ছোটগল্পে সাহানা

ফান্টুস

মাঠের ওপাশে ঘন জঙ্গল। গাছগুলো পাশাপাশি এমন জটলা বেঁধেছে যে দিনেও অন্ধকার! ওই জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে একখানা ভাঙা মন্দির আছে। সেখানে নাকি অমাবস্যার রাতে কিসব হয়! কি হয়, কেউ জানে না! ফান্টুস রোজকার মতো মাঠ পরিষ্কার করতে এসে ওইদিকে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে। রোজ ভাবে, একদিন গিয়ে ঠিক দেখে আসবে! কিন্তু….
দিন কয়েক আগে ওখানে গিয়েছিল তার বন্ধু কানাই। হঠাৎই কাজের ফাঁকে কানাই বলেছিল, রাতের দিকে চুপি চুপি অভিযান চালাবে।
-“সুপার যদি জানতে পারে?”
-“কিচ্ছু জানবে না। যদি না তুই বাগড়া দিস্।”
-“আমার ভারী বয়েই গেছে!”
-“মনে থাকে যেন!”
এটাই ছিলো শেষ দ্যাখা। তার ঠিক দু’দিন পরেই জঙ্গলের ধারে কানাইয়ের রক্তশূন্য দেহটা মেলে। পুরো শরীর থেকে যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে রক্ত শুষে নেওয়া হয়েছে!
কানাইয়ের পরে আরও দু’জন। একই ঘটনা। খুব স্বাভাবিকভাবেই কুসুমপুরের মতো ছোটো একটা শহরে আলোড়ন উঠেছে! কারণ খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। ফলে, সন্ধ্যা হলেই পথঘাট ফাঁকা আর চায়ের দোকানে ঝাঁপ পড়ছে!
ফান্টুস, কানাই এবং আরও দশটি অনাথ ছেলেকে নিয়ে গড়ে উঠেছে “মন বাতায়ন”। একটি আশ্রম। কর্ণধার সুতপাদিকে সবাই “সুপার” বলে সম্বোধন করে থাকে। তিনি এই শহরে সমাজসেবিকা, রাজনীতিবিদ এবং বেশ বিখ্যাত একজন মানুষ! সকলেই চেনে এবং খাতির করে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছেলেদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার পাঠ দেওয়া হয়। এ অঞ্চলের মাঠ, পার্ক এবং রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তাদের।
সুতপা ম্যাডাম অত্যন্ত কড়া সুপারভাইজার। তাঁর নজর এড়িয়ে কেউ কিচ্ছুটি করতে পারে না। সবসময়ই তিনি বলেন, “মন বাতায়ন আমার পরম ধন, আমার গর্ব, আমার আত্মসম্মান! একে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করবি তোরা, সবাই!”

ফান্টুস একলা মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশ পাতাল ভাবছিল! ওদিকে পশ্চিমের আকাশ কালো হয়ে এসেছে! এক ছুটে মাঠ পেরিয়ে আশ্রমে ঢুকতে যাবে, এমন সময়…..
মাঠের কোণাকুণি কেউ একটা দৌড়ে গেল জঙ্গলের দিকে! এই অসময়ে কে?
ফান্টুস কিছু ভাবার আগেই দেখলো সুপার ওকে ডাকছেন। তখনকার মতো ঘটনাটা সরিয়ে রেখে দৌড়োলো সেদিকে।

গভীর রাতে বৃষ্টি কমলে চাঁদের ফুটফুটে আলো ছড়িয়ে পড়ল। ফান্টুসের ঘরে একখানা মাত্র জানলা, খাটের উল্টোদিকে। গরমের সময় অল্প খুলে রাখে। আজও তাই করেছে। এতদিন পাশের খাটটা ছিল কানাইয়ের। এখন সেটা ফাঁকা!
একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল, হঠাৎই! অনেক দূর থেকে কেউ যেন ফিসফিসিয়ে ডাকছে, তার নাম ধরে! মস্তিষ্কের সমস্ত কোষে সেই ডাক আলোড়ন তুলছে!
-ফান্টুস! ফান্টুস!
-কে?
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে!
জানলার বাইরে থেকে শব্দটা আসছে! কিন্তু, ওদিকে তো বাগান, ফুলের কেয়ারি। তারপরে গেট আর মাঠ।
সাহসে ভর করে অল্প খোলা জানলাটা ঠাস্ করে খুলে দেয়। কেউ নেই!
চাঁদের ফুটফুটে আলোতে ধুয়ে যাচ্ছে চতুর্দিক। ওপাশে করবী গাছটার ছায়ায় ও কে?
-“কানাই?”
-“ফান্টুস তাড়াতাড়ি আয়। একটা অদ্ভুত জিনিস দ্যাখাবো।”
-“তুই? তুই… কি করে?”
-“ধুর! আমি মরিনি রে। চট্ করে আয়। বাঁশের লাঠিটা আনবি দরজার পাশ থেকে।”
নিঃশব্দে ছিটকিনি খুলে ভেতরের বারান্দা পেরিয়ে বাগানে আসে ফান্টুস। গেট খোলা। কানাই বেশ কিছুটা দূর থেকে হাতছানি দিচ্ছে।
লাঠিখানা চেপে ধরে দৃঢ় পদক্ষেপে পিছু নেয় সে। ভয়ডর খুব কম ফান্টুসের। আসলে, মা এবং বাবা-র স্নেহ হারিয়ে কঠিন পৃথিবীতে বাঁচার লড়াই করে তারা, ভয় পেলে চলবে!
কিন্তু, একি!
কানাই তো মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকতে যাচ্ছে! সেও কি….যাবে!
যা থাকে কপালে!
জয় মা, বলে আবছা আলোতেই জঙ্গলে ঢোকে ফান্টুস। ওই তো কানাই। এতো আগে যাচ্ছে, কেন? চারপাশটা নিঃঝুম! কোনো রাতচরাও জেগে নেই। সাপখোপ নেই তো! বা হিংস্র কিছু! ভাবতেই একটা ঝাঁকুনি খায়!
জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা ঘন গাছপালা পেরিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা। যেন, জঙ্গল কেটে ফেলে পরিষ্কার করেছে কেউ। ঠিক মাঝখানে একটা ভাঙাচোরা ঘর, মন্দির টাইপের। জীর্ণ অবস্থা দেখে মনে হয় না, কেউ এখানে আসে!
হঠাৎই ভাঙাচোরা ঘরের মধ্যে একটা আলো যেন ছিটকে উঠলো। কি ব্যাপার?
আশেপাশে কানাইয়ের চিহ্ন নেই!
ফান্টুস আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে চলে নিঃশব্দে! ভাঙা ঘরের মাঝে একটা গর্ত! সিঁড়ি নেমেছে কয়েকধাপ। খুব সন্তর্পণে নামতে শুরু করলো!
দুটো লোক একজনকে টেবিলে চেপে ধরেছে, হাত-পা, মুখ বেঁধেছে। পাশেই ইনজেকশনের ছুঁচ নিয়ে দাঁড়িয়ে…চমকে উঠলো ফান্টুস। এ তো সুপার!
তার নিঃশব্দ উপস্থিতি কেউ টের পায়নি! পেছন থেকে পা টিপে টিপে এগিয়ে লাঠিটা সজোরে মারলো প্রথমজনের মাথায়। ছিটকে পড়লো সে এক কোণে। টাল সামলাতে না পেরে ফান্টুস টলে পড়লো অন্য লোকটার ওপরে, আর এই হঠাৎ গোলোযোগে ইনজেকশনের ছুঁচটা সোজা বিঁধলো সুপারের হাতে! আচমকা একটা বিকট চিৎকার করে তিনি দড়াম্ করে আছড়ে পড়লেন মেঝেয়! ছটফট করতে থাকা চেহারাটা মুহুর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেলো!
ঠিক এই সময়েই বাইরে থেকে প্রবল হট্টগোল, পিলপিল করে কারা যেন ঢুকে এলো সিঁড়ি বেয়ে আর লোকদুটোকে ঘিরে ফেলল! কেউ একজন ফান্টুসকে সোজা করে দিয়ে পিঠ চাপড়ে বললো, “দারুণ কাজ করেছো ভাই! অনেকদিন ধরেই এসব চলছিলো! ভূতের ভয়ে এদিকে আসতো না কেউ! আজ যদি তোমার বন্ধু খবর না দিতো, এই ছেলেটাও মারা পড়তো!”
কিন্তু …..
কোনো কিন্তু নয়! ইনজেকশন দিয়ে অসাড় করে সমস্ত রক্ত, মজ্জা বের করে মানুষকে মেরে ফেলে এরা। এদের একটা বিরাট চক্র আছে! আসলে এরা ড্রাগ পাচারকারী। জাল ওষুধের কারবারী। কোনো ব্যক্তি এদের খোঁজ পেলেই তাকে রক্তশূন্য করে ছুঁড়ে ফেলে বিষাক্ত ইনজেকশনে! হয়তো গোপনে মানুষ পাচার ও করে! আমরা গোপন তদন্ত বিভাগ, পুলিশের লোক। চোখে চোখে রেখেছি বহুদিন, আজ সবাই মিলে….সব তদন্ত হবে এবার!

ফান্টুস টলে টলে বাইরে আসে। ‘ফান্টুস’-এর একটা ভালো নাম ও আছে। পরিতোষ। কেউ ডাকে না। শুধু সুপার ডাকতো!
কে, কার আত্মসম্মান রক্ষা করবে এখন? ভাবতে পারছে না আর! মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে!

আকাশটা অল্প ফরসা হয়েছে। দূরে জঙ্গলের ধারটায় একটা আবছা অবয়ব, হাত নেড়েই মিলিয়ে যাচ্ছে গাছের জটলায়! কানাই!
ওর কাজ শেষ, পৃথিবীতে সময়ও।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।