কবিতায় স্বর্ণযুগে সৌম্যজিৎ আচার্য (দীর্ঘ কবিতা)

ফেরা

এবার পুজোয় আর বাড়ি ফেরা হবে না মা।
এবার তোমরা আমাকে ছাড়াই পুষ্পাঞ্জলি দিও।

আমার চাকরিটা চলে গেছে , বাবাকে বলোনা।
কষ্ট পাবে। হার্টের রোগী অন্য কোনো বাহানা দিয়ে দিও। মাহির পরীক্ষা আছে সামনে। পুজোয় বাড়ি গেলে ওর পড়াশুনো তে ক্ষতি হবে। বাবা যদি ফোন করে আমি সামলে নেবো। তুমি বাবাকে সামলে রেখো।

আবার যদি কিছু একটা হয় তাহলে আর বাঁচানো যাবে না।

দাদাকে বোলো দাদার ব্যবসা একদিন বড় হবেই।দাদা কী ধারের টাকা ফেরৎ পেয়েছে মা? ও’ যেন হাল না ছাড়ে –
ওকে বুঝিয়ো…

পাড়ার প্যান্ডেলে নিশ্চয়ই বাঁধা শুরু হয়ে গেছে! বাঁশ কাপড় আসছে।
ওরা থার্মকলের কাজ এত সুন্দর করে।
মোবাইল ফোনে ছবি তুলে রেখো। মাহি কলাবৌয়ের চানের দৃশ্য কখনও দেখেনি । পারলে তোমার মোবাইলে ছবি তুলে রেখো। যখন যাবো তোমার ফোন থেকে দেখবো

আমাদের এখানে পুজো নেই। কোথাও দূর দূরান্তে
কোথাও ঢাকের শব্দ হবে না।

তোমাদের ওখানে কাশ ফুল ফুটেছে মা?
সেই ছোটো বেলায় পুকুরের ওপারে যে মাঠটা ছিল।
ওখানে তো প্রতিবছর সাদা সাদা জমাট আলোয়
ভরে উঠত চারিদিক- ওই মাঠে নতুন বাড়ি উঠে যায়নি তো!

আমরা ভালো আছি। মাহি ভালো আছে।
ও এবার ক্লাস টুতে উঠবে। দু মাস বাদে পরীক্ষা।
কিন্তু মেয়েটা একদম পড়তে চায় না।
এতো দুরন্ত! এত দুরন্ত! ওর এত দুরন্ত হওয়া ঠিক হয়নি মা…

তোমার জামাই ভালো আছে।
তার নতুন প্রেমিকা তাকে যত্নে রাখে। মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরে না। শুনেছি তার ফ্ল্যাটেই রাত কাটায়।
তোমার জামাইয়ের আমাকে আর প্রয়োজন নেই।
তুমি ওকে নিয়ে আর ভেবো না। ও যেখানেই থাকবে ভালো থাকবে।

আমি? আমিও ভালোই আছি। দেয়ালের সঙ্গে থাকতে থাকতে ভালো থাকতে শিখে গেছি। কিভাবে ভালো থাকতে হয়। কিভাবে ভালো রাখতে হয় সব…
তুমি আমার কথা ভেবো না। মাহিকে আমি ঠিক বড়ো করবো।

এখন একটা চাকরির খুব দরকার। অনেক গুলো অ্যাপ্লিকেশন পাঠিয়েছি।
একটা না একটা ঠিক হয়ে যাবে…

ওরা আমায় ডাকবে তো!

একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলাম, এই গত পরশুই বোধ হয়- আমার অ্যাপ্লিকেশন গুলো নৌকো হয়ে গেছে।
জলের মধ্যে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে তির তির করে।
কোনও নৌকায় বসে আছে রাত,
আবার কোনও নৌকায় বসে আছে বৃষ্টি। দেখলাম, একটা নৌকায় আমার ছোটবেলা ভরে দাঁড় বাইছে
একটা চেনা মানুষ।
ঠিক বাবার মত তার চোখ, হাসি…

হার্ট এ্যাটাকের পর বাবা ভালো আছে তো মা?

বাবাকে বেশি চিন্তা করতে বারণ কোরো।
তুমি নিজের যত্ন নিও। সুগরের ওষুধ খেও।
ইনহেলারটা বাদ দিওনা একদিনও।

ষষ্ঠীর দিন জানি তুমি
উপোস করবে। আমাদের জন্য মা ষষ্ঠীর কাছে পুজো দেবে। মাহির জন্যও পুজো দিও মা। ও যেন পড়াশুনো শিখে মানুষ হয়। ওর বাবার মত নিজের লোকেদের ভুলে না যায়…

আমার চাকরিটা চলে গেছে।
আমাকে একটা চাকরি
পেতে হবে। চাকরিটা না পেলে মাহিকে কী করে বড় করবো মা?

আর কদিন বাদেই নিশ্চয়ই আলো লাগানো শুরু হবে। আমাদের পাড়া রঙিন হয়ে উঠবে। মাঠটায় মেলা বসবে। কেনাকাটি শুরু হবে। বেলুন উড়বে। মানুষের হৈ হট্টগোল আনন্দ —
আমি এখান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাবো।

দাদাকে পুজোর কটা দিন লুচি করে দিও।
ও খেতে এত ভালোবাসে। বাবার জন্য বলেন গুড়ের সন্দেশ আনিও
আর তুমি ? তোমার জন্য পুজোর পোলাও
আমি ছাড়া আর কে রান্না করবে মা? এবার পুজোয় না হয় নিজের জন্য কিছু রেঁধো

সন্ধ্যায় ঘুরতে যেও। নিরামিষ ফুচকা খেও। আর আমার জন্য, মাহির জন্য প্যান্ডেলের ছবি, দুর্গা প্রতিমার ছবি, ঝাড় লন্ঠন আর আলোর ছবি তুলো…

এবার পুজোয় আর বাড়ি যাওয়া হবেনা মা! তোমরা এবার আমাকে ছাড়াই পুষ্পাঞ্জলি দিও…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।