলা শুরু করেছি,একটু দেখুন না বলে ধান্দাবাজি শুরু করেছে।আশ্চর্য তো! কী চায় ?একটু বিরক্তি নিয়ে ওর দিকে তাকালাম।বললাম,কী চাইছেন বলুন তো?
– বলছিলাম, আপনি চাইলেই ব্যাপারটা মিটে যায়।মানে,যাহোক, একটা সমাপ্তি তো হয়।নইলে ব্যাগটা কিন্তু দিন দিন ভারি হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আমি আর পারছি না।
কী বলব, বুঝতে পারলাম না।হুম।টাকাপয়সা চাইবে মনে হচ্ছে। একটু খেলানো দরকার। ওকে একটা সিগারেট অফার করে নিজেরটা ধরাতে ধরাতে বললাম,কী আছে ওই ব্যাগটাতে, যা দিন দিন ভারি হয়ে যাচ্ছে?
– আরে মানসী,মানে আমার বৌয়ের কাটা মুন্ডুটা।যাকে খুন করলাম।আরে ওই যে,শহর থেকে ফিরে যেদিন হাতেনাতে ওদের অবৈধ সম্পর্কটা ধরে ফেলেছিলাম… সেদিন রাতে।মনে নেই আপনার?
বুকটা ধড়াস করে উঠল। আমার হাত থেকে সিগারেট পড়ে গেছে। লোকটা সিগারেটটা আমার পায়ের কাছ থেকে তুলে দিতে দিতে বলল, এটা ধরুন…আসলে, আপনাকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই।এতগুলো চরিত্র নিয়ে ঘাটেন,কতগুলোই বা আর মনে রাখবেন!কিন্তু আমার অবস্থাটাও ভাবুন।তিনবছর আগে খুন করেছি,এখনো একইভাবে ব্যাগে মুন্ডুটা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।এরপরে কী? যাকে মারতে চাইলাম,মানে ওর প্রেমিকটা,তাকে তো খুঁজেই পেলাম না।এবার তো তাকে খুঁজে দিন।মুখোমুখি করান।শুয়োরটাকে কিমা করি, নয়তো আমার শাস্তির ব্যবস্থা করুন।এরকম আধখেঁচড়া করে রেখে দিলে তো…
গেট খুলে লোকটা নেমে, হাত বাড়িয়ে পেছন থেকে ওর ব্যাগটা টানল।ব্যাগের একটা অংশ আমার গায়ে লাগতেই আমি শিউরে উঠলাম।গাড়ির গেট বন্ধ করে লোকটা একটু হাসল।তারপর বলল, সিগারেটটার জন্য ধন্যবাদ।ব্যাপারটা কিন্তু একটু দেখবেন। আসি।
লোকটা পেছন দিকে চলে গেল।বুঝলাম,আমার গলা শুকিয়ে গেছে।জলের বোতলটা হাতে নিলাম। ঢকঢক করে জল খেতে লাগলাম।ছবার জোরে জোরে শ্বাস নিলাম।আর কোনোদিকে তাকানো ঠিক হবে না। ড্রাইভারকে বললাম, আরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? স্টার্ট দাও।চল।
ড্রাইভার এই প্রথম কোনও উত্তর দিল না। চুপ করে বসে রইল। চেচিয়ে উঠলাম, আরে কী হল? চলো।
– আজ একটা হেস্তনেস্ত হোক। আপনি চান বা না চান।
-মানে?
-মানে এ গল্পটা আজই শেষ হোক।
-কী গল্প? কী বলছো বলো তো?
– তিনবছর ধরে আমিও অপেক্ষা করেছি।আর নয়।
– কী বলতে চাইছ তুমি? আমি তো…
– সেদিন মানসীর সাথে ওভাবে ধরা পড়ার পর আমি সোজা কলকাতায় পালিয়ে গেছিলাম।লুকিয়ে ছিলাম আটমাস।তারপর খিদের জ্বালায়, ড্রাইভিং শিখে হিমাংশুদার ড্রাইভার এজেন্সিতে কাজ নিয়েছিলাম।এত অবধিই তো আপনি লিখেছিলেন। কিন্তু তারপর? মানসীকে যে ওর স্বামী মেরে ফেলেছে,সেটা তো আপনি আমাকে জানাননি।আপনি গল্প লেখক বলে যা খুশি তাই করবেন? আমার প্রেমিকাকে ওই পাষান্ডটার হাতে কেন খুন হতে দিলেন? এই কি আপনার বিচার! এই আপনি বিখ্যাত গল্পলেখক? ও তো আমার ছোটবেলাকার প্রেমিকা ছিল।ওর বাবা ওকে জোর করে লোকটার সাথে বিয়ে দেয়।আমাদের সম্পর্কটা তো ওর বিয়ের অনেক আগের…এ সম্পর্কের জন্য মানসী কেন শাস্তি পাবে? না। এ আমি মানিনা। ওর স্বামীকে আমি ছাড়ব না।আজই ওর বুক চিরে আমি মানসীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। তিনবছর আগে যে গল্পটা আপনার ডায়েরির পাতায় অসমাপ্ত রেখে দিয়েছিলেন,আজই তা শেষ করার দিন। আপনি লিখুন।আমি চললাম।লোকটাকে আর আজ আমি ছাড়ব না।
– এ-এ কী করছ তুমি? শোনো।হ্যালো! মানছি আমি গল্পটার কথা ভুলে গেছিলাম,কারণ অন্য একটা উপন্যাস নিয়ে…আরে শোনো, কোথায় যাচ্ছ? এভাবে অন্ধকারে আমাকে ফেলে..ফিরে এস, ফিরে এস বলছি। আরে,আমি বাড়ি ফিরব।ফিরতেই হবে।এই যে ভাই,শোনো।যেওনা। আমাকে এভাবে ফেলে যে-ও-না-না।