পরের দিন বেশ সকাল সকালই উঠেছিলাম। আগের দিন বেশ ক্লান্তি ও পরিশ্রম হওয়ার পরেও পরের দিন যেন এক অদ্ভুত এনার্জি ছিল। ঘুমের মধ্যেও যেন বাড়ে বাড়ে এসে ধরা দিয়ে যাচ্ছিল পুরুলিয়ার পাহাড়িয়ারা। অপূর্ব সব পাহাড় মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা পথ, কখনো বা ঝর্ণা।
কিংবা পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা এক অদ্ভুত নগরী। এইসব বিস্ময় নিয়ে ভাবতে ভাবতেই চোখ মেলে দেখি সকালের ফুটফুটে আলো পূব দিক থেকে বিকিরিত হচ্ছে।
এইদিন বেশ সকাল সকালই আমাদের গাড়ি আসার কথা ছিল। আগেই বলেছি যে গাড়ি হোটেল থেকেই বুক করা হয়। কিছুমাত্র নিয়ম ও পয়সার বিনিময়ে। তাই আমরাও হোটেলেই সব বলে রেখেছিলাম।
সকালে যথারীতি সবাই উঠে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিছু মাত্র সময়ের হেরফের যদিও বা হয়েছিল, কিন্তু তা ধর্তব্যের বাইরে।
যেহেতু ওই দিন টা আমাদের পুরুলিয়ার মোটামুটি সব সাইড সিন ই দেখার কথা ছিল, তাই হোটেলে আমরা বেশি সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী ছিলাম না।
আমাদের গাড়ি এসেছিল সকাল ৯টা নাগাদ। আমরা সকলেই সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়েই ছিলাম।
এখানে বলে রাখি, পাহাড়ি এলাকা হলেও খওয়ারের কোন অসুবিধা ছিল না। এখানকার সমস্ত হোটেলেরই নিজস্ব খাওয়ার বন্দোবস্ত ও আছে। সেখানে বলে দিলেই ওরা সব এরেঞ্জ করে দেবে। তাই আমরা সকলে ব্রেকফাস্ট শেষ করে রওনা দিলাম পুরুলিয়ার মোহে।
পুরুলিয়া স্টেশন থেকে পুরুলিয়া হিলটপ তো অবশ্যই দেখার মত যাত্রাপথ ছিল। তবে এই পুরুলিয়া হিলটপ এ আসার পর এবং পাহাড়ের ওপরের দৃশ্য যেন আরও সু-মধুর।
অপূর্ব চোখ জোড়ানো দৃশ্য। চারিদিকে ঘন সবুজে ঢাকা পাহাড়, তার মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা সরু পথ। আমরা উঠে চলেছি আরও পাহাড়ের মাথায়।
প্রথমেই আমরা যেখানে গেছিলাম তার নাম হলো ‘হেভেনস ভিউ”। নামের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে কি অপরূপ দৃশ্য হবে সেখানকার। এবার আসি জায়গার বর্ণনায়।
‘হেভেনস ভিউ’ আসলে হলো এক রূপকথার রাজ্যের মতোই অপূর্ব জায়গা। চারিদিক ঘেরা সবুজ পাহাড়ে। এই হেভেনস ভিউ এর বিশেষত্ব হলো এই জায়গাটা ঘেরা সাত টি পাহাড় দিয়ে।
চারিদিকে পাহাড়ের মাঝে একটি ছোট অংশ বিশেষ। শুধু বর্ণনা করে বোঝানো অসম্ভব। ওখানে আমাদের মোটামুটি সময় লেগেছিল ১৫মিনিট।
তারপর সেখান থেকে আমাদের উড়ন্ত ঘোড়া (গাড়ি) উড়িয়ে নিয়ে এলো সুইসাইড পয়েন্ট এ। নামটা শুনে যতটা বিপদজনক মনে হচ্ছে আদতে সেরকম নয়। এই জায়গার এরকম নাম হওয়ার কারণ হলো, এটা পুরুলিয়ার সব থেকে টপ পয়েন্ট।
এখান থেকে নিচে প্রায় কিছুই দেখা যায় না। নিচটা ধোয়া ধোয়া। কিন্তু চারিদিকে মনমুগ্ধ কর পরিবেশ। এই পয়েন্ট থেকে পুরো পুরুলিয়া শহরটা দেখা যায়। অপার মনরোম হাওয়া।
প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ায় মত। এখান থেকে পুরুলিয়া শহর পুরো দেখতে পাওয়ার পাশাপাশি আরও একটি স্পেশাল জিনিষ দেখা যায় তা হলো কংসবতী নদীর ওপরের মুরগুমা ড্যাম্প। সেটাও দেখার মত একটা স্থান।
কিন্তু দূর থেকে যেন আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। এখানে অর্থাৎ সুসাইড পয়েন্টে কিছুক্ষন কাটানোর পর কিছুটা নেমে এবার এগোলাম মুরগুমা ড্যাম্প ও কংসবতী নদীর উদ্দেশ্যে।
যেতে যেতে রাস্তার ধারে আমাদের মন কেড়ে নেয় রাশি রাশি সব পাহাড়ি ফুল। কি অপরূপ তাদের শোভা। কি সুন্দর তাদের রঙের ছটা। গোলাপি, বেগুনি, হলুদ, লাল বাহারি সব রঙ।
এদের দেখতে দেখতেই রাস্তার ধারে পাই বেনামি এক ঝর্ণা। ঠিক ঝর্ণা বললে ভুল হবে।
আমাদের এক ঝলক দেখে ঝর্ণা মনে হলেও স্থানীয় ও গাড়ির ড্রাইভার এর থেকে তথ্য পাই যে, এর কোন নাম নেই। আর ঠিক ঝর্ণা নয়।
পাহাড়ি এলাকায় চাষ করার জন্য নদী থেকে খাল কেটে আনা হয় চাষের কাজের জলের জন্য। সেই খালই দিনে দিনে সময়ের ধাক্কায় পরিণত হয়েছে ঝর্ণায়। এবং ঘটনাক্রমে অবশ্যই এটি এখন টুরিস্টদের আকর্ষণীয় একটি স্থান।