।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় সায়ন

প্রবীর দা, একজন বিপ্লবী বইওয়ালা

মার্চ মাস থেকে ভারতবর্ষের বুকে নেমে এল বছরের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ কোভিড-১৯ আক্রমণ ও তার হাত ধরে গ্রাস করে ফেলল লকডাউন , স্বেচ্ছায় গৃহ বন্দিত্ব। আপনি চান বা না চান – আপনাকে বন্দী থাকতেই হবে। আপনাকে বন্দী থাকতে হবে – অন্যের জন্য – আপনার মাধ্যমে জীবাণু অপরের দেহে পৌঁছে যেতে পারে। সকাল শুরু হয় বিশ্বজোড়া মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে – রাতের বেলা হিসাব হয় পরেরদিনের জন্য একটা ত্রাস আর আশঙ্কার চিত্রলেখ তৈরি করতে করতে।
অদ্ভুত ভাবে মানুষের মধ্যে একটা ভাবনার বিষবৃক্ষ বেড়ে উঠতে শুরু করল – social distancing। দেহ থেকে দেহে যেখানে সংক্রমিত হওয়ার খবর দেওয়া হচ্ছে সেখানে সামাজিক দূরত্ব কথাটির প্রাসঙ্গিকতা কি?
তাহলে কি খুব সচেতন ভাবে এই ভাইরাসের খেলা দেখাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতা যন্ত্র? উত্তরটা আমার কাছে ‘হ্যাঁ’ , এবং দেখার ও অনুভব করার বিষয় সামাজিক মানুষ তারাও ‘সামাজিক দুরত্ব’ শব্দবন্ধটিকে নিজের স্বার্থে বেশ সুচারু ভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে দিল -“এই শহরটার কোথাও social distancing মানাই হচ্ছে না! ” জীবনের এই স্বার্থপরতা দেখতে দেখতে সময়টা ক্রমে সাত সাতটা মাস – কিভাবে কাটিয়ে দিলাম – কিংবা কেমন আছি , বা সামনের পথটায় কি আদপেও এগিয়ে যাচ্ছি। প্রশ্নগুলির সামনে এসে মহাকবি দান্তে দাঁড়িয়ে আছেন .. জিজ্ঞাসা করলাম –
” আমি কি নিজের ভিতরে কোনও অজানা জঙ্গলে হারিয়ে গেছি – In the middle of the journey of our life / I come to myself within a dark wood / where the straight way was lost. ”
– তুমি যদি কবিতার ভাষাকে বিশ্বাস করে থাকো , তাহলে একবার দেখো – সমস্ত কবিতাই কি নরকের আগুন স্নানে বিশুদ্ধ হয়ে স্বর্গের অভিমুখে যাত্রা নয়?
– স্বর্গ কি? কত মানুষ এই শূন্য বিচ্ছিন্ন বন্ধ্যা দেশ থেকে স্বর্গের পথে হেঁটে গেল!
– স্বর্গ হল সুন্দর । সমস্ত অন্ধকারের মধ্যে নিজের ভিতর ডুবে থাকা যে আলো তাকে খুঁজে পাওয়ার একটা পথ এই অন্ধকার বন্দিত্ব।
সমস্ত নরকই আসলে মানুষের অন্তরকে পাঠ করার একটি পাঠশালা । বিশ্বাসের যে সামান্য ধারনা নিয়ে বিশ্বমানবের পথচলা । সেই জানার বিশ্বাসের চেয়ে কত বৃহৎ এই ভূমন্ডল – আকাশ – নক্ষত্র চরাচর । সেখানে অনেক ফাটল আছে যার মধ্যে থেকে চুঁইয়ে নেমে আসে আলো – এরপরেও আমাদের বুঝতে হয় – ” শীতের রাত অপরূপ, – মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার / গভীর আহ্লাদে ভরা । অশথের ডালে- ডালে ডাকিয়াছে বক। / আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নির্ভৃত কুহক; “। রাত জেগে সজাগ হই দান্তে আর জীবনানন্দ দাশের আড্ডায়। এরপরেও মানব – আর তারপরেও মানব থেকে যায়। এই ভাবতে ভাবতেই মে মাসের ১০ তারিখ সকাল দশটা নাগাদ প্রবীর দার ফোন।

জীবনের বিশ্বাস লেখা বইয়ের পাতায় :

প্রবীর দা মানে প্রবীর কুমার চট্টোপাধ্যায় – আমার বইওয়ালা । সম্পর্কটা হতে পারত একজন বই বিক্রেতা ও ক্রেতার। কিন্তু না প্রবীর দা শুধুমাত্র একজন বই বিক্রেতা নয় আমার – যিনি একাধারে আমার গ্রন্থ অভিভাবক, দাদা, শিক্ষক। বই নেওয়া, কেনা, পড়ার জন্য আবদারের আশ্রয় স্থল। সারা বিশ্বের বিভিন্ন সময়ের নতুন, পুরনো বইয়ের পসার সাজিয়ে বইপ্রেমীদের জন্য মুক্তাঞ্চল খুলে প্রবীর দা বসে গড়িয়াহাট কে . এম . সি মার্কেট, বি -১২৫ , ‘আহনায়ন বুক স্টল ‘ । আমরা যারা বই পড়তে ভালোবাসি প্রবীর দা বিনা প্রশ্নে বিনা দ্বিধায় খাতায় হাজার হাজার টাকা লিখে রেখে বই দিয়ে দেয় – সময় ও সাধ্যমতো আমরা টাকা দিয়ে আসি। ‘চিত্তপ্রসাদের চিত্রকলার দু খন্ড ‘ থেকে Berne Convention special Edition 1963 , এর ” International relations between the two world wars (1919-1939)”, E.H.Carr , Shakespeare 400 years birth celebration volume থেকে ‘পরিচয়’ পত্রিকার প্রথম প্রকাশিত সংখ্যার দশটি কপি এবং আরও শত শত বহুমূল্যবান বই নূন্যতম মূল্যে বাড়ি নিয়ে যাই । একবারও ভাবি না পুরোনো বই শুধুমাত্র বিক্রি করে একজন মানুষের সংসার চলে ঠিক কি করে? গোটা বাংলা জুরে যখন বই পড়ার পাঠক সংখ্যা আতস কাঁচের নিচে রেখে খোঁজার মতো – তখন প্রবীর দার মতো মানুষরা স্কুল পাঠ্য প্রশ্ন উত্তরের বইয়ের বিপুল চাহিদার ক্রেতাদের ছেড়ে নগন্য কিছু বইপ্রেমির জন্য নিজের জীবনকে বাজি রেখেছেন। লকডাউনে যখন সব বন্ধ হয়ে আছে, রোজগারের জন্য যখন কোনো পথ খোলা নেই, পরের দিন কি খাব সেই ভাবতে ভাবতে যখন দিন কাটাচ্ছি, মুক্ত অবসরে প্রবীর দার কাছ থেকে নিয়ে আসা বইগুলোই পড়ছি নতুন করে – তখন ১০ তারিখ, সকাল ১০ টায় ফোনটা আসার আগে পর্যন্ত ভাবিনি – আচ্ছা কিছু টাকা যে জমা আছে তার কাছে, তার সংসারটা কিভাবে চলছে? বাড়িতে সবাই ভালো আছে তো – ডালভাতটুকু জুটছে তো? – ভাবতে ভাবতে ফোনটা কেটে গেল!

আলো অপেক্ষা করে ফার্স্ট কার্টেন থেকে :

ফোন করলাম।
– প্রবীর দা বলো? কেমন আছো তুমি?
– সায়ন তুমি কেমন আছো আগে বলো? এখন তো অখন্ড অবসর , নিশ্চয়ই খুব ভালো করে পড়াশোনা, লেখালেখি হচ্ছে। কাজ করে যাও তোমার হবে বুঝলে।
একবারও বলল না পয়সা কড়ির কথা । নিজের সমস্যাটা কত সহজে চেপে রেখে আমি ঠিক আছি কিনা তার খোঁজ নিয়ে গেল । সম্পর্কে প্রায় আমার বাবার কাছাকাছি – কিন্তু আমি বন্ধুর মতো ‘তুমি’ করে বলি , আর দাদাও আমাদের মতো তরুণদের সঙ্গে নিপাট বন্ধুর মতোই মেশে । আমি নিজে থেকেই বললাম –
– প্রবীর দা আমার খাতায় এখন কত আছে গো? আসলে খুব অর্থনৈতিক সঙ্কটে আছি তো তাই টাকা দিতে পারিনি কটা মাস।
– আরে না না তোমার তো বেশি কিছু নেই –
– না তাও, এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে তোমার পাশে যদি দাঁড়াতে না পাড়লাম তাহলে কিসের আর দাদা ভাইয়ের সম্পর্ক !
– আরে সে ঠিক আছে , আগে বল কি নিয়ে এখন লিখছ?
– উনিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যের বিস্তার ও বাংলা নবজাগরণের পরিধি ।
– বাহ! দারুণ বিষয় নিয়ে কাজ করছো তো? বিনয় ঘোষের বই আছে?
– কোন বই বলো তো?
– ‘বাংলার বিদ্বৎ সমাজ ‘?
– না নেই। আর দেখ না সব বই নতুন বাড়িতে রেখে এলাম – তারপরেই লকডাউন। সামনে লেখাটা জমা দিতে হবে।
– বেশ আমার কাছে আছে। আর বলছি সায়ন তোমার থেকে বলতে খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি সবাইকেই একটু ফোন করছি – জানোই তো আসলে এই বইয়ের ব্যবসাটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই আমার। সমস্ত পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে বুঝতে পারছি না। মুদির সব জিনিসের দাম যা বাড়ছে – যদি অল্প কিছু হয় – তোমার অবস্থা বুঝে কিন্তু ,আমি গড়িয়ায় গিয়ে নিয়ে আসব – আর হ্যাঁ, তোমাকে ‘বাংলার বিদ্বৎসমাজ ‘ বইটা দিয়ে দেব।
– কি? গড়িয়া আসবে কি করে? একটাও গাড়ি নেই কিছু নেই!
– আরে না না ওই নিয়ে ভেবো না, আমি হেঁটে চলে যাব । আমি তো যাচ্ছি অনেকের কাছে হেঁটেই। এতে একটু বাড়ি থেকে বার হওয়া হলো, আর মনটাও ভালো লাগে তাতে!
‘আমি তো যাচ্ছি অনেকের কাছে হেঁটেই’- এই ছবিটাই লকডাউনে একজন মানুষের সংগ্রামের ছবি। নিজেকে এতটা স্বার্থপর মনে হল – যে মানুষটার কাছ থেকে কত আনন্দ করে একটা বই পছন্দ হয়েছে , পয়সা নেই লিখিয়ে রেখে , নিয়ে চলে এলাম । আজ তাকেই ঢাকুরিয়া থেকে ( প্রবীর দা’র বাড়ি) আমার কাছে আসতে হবে হেঁটে গড়িয়া পর্যন্ত, ছিঃ ছিঃ । এতটা অধর্ম মানুষ হিসেবে করা যায় না । অমানবিকতার থেকে বড়ো সংক্রমণ নিশ্চয়ই কোভিড- ১৯ নয়। পাশে তখন রাখা আছে তার দোকান থেকে নিয়ে আসা ‘One- Act plays of To-Day’ First series , selected by J. H. Marriott (1940)। ফোন করলাম-
জীবনের ভাষা লেখে তার নিজস্ব বইওযা়লা :

– হ্যাঁ সায়ন বলো?
– দাদা তুমি কাল কোথায় থাকবে গো?
– আমাকে একটু যাদবপুর যেতে হবে। বাড়ির শর্টকাট দিয়ে যাওয়া যায় – কেন কি দরকার বলো না?
– আচ্ছা আমি যাব যাদবপুর, আমাকেও একটা কাজে যেতে হবে স্টাডি সেন্টারে – অল্প কিছু আমি তোমাকে দেব।
– তুমি কিভাবে আসবে এতটা? বাড়ির সামনে কোনো রিকশা পাবে না? (চিন্তিত)
– প্রবীর দা, যখন যে বই দরকার হয়েছে তুমি এমনই ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছ। পয়সার কথা কিচ্ছু বলোনি। সমস্ত Antique বই তোমার দামের চেয়ে কত কম দামে আবদার করেছি, বয়সে ছোটো বলে দিয়েছো – আজ এই বিপদের দিনে যদি নূন্যতম সাহায্য তোমাকে না করতে পারি – তাহলে এইসব জ্ঞান গম্ভীর বই পড়ার কোনো অর্থ নেই গো।
– আচ্ছা বেশ ঠিক আছে, কাল দেখা হবে বেলা এগারোটা নাগাদ যাদবপুরে রাজীব গান্ধীর মূর্তির সামনে।
সমস্ত মানুষ সামাজিক দূরত্বে চলে যায় না। আর যারা যায় তাদের জন্য প্যান্ডেমিকের প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষ এলো, আমি এখন বইপত্র পাচ্ছি না বলে আমার জন্য হাতে করে বিনয় ঘোষের ‘বাংলার বিদ্বৎসমাজ’ নিয়ে এলো এবং এমনিই বইটা পড়তে দিলো। এখানেই শেষ নয় । প্রবীর দা প্রথম আনলক পিরিয়ডে ডাকলো চারমাস পর দোকান খুলেছে বলে, আমার জন্য নাকি কিছু বই জোগাড় করেছে । আমি বললাম – ” দাদা আমি যে খুব সংকটের মধ্যে আছি গো , বই তো কিনতে পারব না , কাজ কম্ম বন্ধ হয়ে গেছে। ” শুনে বলল –
” টাকা চেয়েছি নাকি! তুমি ওই সময় বিপদের দিনে যা সাহায্য করেছ সেটা আমি ভুলব না । তোমার কিছু বই প্রাপ্য। যখন সব কিছু ঠিকঠাক হবে তখন পয়সা নিয়ে ভাববে। তাড়াতাড়ি বিকেলে গড়িয়াহাট এসে নিয়ে যাও ।”
আমি অতি সামান্য অর্থ দিয়েছিলাম বলে তার প্রতিদান স্বরূপ উনি আমাকে দিলেন- ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’, সুধীর চক্রবর্তী, ‘ Shakespeareion Tragedy’, S. C. Sengupta, ‘ essential of poetry / lousell lectures, 1911, William Milos Neilson, ‘T. S. Eliot, An introduction ‘ , Northop Frye, ‘A comparison to shakespeare studies ‘ , ‘রঙ্গালয়ের বঙ্গনটি’, অমিত মৈত্র। একটা পয়সা নিলেন না। সমস্ত দাম লিখে রেখে দিলো।
হ্যাঁ আপনি ঠিকই পড়ছেন, আপনিও এই মানুষটার সঙ্গে দেখা করে গল্প করে আসতে পারেন। বইয়ের মধ্যে যে মানবতা তার অনুভব আপনি গডি়যা়হাট বেসমেন্ট এ গেলেই দেখতে পাবেন।
বাইরের পরিস্থিতি সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত তবুও কিছু মানুষ থাকে যারা ‘কৃতজ্ঞতা’ আর ‘ভালোবাসা’ শব্দ দুটোকে সম্মান করে। বইকে ভালোবাসে যারা, সেই আমার আত্মীয় – এই নীতিতে বিশ্বাসী কিছু জীব এখনও বাস করে পৃথিবীতে – যারা আজও এসে গড়িয়াহাট বেসমেন্টে প্রবীর দার ‘অহনায়ন বুক স্টোরে ‘ আড্ডা জমায়।
একটা বড়ো প্যাকেট বই হাতে নিয়ে গড়িয়াহাট অটো স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটছি। তখন সন্ধ্যার প্রথম প্রলেপ আকাশে ছড়িয়ে গেছে। স্যরের(চিন্ময় গুহ) শেখানো একটা কথা মনে পরে গেল – ” সব কিছুর পরেও সায়ন, পৃথিবীটা কিন্তু সুন্দর ” একদমই তাই স্যর – ওই যে কৃষ্ণচূড়া গাছের রঙ আজও লাল, আকাশ এখনও মাথার উপর আছে,আজও প্রবীর দার মতো মানুষেরা ভালো জ্ঞানের, শিক্ষার, জানার উপকরণ নিয়ে একটা বিরাট হৃদয়ের দরজা খুলে অপেক্ষা করে । গড়িয়াহাট মোড়ে এসে শুধু একবার প্রবীর দাকে 9830720143 তে ফোন করলেই – আপনার জন্য জ্ঞান বিশ্বের একটা সিন্দুকের চাবি অনায়াসে হাতে চলে আসবে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।