সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ১০৫)

রেকারিং ডেসিমাল

সেই যে আসল কলমচি, বসে বসে কোথায় কিরকম তালপত্র, নাকি প্যাপিরাসের পুঁথিতে লিখে চলেছেন হরেক রকম গল্পগাছা, তিনি যে কখন কি রকম টুইস্ট দেবেন, কার সাধ্য টের পায়।
বারংবার এই মোচড় দেখে চমকে উঠি।
আর আরও মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করি চারপাশটা।
কি যে গল্প উপন্যাস কি ভাবে এসে পৌঁছে যাচ্ছে শ্বাসরুদ্ধকর বাঁকে।
আমি শুধু নথিবদ্ধ করার আকুলিবিকুলি চেষ্টা করে চলি।
সেই ভাবেই, এই লেখা আজ একশ চারের পর একশ পাঁচ ছুঁয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে সাত নম্বর অধ্যায়ের কাছে।
আজ শ্যামা পূজা। দীপাবলির উৎসব সারা দেশের মানুষের মনে।
ভারতের মানুষ প্রবাসেও আলোর উৎসবে মেতে আছেন।
আমার বাইশ বছরের পুরোনো স্মৃতির পাতা মনে পড়াচ্ছে, বাবা মার সঙ্গে নতুন বাড়িতে আলো সাজানোর আনন্দ।
কত ছবি।নতুন বাড়ির তিন দিকে বারান্দা। বারান্দায় গ্রিল দিয়ে সাজানো হয়েছে। তার নকশার ফাঁকে ফাঁকে মোমবাতি লাগানোতে যে কি আল্লাদ, কি খুশি!
তিন জনে এদিক থেকে ছবি তুলছি, ওদিক থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিব,আর নিজেরাই বিগলিত হাসিতে বলছি, কি সুন্দর দেখাচ্ছে বলো?
বাজি, মানে ফুলঝুরি, যাকে তারাবাতি ও বলি, ইলেট্রিক তার, রঙ মশাল, তুবড়ি, চরকি, এইসব ছাদে আর বারান্দায় হাত বাড়িয়ে ফোটানো চলছে।
আমি আর বা’ মশাইই বেশি। মা একটু দূরে পালান বারুদ থেকে বরাবর।
এইসবই সাপ্লাই এসেছে অজয়ের দোকান থেকে। তার নাম যে কৃষ্ণ স্টোর সে আমরা বিশেষ খেয়াল করতাম না।
দোকানের খাতা হাতে যে কেউ গেলেই যা কিছু নিয়ে এসেছি বরাবর।
হিসেব বাবা মিটিয়েছেন।
এমনি করেই বিয়ের সময় অবধি চলেছে। বিয়ের জিনিসপত্র, সে সময় বাড়িতে থাকা এত লোকজনের আপ্যায়নের ব্যবস্থা, ওই দোকান থেকেই হয়েছে। আর দ্বিরাগমনে এসে হাঁটতে বেরিয়েই আমার নতুন বরের কাছে জানতে পেরেছি, আমার শ্বশুরবাড়িই দোকানের মালিকের জন্মস্থান।
সেই সূত্রেই লিখতে শুরু করে রেকারিং ডেসিমালের সাত নং ভাগে কৃষ্ণমোহন এবং পরিবারকে গুটিগুটি ডেকে এনেছিলাম পাতায়।
এ হিসেব ছিলো না, যে এই দোকান এবং এর মালিক, আমার সন্তানদের জন্মের পরের সব প্রয়োজন ও মিটিয়েছে। কলকাতা শহরে প্রথম ডায়াপায় ব্যবহার শুরু করা মায়েদের একজন আমি, এইখানেই ফরমায়েশ দিয়ে আনিয়েছি হাগিজ, সেরেল্যাক, ছোটদের জন্মদিনের যাবতীয়।
বাচ্চাদের সঙ্গে সঙ্গে সংসারও বড় হয়েছে। বাবা মায়ের কাছ থেকে সরে গেছি নতুন নিজস্ব ফ্ল্যাটে। গৃহপ্রবেশের সরঞ্জাম, বাড়ি পালটানোর গাড়ি, লোকজন, নতুন সংসারের এমনকি চাল, ডাল রাখার বয়াম ও ওই অজয়দারই ব্যবস্থা। ফোনের বুথ ও ছিল দোকানের এক পাশে। মোবাইল ফোন জিনিসটা তখনও কেউ কল্পনা করতে পারিনি।
কাউকে খবর দিতে হলেও সেই অজয়ের দোকানেই দৌড়ে আসা।
তখন আমাদের ও ছোট্ট খাতা হল।
ছোট ছেলে নন্দু কাজ করত দোকানে। আমার ছোট্ট একটা ছেলে হল যখন, তার সাথে ভারি ভাব হয়ে গেল নন্দুর।
মাসকাবারি মাল দিয়ে চলে যেত নন্দু। আমি ফর্দ মিলিয়ে তুলে রাখতাম।
বাবান জেগে থাকলে খানিক বাইরে ঘুরে আসত নন্দুদাদার কোলে উঠে।
আমি রান্নাঘরে বসে তরকারি কাটছিলাম।
ঘুম চোখে বিকেলে উঠে, আমার এক বছুরে ছেলে লাল টুকটুকে গেঞ্জি পরে হাঁটু মুড়ে আমার সামনে বসে বলল, নন্দুদাদা কখন মাসকাবারি দিয়ে গেল?
আমি ভীষণ চমকে গিয়ে বললাম, কে বলল মাসকাবারি এসেছে?
সে পাতলা লাল টুকটুকে ঠোঁট উলটে বলল, ওই তো, আমাদের চানের সাবান।
তাকিয়ে দেখি, জনসন বেবি সোপ একখান মাটিতে রাখা, বাথরুমে নিয়ে যাবো বলে।
গলে গিয়ে ভাবলাম, আহা ছানার আমার কিই বুদ্ধি।
এমনি করেই নার্সারির টিফিন, জলের বোতল, পুজোর হরতকি, সুপুরি, ঘি, মধু থেকে শুরু করে বাবা মা চলে যাবার পর কাজ করার সামগ্রী ও একটা ফোনেই পৌঁছে গেছে বাড়িতে।
মোবাইল ফোন হল পরে, ফোনের রিচার্জ।
বাবা মায়ের পারলৌকিক কাজে, ছেলের পৈতেয় এসেছেন সব সময় মানুষটি।
যে কোন দরকারে, দাদা শিগগিরি করে দিন, ব্যবস্থা করুন, বলে নিশ্চিন্ত হয়ে থেকেছি।
নিজে ও ফোন করেছেন।
কর্তার কাছে এসেছেন, ছেলের জয়েন্ট পরীক্ষার নম্বর নিয়ে।
কাউন্সিলিং চলছে, কোথায় ভর্তি করি বলো দেখি।
খুবই ভালো ছাত্রছাত্রী ওনাদের ছেলেমেয়ে ও। আমাদের বাচ্চাদের কাছাকাছিই বয়েস।

খবর দিয়েছেন, পুরোনো শিকড়, ওনার বাবা, কৃষ্ণমোহন চলে গেলেন পরেও। আমরা সে অনুষ্ঠানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছি।
নতুন ফ্ল্যাটের গৃহপ্রবেশে নেমন্তন্ন করেছেন। আনন্দ করে এসেছি সবাই মিলে।
মহামারীর সময় কোভিড হয়েছে ওনার ও, আমাদের ও। সেরে উঠে আবার চলেছি।
খবর পেয়েছি হার্টের সমস্যা, বাইপাস করতে হল। ছেলে ভালো চাকরি করে, কত যত্ন করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে সুস্থ করে এনেছে।
আমাদের বাচ্চাদের মত ওনার ছেলেমেয়ে ও কাজ নিয়ে ইদানীং কলকাতার বাইরে।
আমরা ও দৌড়ে চলেছি। এখন আর দোকানে যাওয়া হয় না বিশেষ।
মাসের শুরুতে ফোন আসে, বা হোয়াট স্যাপে লেখা, ফর্দ কই ম্যাডাম। কি করছেন।
ওই একবারেই লিখে দিলে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেন মালপত্র।
বাকি ত অনলাইনে কিনি আজকাল।
আমাদের ইস্তিরি ওয়ালাও ওনার হাত ধরে আসা টালিগঞ্জ পাড়ার লোকের ছেলে। ওনার কাছে থেকেই করে কম্মে খায় সে।
এর মধ্যে সেই ইস্তিরি ওয়ালাই খবর দিল, দাদা ত হসপাতালে।
ফোন করতে বললেন, হার্নিয়া অপারেশন হয়েছে উডল্যান্ড হাসপাতালে।

সেরে এসেছেন টের পেলাম ফোন আর হোয়াটস্যাপে ।

আররে, ফর্দ কই? লক্ষ্মী পুজো টুজো কি বন্ধ করে দিলেন? পুজোর জিনিস ত বরাবর আমিই দিই।

হেসে বললাম,ছেলে এ বছর পুজো করেছে যে।
বললেন, হ্যাঁ, সে করুক। তারা দুই ভাইবোন ত আমার দোকানেই এসেছে চিরকাল লম্বা লিস্টি হাতে।
এবার অন্য রকম হল কি করে?
কিছু খুচরো বাকি হিসেব অনলাইনে মিটিয়ে প্রতি মাসের মত ছবি পাঠালাম।
আবার ফোন, আমার মুখের কথায় বিশ্বাস করে টাকা দিলেন, নিজে দেখলেন না মিলিয়ে।
খুব হাসলাম।
না দাদা। এই কটা টাকার জন্য আর ব্যস্ত হতে পারি না। আপনার কথাই যথেষ্ট।
তিনিও হাসলেন খুব।
তারপর আমার বাবার কথা বললেন।
হিসেবে ভুল করে কত বকুনি খেয়েছেন এক কালে।
প্রায় রাত দশটা বাজলো হাসিঠাট্টায়।

সকাল দশটায় কর্তার ফোন, অজয়দা নেই।

রাতে বাড়ি ফেরার আগে দু জনে দোকানের সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড় করালাম, বৌদি আর মেয়ে অবাক হয়ে আছে তখনও।
মেয়ে বলল সকালে পরিপাটি চান, দাড়ি কামানো সেরে, দোকান খুলতে যাবেন বলে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে ছিলেন। সেই ভাবেই কাত হয়ে পড়ে গেলেন, আর ওঠানো গেল না।

আমি হতভম্ব হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে সারাদিন দেখছি।
শেষ কল, অজয় গুপ্তা।

এবারে দু দিন আগে সেই নম্বর থেকে আবার কল এলো।
বৌদি বললেন, আসবেন কাজে, দিওয়ালির দিন কাজ।

আমি বড় মন খারাপ নিয়ে ভাবছি, আমাদের চেয়ে অল্পই বড় মানুষটির গল্প এ ভাবে শেষ হল?
এ বছর আমায় আলো বাতির যোগান দেয় কে?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।