কত গয়না মাধুরীলতার ।
একখান বড় বাক্স ভরে দিয়েছেন বাবা বিয়েতে । বাবামশাই কিনা জমিদার ।
মাধুরী নাড়েচাড়ে আর একগাল হাসে রোজ দুপুর বেলায় ।
শাশুড়ি বিয়ের পরে গয়না নিয়ে নিজের সিন্দুকে তুলতে যাচ্ছিলেন । পুতের বিয়েতে পাওয়া জিনিসপত্র তো বরের মায়েরই প্রাপ্য সবাই জানে ।
বউকে বউভাতের সাজ সাজাতে বসেছিল বরের ছোট পিসি কাকি সবাই । হঠাৎ সে ঘর থেকে সরুগলার চীৎকার শুনে মেয়েমহলের সবাই দৌড়ল সেই দিকে । বটঠাকুমা হাতে কাঁচা ছানার বারকোশ নিয়েই ছুটলেন । সন্দেশ বানাতে বসেছিলেন কয়েকজনে মিলে । সে ঘরের দিকে যেতে যেতে বরের মাকে ডাক দিলেন , “ আরে মেজবউ সাজের ঘর থেকে এমন সাংঘাতিক চীৎকার , চলো চলো , কাজের বাড়ী কার কি হল এমন ? সাপখোপ বিছাটীছা না ত ? এমন আওয়াজ কেন , বাপরে । ”
নতুন শাশুড়ি শাড়িজামা গোছাচ্ছিলেন । হাতের কাপড় কাঁধে ফেলে দৌড়লেন ।
সে ঘরের সামনে গিয়ে ত সবাই অবাক ! দরজায় ভিড় করে মেয়েরা উঁকিঝুঁকি মারছে আর কনেবউ খুড়শাশুড়ির হাত ধরে সরু গলায় চিল চীৎকার করছে ।
“ আমার বাকি গয়না কই , আমার আরও গয়না আছে । আমার আরও অনেক গয়না আচে , কই সেগুলো ? আমি সব পড়ব । কেন দিচ্ছনা আমায় ? আমি সব গয়না পড়ব ।”
ঠাকুমা তাজ্জব হয়ে গালে হাত দেন , “ কি গলা রে বউয়ের । বাবা যেন কান ফাটিয়ে দেবে । কি ভাগ্যি করে একটা মাত্র বেটার বউ এনেছ মেজবউমা । কি সব গয়নাটয়না বলছে , বের করে দাও বাপু । বাড়ীর কারো কানের পর্দা তো আস্ত থাকবে না নইলে ।”
তারাসুন্দরী মানে মেজবউমার গা রিরি করতে থাকে ।
ঘরে ঢুকে এক ধমকে চুপ করিয়ে দেবেন বলে সবাইকে দরজা থেকে সরাতে যেতেই কনেবউ তাঁকে দেখতে পেয়ে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল , “ ও মা , আমার গয়না দিচ্ছে না এরা দেখো না , আমার বাবামশাই কত সখ করে আমি পড়ব বলে দেছেন । এদের বল না এনে দিতে ।”
থতমত খেয়ে তারাসুন্দরী বললেন , “ থামো থামো, অমন চেঁচাচ্ছ কেন বউমানুষ। সব গয়না একসংগে পড়া যায় কখনও ? তাই বলে এমন চেঁচাবে ? বলি বাপ মা কি শিক্ষে দিয়েছে শুনি ? ”
ছোটবেলায় এই একটি চিমটি শুনলেই তারাসুন্দরীর চোখে জল এসে যেত ।
ও মা , বউ তো খিলখিল করে হেসে উঠল ।
“ কে শিক্ষে দেবে ?
গয়নার বাক্স আমার কাছ থেকে সরালে আমি এমন চেঁচাই, মা পিসি মেরে পিটিয়েও থামাতে পারেনা । বাড়ীতে সবাই জানে তো । কেউ হাত দেয় না আমার গয়নায় কখনও । আজ বাবা আসবেন ত এ বাড়ীতে, দেখো সবাইকে বলে যাবেন এবার । ”
এক গাল হাসি নিয়ে কনেবউ এই সব বাক্য বলতে থাকে , আর তারাসুন্দরীর বাক্য হরে যায় ।
“ ঠাকুর , রাধামাধব , একটামাত্র ছেলের কপালে একি বউ জোটালে ? ”
রাত্তিরে ক্লান্ত পায়ে ঘরে ঢুকে তারের কাজ করা নেকলেশটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখতে গিয়ে দুহাতের মধ্যে অঞ্জলি করে ধরে শ্রীমতী ।
কি সুন্দর কাজটা । আজ পার্টিতে সব্বাই এসে কমেন্ট করেছে । সুনন্দর অফিসের অ্যানুয়াল পার্টি ছিল । সব বউয়েরাই এখানে জবরদস্ত সেজে আসে । তাদের মত নতুন সংসারকরা দম্পতির রেস্ত কম । তবু সবাই সিনিয়রদের সংগে পাল্লা দিতে বিয়ের দামি গয়না বের করে এ দিনে লকার থেকে । অনেক উঁচু অফিসার মুখার্জীদার মিসেস দেখে বললেন , “ বাহ কি সুন্দর কাজ শ্রীমতী , এটা কিন্তু নেকলেশ নয় , এটা খুব বাহারের চিক । ফাঁকিবাজি দেওয়া লাল ভেলভেটের ওপর চিক আজকাল সোনা দুর্মুল্য হওয়াতে দেখা যায় । এ তো সাবেকি এন্টিক গয়না , এর কাজের আভিজাত্যই আলাদা । খুব সুন্দর । ”
ব্লাশারের আভার ওপর দিয়ে আনন্দের গোলাপি ছিটে লেগেছিল শ্রীমতীর মসৃণ গালে। খুব ফুরফুরে আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে তাই ।
ভাল করে আবার দেখছিল ডিজাইনটা । অনেক কষ্টে এক বছর ধরে পয়সা জমিয়ে সুনন্দ কিনে দিয়েছে এই গয়নাটা এইবারের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে।
অনেক দিন ধরে কোন দোকানের শোকেশে দেখে রেখেছিল নাকি । বড় ব্র্যান্ড নয় , তাও পছন্দ করে নিয়ে এসেছে এত ভাল লেগেছে বলে ।
গয়নাটা পাশে রেখে কানের ঝুমকো খুলতে খুলতে শ্রী ভাবে , যাক সুনন্দর কষ্ট করে কেনা সার্থক ।
হঠাৎ মনে হল পাশে কে কথা বলছে ।
“ যত্তসব হাড়হাভাতে । জালিকাজের মনিপুরী হাঁসুলির সঙ্গে চাড্ডী মেকি ঝুমকো পরেছে । ছ্যাঃ । বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালা যেন ।”
চমকে ওঠে শ্রী । ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকায় ? ঘুম পেয়েছে ? তাই স্বপ্ন দেখছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ?
কে কথা বলল রে ?
“ কেন হে ? রোজ বিজ্ঞাপনে দেখো না ? গয়না যেখানে কথা বলে ? আমার গয়নারা আমার প্রাণ ছিল । ওদের সংগে কথা বলেই ত দিন কেটে যেত আমার । ”
ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাঁচে রোগা কাঠিসার একটা ফর্সা মেয়ে । বাংলা করে শাড়ী পরা । গায়ে কত গয়না , বাবা !
“ দেখেছ কত গয়না ? এ তো কিছুই না । এক বড় বাক্স ভর্তি গয়না দিয়েছিলেন আমার বাবা বিয়েতে । তোমার ত কিছুই নেই । ভিখিরির দশা। নেহাত আমার একখান চিক কোন রকমে জোগাড় করে দিয়েছে বর তাই। ”
রাগের চোটে ভয় পেতে ভুলে যায় শ্রীমতী ।
“ বটে । তা বাপ ত দিয়েছিলেন , বর কি দিয়েছিল শুনি ? ”
কেমন ম্লান দেখায় মেয়েটাকে ।
“ সে আর কোথায় দেবে । সব সময়েই বলত , তোমার বাবা ত আর দেবার জায়গাই রাখেননি । তাও ছেলেপুলে হলে মুখ দেখে দিতাম । সে ত আর হয়নি ।
তা বাপু , তুমি অত লুটিয়ে শাড়ি পড়েছ কেন ? অমন কুঁচি করাই ত ঝেমেলা।”
মুচকি হাসে শ্রী , “ আমি ত খাটের ওপর দাঁড়িয়ে পরি , আমার তাই অসুবিধে হয় না ।”
“ গেল যা , পায়ে জড়িয়ে পড়ে গেলে কি সব্বনাশ হবে জান ? আমার সেই একবারই পেটে বাচ্চা এসেছিল । পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে , আর আসেনি। তোমার ত এখনো হয়নি । ধিঙ্গিপনা করতে আছে ? ”
শ্রী ছুরির ধার মেশায় মিষ্টি হাসিতে , গয়নার অহংকারকে হারিয়ে দেবার গর্বে ।
“ কেন গো , আমার বর যে রোজ আমার কুঁচি গুঁজে দিয়ে কোলে করে নামিয়ে নেয় খাট থেকে , আমার কোন অসুবিধেই হয় না । তোমার বর তোমায় আদর করত না বুঝি অমন করে ?”
একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে মিলিয়ে যায় গয়নার দেমাক , আর তাকে দেখা যায় না।
আর আদরের পালিশ লেগে টেবিলের ওপর চিক ফিকফিক করে হাসে ।