T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় শাম্মী আকতার

মায়ের বাকশো
সূর্য তখনও আলসেমিতে মোড়ানো, অরূপ আভা বুকে ধারণ করা অপরূপা পূর্বাকাশ। হু হু বাতাস, এলিয়ে দিচ্ছে চুল। খালি পা ঘাসে ডোবালেই ঝাঁক ঝাঁক ছুটে পালাচ্ছে এদিক ওদিক। চোরকাঁটায় শাড়ির পাড় মোড়ানো । বাবুই হাঁটছে। এই হাঁটা শেষ না হোক, অনন্ত অসীমে হারিয়ে যাক একটা জীবন। সর্পিলাকার বংশী নদী, হীম জড়ানো তার মায়াবী রূপ। কিঞ্চিৎ আলো জল ছোঁয়া সোনালি আবেশে রীতিমতো অহংকারি বংশী। ঘাস ভেদ করা শীতল মাটি হীম ছড়াচ্ছে দেহের ভেতর অবধি। কেঁপে কেঁপে উঠছে বাবুই। তবু সে কাঁপন রোধ করছে না যাত্রাপথ। নদীর ঘোলাটে জল বুকে নিয়ে তার অস্পষ্ট আলো ক্ষুদে ঢেউয়ে চমক তুলছে। বাবুই হাঁটছে। গন্তব্য অজানা। অজানাই থাক আরও অনেক কিছু। জল ভেদ করা ছোট্ট মাঁচা শেষমেষ ঠিকানা হয়ে ওঠে। শাড়ির পাড় সমেত পদ যুগল বংশীর বুকে আধো ডোবা আধো ছোঁয়া। বিভ্রান্ত বাবুই খুঁজতে থাকে, কোথায় তার ঠিকানা! সে কে! কেনই সে এলো এই পৃথিবীতে!
গত পরশু মা গত হয়েছেন। চার ভাইবোন একত্র হওয়া সেই সুবাদে। মায়ের রোগাক্লিষ্ট দেহ ইহলোক ত্যাগ করা যতটা না কঠিন তার চেয়েও কঠিন করে গেছে মায়ের রেখে যাওয়া কিঞ্চিৎ সম্পদ ও এক টিনের বাকশোটা।
পরশু রাতেই ভাইবোনরা বসেছিল বসতবাড়ি, তিন খণ্ড জমি আর দুগাছা গয়নার ভাগবাটোয়ারায়। বাবুই যদিও এসবে উৎসাহী নয় তবু পরিবারের বড় মেয়ে, বসতে হয়েছিল সকলের চাওয়াকে কেন্দ্র করে। খুব স্বার্থপর লোভী মনে হয়েছিল নিজেকে। অথচ ছোট ভাইবোনরা কী অবলীলায় অকপটে বলে যাচ্ছিল, কার কী চায়।
‘এই তো মা চলে গেলেন আর আজই আমরা এসব নিয়ে পড়লাম,’ বলতেই একমাত্র ভাই পলাশ খেঁকিয়ে উঠেছিল, ‘বড়পা একটু প্র্যাকটিক্যাল হও। আমাদের কারো হাতে এতো সময় নেই যে বারবার এখানে এসে এসব নিয়ে বসব।’
সহমত ছিল বাকি দুই বোনও। অভাব নেই কারও। তবু নাকি এসবই স্মার্টনেশ। তাদের দরকার নেই কোনো কিছুই। তবু নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে চাইতেই পারে। তারা যাতে সমস্যায় না পড়ে সেজন্যই এতসব করা!
বুঝে না বাবুই, এটুকু ভিটেমাটি, এভাবেই পড়ে থাকলে ক্ষতি কী। বরং যার যখন সময় হবে, সে এসে উপভোগ করবে গ্রামীণ সহজ সবুজ জীবন। গ্রামের স্বাদ পেতে কোথাও কখনও ছুটে যেতে ইচ্ছে করলে তখন সকলে যাবে কোথায়? তাছাড়া এ বাড়ির ঘরদোর, আঙিনা, বরই গাছ তাতে পাখির বাসা, একটা পুরনো দড়ির দোলনা। এই যে উঠোনে কলতলা। যাতে আর পানি উঠে না। এখানেই পা পিছলে পড়ে গিয়ে বাবুইয়ের ওপর পাটির সামনের দাঁতের আধখানা ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন বাবুইয়ের সে কী কান্নাকাটি। অথচ একটু বড় হতেই সেই দৃশ্য কল্পনা আর গল্পের রসে রসে হাস্যকৌতুকে ভরে উঠত সেই ক্ষণটি। কীভাবে টিউবওয়েলের হাতল ধরে ঝুলে ঝুলে পানি ভরত কলসে আর তা করতে গিয়েই ধপাস। ভাঙল দাঁতের আধখানা। মা মাঝে মাঝে গল্পটা বলত আর সকলে হেসে কুটিকুটি। হাসত বাবুইও। এই যে উঠোনে বরই গাছ। শীতের সকালে ঘুম ভেঙেই দৌড়ে যেতো উঠোনে। যদিও শীত-সকালে ঘুম থেকে ওঠা কষ্ট তবুও ভাইবোনেরা কে কার আগে উঠবে, রীতিমতো পাল্লা। বিছানা ছেড়েই বরই তলায় দে ছুট। রোজ কে কতটা বরই পেলো একটু বেলা হতেই গুণে দেখত সকলে। ভাইটা একটু ঘুমকাতুরে। ওর ঝোলা বেশিরভাগ দিনই শূন্য পড়ে থাকত। বোনরা নিজেদের কুড়নো বরই থেকে তুলে দিতো তাকে। শেষমেশ তার ঝোলাই উপচে পড়তো।
বোশেখের এক ঝড়ে বাজ পড়ে সে গাছ মরে গেছে। বাবা ঠিক একই জায়গায় একই জাতের আরেকটা বরই গাছ লাগিয়েছিল। গাছটা বাবার মনে কতটা স্মৃতি কেটেছিল জানা নেই, তবে মায়ের হাতের সেই বরইয়ের আচারের প্রশংসা ছিল পুরো এলাকা জুড়ে। হয়তো বাবা সেই আচারের টানেই জাতটাও নড়ে যেতে দেয়নি। সেটাই এখনও আগের স্মৃতিকে তাজা করে রেখেছে।
ভাগবাটোয়ারা মানে এই স্মৃতিগুলোও ভাগ হয়ে যাওয়া। সাই দেয় না বাবুইয়ের মন। তবু সকলের প্র্যাকটিক্যাল হওয়ার তোড়ে চাপা পড়ে যায় ছেলেবেলা, চাপা পড়ে যায় আবেগ অনুভূতি।
বাবুই ছেলেবেলা থেকেই একটু অন্যরকম। আত্মভোলা, সরল সোজা। বিষয়সম্পদের সাতেপাঁচে নেই কোনোকালেই। প্রকৃতি তাকে টানে। তার বেখেয়ালিপনা নিয়ে হাসাহাসি করে সকলে। সে বড় হলেও ছোট ভাইবোনরা চিরকালীন তার অভিভাবক। সকলে শাসন করেছে যে যার মতো। শুধু মা তাকে বুঝত। খুব আগলে আগলে রাখত। বাবুই কিছু করলেই হোক সেটা খুবই তুচ্ছ তবু মা প্রসংশার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত। তার কিছু খামখেয়ালিপনায় মাঝে মাঝে সকলে তাকে এড়িয়ে গেলেও মা তার মূল্য দিত। মাঝে মাঝে বাবুই দেখত, তার হাতেগড়া মাটির হাতি ঘোড়া এসব মা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। বাবুইয়ের মনে হতো, একমাত্র মা-ই এই বাড়িতে শিল্পের মর্যাদা বোঝে, আর বাকি সকলে যা তা। বাবুই সবচেয়ে বেশি অবাক হতো, কথা নেই বার্তা নেই, মা তাকে বুকে জড়িয়ে সকলের আড়ালে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বিষয়টা যে কাউকে বলা যায় না, তা সে ছেলেবেলাতেই ঠিক বুঝে গিয়েছিল। কাউকে কক্ষনো বলত না, মায়ের গোপন কান্নার কথা। এমনকি বাবুই নিজেও কোনোদিন মাকে প্রশ্ন করেনি, ‘কেন কাঁদছে মা?’
ও যত বড় হতে থেকেছে, মায়ের কান্নাও কমে যেতে দেখেছে। তবে মা শেষ বয়সে বড্ড বাবুই বাবুই করত। তাই তো বাবুই মাঝে মাঝেই ছুটি নিয়ে চলে আসত মায়ের কাছে। কটাদিন থাকত। শেষদিকে মা আর কথা বলতে পারত না। শুধু শরীরের একটা অংশ নাড়াতে পারত। মুখে কথা না থাকলেও বাবুই বুঝত, মা তাকে কাছে পেতে চাইছে। ছুটে আসত। মা স্থির দৃষ্টিতে বাবুইয়ের মুখখানা দেখত, চোখ মুখ চিবুক, দেখত মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। স্পর্শ করত। মায়ের স্থির দৃষ্টির কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ত চঞ্চল জল।
ছোট বোন কপট রাগে বলত, ‘বাবা মার সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পায় ছোট জন। কিন্তু আমাদের বেলায় উল্টো। সব আদরগুলো বড়পা তোমার জন্য।’
ভাগবাটোয়ারার মাঝে বাবুই শুধু বলেছিল, ‘মার একটা ছোট টিনের বাকশো আছে। ওটা আমায় দিস।’ মেজো বোন বাগড়া দিলো তাতে, ‘বড়পা, জানো তো, মেয়েরা সবচেয়ে তুচ্ছ জায়গার তার যক্ষের ধন লুকিয়ে রাখে। ওতে সোনাদানা টাকা পয়সা থাকলে?’
বাবুই একটু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিল বটে। পরক্ষণেই মনে হয়, আসলেই তো, আজ তো সকলের সম্পদ ভাগের দিন। সেই তুচ্ছ বাকশে গুপ্তধন থাকতেই পারে। কেন ছেড়ে দেবে ওরা এই ধন। লজ্জা পেয়েছিল শেষে। বলেছিল, ‘সকলেই একসঙ্গে খুলে দেখব, তেমন কিছু পেলে অবশ্যই তার ভাগ হবে।’
আর থাকতে পারেনি বাবুই সম্পদ ভাগের সেই আলোচনায়। সে চলে আসলেও আলোচনা চলে মধ্য রাত অবধি। প্রথম প্রথম গুরুগম্ভীর রূপে শুরু হলেও শেষ পর্যায়ে সেটা হাসি তামাশায় রূপ নেয়। থমকে থমকে হাসির হুল্লোড় বাবুইয়ের কানে এসে ঝড়ের ঝাপটার অনুভূতি দেয়। যতটা হাসির রোল বাড়ে বাবুই ততটা একা হতে থাকে। আনমনে আবারও পেছন ফিরে তাকায়। স্পষ্ট হয়ে ওঠে ছেলেবেলার চৈত্রের দুপুর। খাওয়াদাওয়া সেরে সকলে দিবানিদ্রায় গেলে মা তার বাকশোখানা খুলে বসত। কেউ আসছে পায়ের শব্দ পেলেই ঝপ্ করে বাকশোর ডালাটা নামিয়ে নিতো। বাবুই যখন খুব ছোট তখন মা বাবুইয়ের সামনেই খুলে বসত। বাবুই দিনে দিনে যত বড় হতে লাগল মার বাকশো খোলার দৃশ্যও তত কমে যেতে শুরু করল। হয়তো মা তখনও রোজ নিয়ম করে খুলত কিন্তু অন্য আর দশজনের মতো বাবুই এলেও বন্ধ করে দিতো। মায়ের এতো যত্নে রাখা ধন, সে আগলে রাখবে সারাজীবন। জাগিয়ে রাখবে মায়ের শেষ স্মৃতিটুকু।
ভাই-বোনদের আলোচনা শেষ হতেই বাবুইয়ের ডাক পড়ে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে কার ভাগে কতটা সম্পদ যাওয়া উপযুক্ত তার বয়ান দেয়। জমিজমা, পুকুর, বড় বাজারের দোকান সব ভাগবাটোয়ারা শেষে এ বাড়ি ভাগে যথেষ্ট হিমশিম খেয়েছে সকলে, কথা শুনলেই বোঝা যায়। তার দাদা-বাবার পৈত্রিক বাড়ি বড্ড অল্প জমির ওপরে। এটুকু বাড়ি কীভাবে ভাগ হবে! হলেই বা কে কতটুকু পাবে। আর পেলেও ঠিক ঠাক কোনো ভদ্রস্থ মাপজোকের বাড়ি হবে না কারো। তাই হাল ফ্যাশানের নিয়ম অনুযায়ী এ বাড়ি ভেঙে এপার্টমেন্ট উঠবে। কে কোন ফ্লোর পাবে সেটা জানান দিয়ে বাবুইয়ের মত জানতে চায় সকলে। মন সাই না দিলেও মত দিতে বাধ্য, ‘দেখ, যেটা তোদের ভালো মনে হয়। তবুও বলি কী, এটা আমাদের চার ভাই বোনের স্মৃতিমাখা বাড়ি। এখানে আসলে আমরা আমাদের সেই ছেলেবেলায় ফিরে যাই। থাকত না হয় এই বাড়িখানা এমনই।’
তিন ভাইবোন সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে, ‘এই জঙ্গলে এসে থাকবে কে? তবু একটু জাতের বাড়ি করলে ছেলেমেয়েরা এসে দুদিন গ্রামের স্বাদ নিতে পারবে।’
বাবুই দীর্ঘ শ্বাস চাপা দিয়ে বলে, ‘হ্যঁ, ঠিকই বলেছিস, গ্রামের স্বাদ!’ গ্রামের স্বাদ পেতে ছেলেমেয়েরা অট্টালিকায় এসে উঠবে। বলি বলি করেও এ কথাটুকু আর বলা হয়ে ওঠে না বাবুইয়ের।
ছোট বোন, ছেলেবেলা থেকেই একটু ছটফটে। কথাও বলে কাটাকাটা। মায়ের গয়নাগাটি তার দখলে। সেই বাড়তি গয়নার খোঁজে বাবুইকে বলে, ‘বড়পা মায়ের টিনের বাকশোটা খোলো, দেখি তাতে কিছু আছে কিনা।’
মায়ের এতো আগলে রাখা বাকশো, সেটা নিয়েও হবে ভাঙাচোরা! তবু কিছু করার নেই। হিসেবি ছ’খানা চোখ তখন চকচক করতে থাকে বাড়তি কিছুর আশায়।
অগত্যা সকলের সমুখেই খোলা হয় মায়ের গোপন বাকশো। ডালা খুলতেই চোখে পড়ে এলোমেলো খুবলে যাওয়া একটি কাঠের লাটিম। পলাশ হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে, ‘আরে এ তো আমার!’ তার লোভী চোখ হঠাৎ করেই একদম শিশু হয়ে যায়। ভালো লাগায় ঝলমল করে ওঠে। একে একে বেরিয়ে আসে কারো প্লাস্টিকের পুতুল তো কারো এলুমিনিয়ামের ছোট্ট হাঁড়িপাতিল। সকলে নিজের ছেলেবেলা পরখ করতে থাকে, তুচ্ছ খেলনাবাটির সঙ্গে মিশে থাকা ছেলেবেলা ঝাঁপি খুলে বেরিয়ে আসতে থাকে। আরও বেরিয়ে আসে থরে থরে চিঠি। চার ছেলেমেয়েই কলেজে ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন মাকে চিঠি লিখেছে। মা যত্ন করে এখানেই গুছিয়ে রেখেছে সবরটা। এরই ফাঁকে ছোট বোন একবার উল্টেপাল্টে দেখে নেয় সোনাদানা বা মূল্যবান কিছু আছে কিনা।
অমূল্য জিনিসে ঠাঁসা কিন্তু বাস্তবিক মূল্যবান তেমনকিছু না পেয়ে ধীরে ধীরে সকলের কৌতূহল দমে আসে। রাত গভীর হয়েছে এই বলে যে যার ঘরে চলে যায়। বাবুই তখনও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজার চেষ্টা করে মায়ের স্পর্শ। বোঝার চেষ্টা করে, তাদের ছেলেবেলাই যখন মা এখানে বন্দি করে রেখেছিল তখন এতো আড়াল কেন! হঠাৎ চোখে পড়ে হাতে গড়া মাটির কিছু খেলনা। হাতি ঘোড়া টেপা পুতুল। নেড়েচেড়ে দেখে। তার নিজের গড়া। তবু খটকা লাগে। মনে হয়, ঠিক তার নিজের মতোই তবু যেন নিজের না। সে মাটির পুতুল গড়লেই তাতে রং করত। কখনো শিমের পাতা তো কখনো পুঁইয়ের বীজের। কিন্তু এ পুতুলগুলোতে কোনো রঙ নেই। সে বাকশের আরও গভীরে যায়। চিঠি আর চিঠি। কত আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, ভাই বোন সকলের চিঠি। চিঠির রাজ্যে ডুবে যায়। বেরিয়ে আসে আরও কিছু নাম-না-জানা চিঠি। কিছু চিঠি মায়ের নিজের হাতে লেখা অথচ মা সেগুলো পোস্ট করেনি। অদ্ভুত! এক এনভেলপের গায়ে প্রাপকের স্থানে লেখা, অতীশ পাল। তার নিচে কোনো ঠিকানা নেই। একদম তলার দিক থেকে বেরিয়ে আসে আরও তিনখানা চিঠি। হাতের লেখা খুব ঝরঝরে কিন্তু এমন লেখা এ বাড়ির কারোরই না। না মায়ের না অন্য কারো। বাবুইয়ের খুলে দেখতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু কারো ব্যক্তিগত কিছু খুলে পড়বে এ প্রাচীর যেন ভেদ করতে পারে না। আলগোছে তলাতেই পুরে রাখে। তবু এই অতীশ লেখা চিঠিটা মায়ের নিজের হাতের, পোস্ট করা হয়নি। হয়তো মা পোস্ট করব করব করেও করতে পারেনি। হয়তো মা কাউকে কিছু কুশলাদি জানাতে চেয়েছিল, হয়নি। মনে হলো, মায়ের কোনো ইচ্ছা যদি বাবুই পূরণ করে দিতে পারে তাহলে বেশ হয়। পড়ে দেখবে একবার? পড়ে যদি বোঝা যায়, মা কাকে লিখেছিল তাহলে তাকে নাহয় বাবুই পোস্ট করে দেবে। না-পড়ি না-পড়ি করেও হুট করেই পড়া শুরু করে বাবুই।
অতীশ,
কেমন আছ তুমি? কতদিন দেখিনি। খুঁজে চলেছি পাগলের মতো। তোমার বন্ধু বান্ধব সকলের কাছে গেছি। বাবা মার চোখের আড়ালে গিয়ে রোজ পীযুষদের বাড়ির পাঁচিল ঘেঁষা বকুল তলা, যেখানে রোজ চিঠি রাখতে, সেখানে গেছি প্রায় দু’বেলা। মন্দিরা পিসি, যাকে দিয়ে গড়িয়ে নিয়েছিলে সোনার কানবালি, পরিয়ে দিয়েছিলে তোমার চিহ্নস্বরূপ, রোজ ছুটে গেছি তার কাছেও। কেউ জানে না তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ? মনে কি পড়ে না একবারও আমায়? জানতে কি ইচ্ছে করে না, আমি কেমন আছি? তোমার অন্তত একটা খবর আমার যেমন জানা জরুরি ঠিক তেমনি তোমাকেও একটা খবর দেয়া জরুরি।
বাবা মা আত্মীয় স্বজন সকলে পাগলপারা। বিয়ে দেবে যেকোনো মূল্যে। আজ নাহয় কাল। কানা খোড়া যা পায় তাকেই ধরে বিয়ে দেয়া হবে। এই চরম মুহূর্তে তোমাকে জানাতে পারছি না এই খবরটা। পারছি না এই খবর না জানিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতেও। খবরের যতটা আমার, ঠিক ততটা তোমার। তাই সে খবর তোমায় না জানিয়ে কিছুতেই আমি মরতে পারি না।
কোনো ঠিকানা রেখে যাওনি তুমি। শুধু একদিন তোমার বন্ধু সমরের কাছে শুনলাম, পাকসেনারা তোমাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। সে রাতেই তোমরা সব ফেলে শুধু প্রাণ নিয়ে চলে গেছো অন্য কোনোখানে। সেও জানাতে পারেনি, তোমরা কোথায় আছ, কেমন আছ। আর ফিরবে কিনা তাও জানে না কেউ।
আচ্ছা বলো তো, আমায় এ অবস্থায় একা ফেলে যেতে তোমার মন কাঁদেনি? তুমি সেই রাতেই একটি বার এসে জানান দিতে পারতে, অন্তত একটিবার এসে বলতে পারতে, এই আমাদের শেষ দেখা। বিশ্বাস করো, আমিও হয়তো এক কাপড়ে তোমার সঙ্গেই চলে যেতাম কারো তোয়াক্কা না করে। কারণ এ অবস্থায় আর এখানে থাকা যায় না। এখন আমি তো আর আমি না। আমি এখন আমরা। আমাদের ফেলে কীভাবে তুমি চলে যেতে পারলে? অন্তত একটা চিঠি দিয়ে তোমার ঠিকানা জানাতে পারতে। আমি সত্যি বলছি, ছুটে যেতাম সেখানেই। কারণ আমি চাই না আমাদের সন্তান অন্য কারো পরিচয়ে বড় হোক, অন্য কোনো পরিবারে বড় হোক। ফিরে এসো অতীশ। তুমি ছাড়া আমরা সম্পূর্ণ একা।
ইতি
তোমার
রেহানা
বিঃদ্রঃ – মনে আছে, বলেছিলে ছেলে হোক মেয়ে হোক, নাম রাখবে বাবুই? তোমার শেষ স্মৃতি, আমি আগলে রাখব, কথা দিলাম।
হঠাৎ পৃথিবী থমকে যায় বাবুইয়ের। পয়ের তলায় মাটি সরে যায়! কে সে? তাহলে এই ঘরবাড়ি! যেগুলো আগলে না রাখতে পারার শোকে আজ সে মর্মাহত। এই ভাইবোন, যারা তার একান্ত আপন! এই বরই গাছ, কলতলা যেগুলো তার ছেলেবেলা! এগুলো তার কিচ্ছু না! ও এ বাড়ির কেউ না! বিক্ষিপ্ত প্রশ্নবাণে সারারাত বিচলিত বাবুই। এতো মায়া, এতো ভালোবাসা, সকলই কি তাহলে তুচ্ছ? শুধুই অভ্যাস, রক্তের টান নেই মোটে!
ঠিক ভোর হতেই, ছোটবোনকে ধাক্কা দিয়ে ওঠায়। সারারাত জাগরণে উদ্ভ্রান্ত বাবুই এক নিঃশ্বাসে বলে, ‘মায়ের গয়না কার কাছে?’
-‘আমার কাছে, কেন কী হয়েছে? এই সকালে তুমি গয়নার খোঁজ করছ কেন?’
-‘শোন ওতে কি মা’র সেই পুরনো কানবালি জোড়া আছে? যা মা সবসময় পরত?’
-‘আছে তো।’
-‘ভাগবাটোয়ারায় ওটা কার দিকে গেছে রে?
-‘তুমি একটা অদ্ভুত! আমি তো এতোদিন জানতাম গয়নায় তোমার মোহ নেই। অথচ সেই তুমি রাত না পোহাতেই গয়নার খোঁজ! তোমাকে বোঝা বড় দায়! তুমি সত্যি অন্য জগতের মানুষ।’
বাবুই থমকে যায়। সত্যি তো সে অন্য কেউ। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ঝটপট বলে, ‘শোন, ওটা যার দিকেই যাক, মায়ের সেই বালি জোড়া আমায় দিস। আর বাকি গয়নার কিচ্ছু চাই না আমার।’
ছোটবোনের বিস্ময় কাটে না, এই সকালে এভাবে গয়নার কথা তাও আবার অতি সামান্য বালি জোড়া! বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে বাবুইয়ের চলে যাওয়া পথের দিকে। যেখানে চিরচেনা ছাপগুলো ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হতে থাকে।