সেদিন বিরজাকে বলেছিলাম দেবতা না হয়ে দেবতার পুজো করা যায় না। কেন বলেছিলাম, কী ভাবে বলেছিলাম, আদৌও ঠিক বলেছিলাম কী না এই নিয়ে কিছুদিন ধরে মনটা বড় অশান্ত। সিদ্ধান্ত এতো সহজে আসে না, হয়তো বা এতো সহজেই আসে, মন মানতে চায় না। সুতরাং সিদ্ধান্ত যখন মীমাংসার জালে বন্দী তখন একটা উত্তর-মীমাংসার প্রয়োজন হয়৷ আর এই উত্তর-মীমাংসায় ভাবের স্থান নেই। সুতরাং হে নীলসরস্বতী, তুমি এক্ষণে নীলচণ্ডীকা রূপে আমার লেখনী নিয়ন্ত্রণ করো, মনের দ্বন্দ্বাসুরকে নিধন কর প্রিয়ে…প্রসীদ দেবী, প্রসীদ…
देव সংস্কৃত শব্দটি ইন্দো ইরানিয়ান দেব্ হতে এসেছে যা প্রত্ন-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় দেইয়োস, মূলত একটি বিশেষণ পদ যার অর্থ স্বর্গীয় বা উজ্জ্বল। দিব্ ধাতুর আদিস্বর প্রত্যয়ের নিয়মে বৃদ্ধি পেয়ে দেব শব্দটি গঠন করেছে। দিব্ ধাতুর অর্থ দীপ্তি বা জ্যোতির প্রকাশ। দেইয়োস এর স্ত্রীবাচক রূপ দেইয়িহ, যা থেকে ভারতীয় ভাষার দেব এর স্ত্রীবাচক রূপ দেবী শব্দের উদ্ভব। অর্থাৎ মূলত কাছে এসে যা দাঁড়ায় তা অনেকটা এমন — “স্বর্গীয়, দিব্য, অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ পার্থিব বস্তু, মহিমাময় এবং উজ্জ্বল”।
বেদ এর প্রাচীনতম অংশ সংহিতায় হিসাব অনুযায়ী ৩৩ জন দেব (ত্রিভুবনের প্রতি ভুবনের জন্য ১১ জন) অথবা ব্রাহ্মণ অংশে দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্টবসু ও দুইজন অশ্বিন রয়েছেন। ঋগবেদ এর ১.১৩৯.১১ মন্ত্র অনুযায়ী
ये देवासो दिव्येकादश स्थ पृथिव्यामध्येकादश स्थ ।
अप्सुक्षितो महिनैकादश स्थ ते देवासो यज्ञमिमं जुषध्वम् ॥११॥
হে স্বর্গনিবাসী একাদশ দেবতা, হে একাদশ দেবতা যারা পৃথিবীতে অবস্থান করেন,
এবং হে সলিলনিবাসী একাদশ দেবতা, আপনারা সানন্দে এই উৎসর্গ গ্রহণ করুন।
এরা কারা? কেন দেবতা?
কিছু দেবতা প্রাকৃতিক শক্তি প্রকাশ করেন (বায়ু, অগ্নি প্রভৃতি) আবার কিছু দেবতা নৈতিক জ্ঞান প্রকাশ করেন যেমন আদিত্য, বরুণ, মিত্র। প্রত্যেক দেবতাই বিশেষ জ্ঞান, সৃজনশক্তি, মাহাত্ম্যপূর্ণ অলৌকিক শক্তি(সিদ্ধি) প্রভৃতির ধারণকারী। ঋগবেদে বহুল উল্লিখিত দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্র, অগ্নি ও সোম প্রধান। অগ্নিকে সকলের মিত্র ভাবা হয়। বিভিন্ন হিন্দুধর্মীয় কৃত্যে যজ্ঞানুষ্ঠানের সময় অগ্নি ও সোম বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকেন। সাবিত্রী, বিষ্ণু, রুদ্র(পরবর্তীকালের শিব) এবং প্রজাপতি(পরবর্তীকালের ব্রহ্মা) হলেন ভগবান তথা দেব। সরস্বতী ও ঊষা হলেন দেবী। অনেক দেবসত্তাই একত্রে বিশ্বেদেব রূপে পূজিত হন।
উর্দ্ধশক্তি কণ্ঠে, অধোশক্তি গুহ্যদেশে এবং মধ্য-শক্তি নাভিতে অবস্থিত। আর যিনি এই তিন শক্তির বাইরে তাকেই নিরঞ্জন ব্রহ্ম বলে। গুহ্য চক্রকে আধার, লিঙ্গ-চক্রকে স্বাধিষ্ঠান, নাভি-চক্রকে মনিপুর, হৃদয়-চক্রকে অনাহত, কণ্ঠ-চক্রকে বিশুদ্ধ এবং মস্তক-চক্রকে সহস্রদল বলে। যিনি এই ছয় চক্রকে ভেদ করতে পারেন তিনি চক্রাতীত ও নমস্য ব্যক্তি। শরীরের উর্দ্ধ দিক হল ব্রহ্মলোক। এবং শরীরের নীচের দিক হল পাতাল লোক। এই শরীর বৃক্ষের মত কিন্তু এর উর্দ্ধদিক হল সেই বৃক্ষের মূল স্বরূপ এবং নিম্নদিক হল সেই বৃক্ষের শাখা স্বরূপ।
হৃদয়ে প্রাণবায়ু, গুহ্যদেশে অপাণবায়ু, নাভিদেশে সমান বায়ু, কণ্ঠে উদানবায়ু, দেহের ত্বকে ও সারা দেহ জুড়ে ব্যান বায়ু অবস্থিত। নাগ বায়ু উর্দ্ধপান হতে আগত এবং কূর্ম্মবায়ু তীর্থ দেশে আশ্রিত। কৃকর বায়ু মানসিক ক্ষোভে, দেবদত্ত বায়ু হাই তুললে এবং ধনঞ্জয় বায়ু গভীর চিৎকার করলে নিবেশিত হয়ে সাম্য রক্ষা করে। এই দশ প্রকার বায়ু নিরালম্ব (অবলম্বন শূন্য) এবং যোগীগণের যোগ সম্মত। আমাদের শরীরের বাহ্যত নবদ্বার প্রত্যক্ষ করা যায় এগুলি হল দুটি চোখ, দুটি কান, দুটি নাসারন্ধ্র, মুখ, গুহ্য ও লিঙ্গ এবং দশম দ্বার হল মন। আরও আছে সেটি সাধন ক্রমের বিষয় এখানে টেনে লাভ নেই।
ঈড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না এই তিনটি নাড়ী উর্দ্ধগামিনী; গান্ধারী, হস্তি জিহ্বা ও প্রসবা এই তিনটি নাড়ী দেহের সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত আছে। শরীরের দক্ষিণ অঙ্গে অলম্বুষা ও যশা এই দুটি ও বাম অঙ্গে কুহু ও শঙ্খিনী এই দুটি নাড়ী ব্যবস্থিত। এই দশ প্রকার নাড়ী হতেই শরীরে নানা নাড়ী উৎপন্ন হয়েছে এবং বাহাত্তর হাজার প্রসূতিকা নাড়ী শরীরের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। যে যোগী এই সমস্ত নাড়ী গুলিকে জানেন তিনি যোগ লক্ষণ যুক্ত হয়ে যান এবং জ্ঞাননাড়ী হতেই যোগীগণ সিদ্ধিলাভ করে থাকেন।
এবার আসবো মূল তিন দেবতা মানে ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেষ প্রসঙ্গে। রজো ভাবে ব্রহ্মা, সত্ত্ব ভাবে বিষ্ণু ও ক্রোধ ভাবে রুদ্র অবস্থিত আছেন। এই হল তিন দেবতা, এই হল তিন প্রকার গুণ। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই তিন দেবতার মূর্ত্তি একই, যার মনে এই তিন দেবতার পৃথক পৃথক ভাব পরিকল্পিত হয় তার মুক্তি কখনোই হয় না। দেহের মধ্যে ব্রহ্মা বীর্য্যরূপে, বিষ্ণু বায়ু রূপে ও রুদ্র মন রূপে অবস্থিত আছেন, এই তিন দেবতা ও এই তিন গুণ। দয়া ভাবে ব্রহ্মা, শুদ্ধ ভাবে বিষ্ণু ও অগ্নি ভাবে রুদ্র অবস্থান করে এই তিন দেবতা, এই তিন গুন। এই জগৎ চরাচর সকল কিছুই সেই সেই এক পরব্রহ্ম থেকেই উৎপন্ন হয়েছে, যার মধ্যে এই জগৎ সম্বন্ধে নানা ভাবের সৃষ্টি হয় তার মুক্তি কখনই হয় না। আমিই সৃষ্টি, আমিই সময়, আমি ব্রহ্মা, আমি হরি, আমি রুদ্র, আমি শূন্য, আমি সর্বব্যাপী ও আমিই নিরঞ্জন ব্রহ্ম। আমি সর্বময়, আমি নিষ্কাম, আমার উপমা আকাশ, শুদ্ধ স্বভাব ও নির্ম্মল ব্রহ্ম স্বরূপ মনও আমি, এর মধ্যে কোন সংশয় নেই। যে বীর জিতেন্দ্রিয়, ব্রহ্মচারী, সুপণ্ডিত, সত্যবাদী, দানশীল, অন্য ব্যাক্তির হিতে রত (পরোপকারী) তাকেই ভক্ত বলে। ব্রহ্মচর্য তপস্যার মূল এবং দয়া ধর্মের মূল তাই যত্ন সহকারে দয়া ও ব্রহ্মচর্যের আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত।
জ্ঞানসঙ্কলিনী তন্ত্রমে মহাদেব নিজে বলেছেন, – হাজার অশ্বমেধ যজ্ঞ বা একশ বাজপেয় যজ্ঞের যে পুণ্যফল তা ব্রহ্মজ্ঞানের পুণ্যফলের ষোলকলার এক কলারও সমান নয়। সব সময়ে শুচি হয়ে সকল পুণ্যতীর্থে ভ্রমণ করে যে পুণ্যফল তা ব্রহ্মজ্ঞানের পুণ্যফলের ষোলকলার এক কলারও সমান নয়। না বন্ধু, না পুত্র, না পিতা, না সখা, না স্বামী কাউকেই সেই গুরুর সাথে তুলনা করা যায় না যে সেই পরম পদ দেখিয়ে দিতে পারেন। না বিদ্যা, না তীর্থ, না দেবতা কেউ সেই গুরুর সাথে তুলনীয় নয় যে সেই পরম পদ দেখিয়ে দিতে পারেন। এবং সেই পরম পদ পাওয়ার জন্য গুরু শিষ্যকে যে একাক্ষর মন্ত্র নিবেদন করেন সারা পৃথিবীতে এমন কোন দ্রব্যই নেই যার দ্বারা গুরুর সেই ঋণ শিষ্য শোধ করতে পারে। যাকে তাকে এই সুগোপনীয় ব্রহ্মজ্ঞান দেওয়া যায় না কেবলমাত্র সদগুরু(?) তার যে কোন ভক্ত শিষ্যকেই এই ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করবেন।
পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্ব না টানলে সেই ব্রহ্মজ্ঞান স্বরূপতা পায় না। কারণ নিরাকার প্রণবের ব্যাপ্তি শব্দ ছাড়া আর কিছুতে প্রকাশ করা সম্ভব কী? আনন্দের আদিও যা অন্তও তাই।অকার সত্ত্বগুণ, উকার রজোগুণ এবং মকার তমোগুণ এই তিন গুনের আধারই প্রকৃতি। অক্ষরই প্রকৃতি এবং অক্ষরই স্বয়ং ঈশ্বর (পুরুষ)। প্রকৃতি এই পুরুষ থেকেই এসেছেন এবং সত্ত্ব, রজ:, তম: এই তিন গুনের দ্বারা বদ্ধ হয়েছেন। সেই মায়া স্বরূপ প্রকৃতি পালন, সৃষ্টি, সংহার এই তিন শক্তিবিশিষ্ট এবং সেই মায়াই অবিদ্যা, মোহিনী, শব্দরূপা ও যশস্বিনী হয়েছেন। অকার ঋকবেদ, উকার যজুর্বেদ ও মকার সাম বেদ এই তিনটি মিলিত হয়েই অথর্ব্ববেদ হয়েছে। ওঁকার প্লুত স্বর এবং একে ত্রিনাদও বলা হয়ে থাকে। অকার ভূলোক, উকার ভুবর্লোক ও ব্যঞ্জন সহ মকার স্বর্গলোক এবং এই তিন অক্ষরেই আত্মা বিশেষ ভাবে অবস্থিত থাকে। তিনে এক হয়ে সেই পরমাত্মা। বিরাট শিশু।
সে যাই হোক। এই যদি সিদ্ধান্ত হয় তবে চক্রজ্ঞানের আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন। শ্রীগুরুমহারাজ কী সুন্দর বলতেন বেশ সহজ করে—
জীবের মন লিঙ্গ, গুহ্য ও নাভিতে। সাধ্য-সাধনার পর কুলকুন্ডলিনী জাগ্রতা হন। ইড়া, পিঙ্গলা আর সুষুম্না নাড়ী; — সুষুম্নার মধ্যে ছটি পদ্ম আছে। সর্বনিচে মূলাধার, তারপর স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা। এইগুলিকে ষট্চক্র বলে।
“কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রতা হলে মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর — এই সব পদ্ম ক্রমে পার হয়ে হৃদয়মধ্যে অনাহত পদ্ম — সেইখানে এসে অবস্থান করে। তখন লিঙ্গ, গুহ্য, নাভি থেকে মন সরে গিয়ে চৈতন্য হয় আর জ্যোতিঃদর্শন হয়। সাধক অবাক হয়ে জ্যোতিঃ দেখে আর বলে, ‘একি!’ ‘একি!’ একি দেখলা।’
“ষটচক্র ভেদ হলে কুণ্ডলিনী সহস্রার পদ্মে গিয়ে মিলিত হন। কুণ্ডলিনী সেখানে গেলে সমাধি হয়।
“বিশুদ্ধ চক্র পঞ্চমভূমি। এখানে মন উঠলে কেবল ঈশ্বরকথা বলতে আর শুনতে প্রাণ ব্যাকুল হয়। এ-চক্রের স্থান কণ্ঠ। ষোড়শ দল পদ্ম। যার এই চক্রে মন এসেছে, তার সামনে বিষয়কথা — কামিনী-কাঞ্চনের কথা — হলে ভারী কষ্ট হয়! ওরূপ কথা শুনলে সে সেখান থেকে উঠে যায়।
“তারপর ষষ্ঠভূমি। আজ্ঞা চক্র — দ্বিদল পদ্ম। এখানে কুলকুণ্ডলিনী ঈশ্বরের রূপ দর্শন হয়। কিন্তু একটু আড়াল থাকে — যেমন লন্ঠনের ভিতর আলো, মনে হয় আলো ছুঁলাম, কিন্তু কাচ ব্যবধান আছে বলে ছোঁয়া যায় না।
“তারপর সপ্তভূমি। সহস্রার পদ্ম। সেখানে কুণ্ডলিনী গেলে সমাধি হয়। সহস্রারে সচ্চিদানন্দ শিব আছেন — তিনি শক্তির সহিত মিলিত হন। শিব-শক্তির মিলন!
“সহস্রারে মন এসে সমাধিস্থ হয়ে আর বাহ্য থাকে না।মুখে দুধ দিলে গড়িয়ে যায়। এ অবস্থায় থাকলে একুশদিনে মৃত্যু হয়। – ইহাই দেবত্ব অবস্থা।
তাহলে সমাধি ভূমিতে ছাড়া প্রকৃত অর্থে পুজো করা সম্ভব নয়, আর সমাহিত মাত্রই দেবতা। সুতরাং বিরজাকে ভুল কিছু বলিনি। দেবতা না হয়ে দেবতার পুজো করা যায় না।
আহঃ শান্তি বোধ করছি। উত্তর-মীমাংসা সফল। কিন্তু লিখতে লিখতে চঞ্চল বেয়াদব মন আর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে তখন থেকে। তাহলে আমরা যারা নিতান্ত সাধারণ যাদের সাধন ভূমি নেই আমারা কী করছি!!! কেন জপ? কেন তপ? কেন এত পুজো পাঠ, কেনই বা এতো কর্মকাণ্ড? আসলে অভ্যাস। প্রতিনিয়ত আমরা অভ্যাস করে যাচ্ছি কী ভাবে পুজো করবো সেই ভূমের জন্য। তার পথ কিন্তু প্রকৃত অর্থ তন্ত্রযোগ ছাড়া সম্ভব নয়।
তন্ত্র- ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু গভীর তার অন্তর্নিহিত অর্থ। তন্ত্র হল এক বৃহৎ ও অতিপ্রাচীন গুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় বিষয়। মুক্ত বিশ্বকোষে বলা আছে, তন্ত্র হিন্দুসমাজে প্রচলিত ঈশ্বর উপাসনার একটি পথবিশেষ। শিব ও মহাশক্তির উপাসনা সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলিকেও তন্ত্র সাধনা নামে অভিহিত করা হয়। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, এই মহাবিশ্ব হল শিব ও মহাশক্তির দিব্যলীলা। তন্ত্রে যেসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি-নীতির বর্ণনা রয়েছে তার উদ্দেশ্যই হল মানুষকে অজ্ঞানতা ও পুনর্জন্মের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া।
খ্রিস্ট্রীয় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম দিকে তন্ত্র সাধনার বিকাশ লাভ করে। গুপ্তযুগের শেষভাগে এই প্রথার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। মূলত বৌদ্ধধর্মের হাত ধরেই পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে এই তন্ত্রশাস্ত্রটি। তন্ত্র ভারতের অতিপ্রাচীন এবং গুরু পরম্পরার একটি গুপ্ত বিদ্যা। প্রাচীন ভারত থেকে বহু মূল্যবান পুঁথি চীনা পরিব্রাজকরা তাঁদের দেশে নিয়ে চলে গেছেন। এটি গুরু পরম্পরা বিদ্যা বলে প্রকৃত গুরুর খোঁজ করতে হয়। দীক্ষা ছাড়া এ শাস্ত্র সম্পর্কে সহজে কেউ কাউকে কিছু ব্যক্ত করেন না। তন্ত্র এমনই একটি শাস্ত্র যার মাধ্যমে নিজেকে অনুসন্ধান করা যায়। নিজের অন্তরের ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়।
তন্ত্র শব্দটির অর্থ ব্যাপক । সংক্ষেপে তন্ত্র হচ্ছে “সৃষ্টির পরিচালনার নিয়ম ” । মহাদেব বা শিবের ডমরু থেকে তন্ত্রের উৎপত্তি । সতী বা দেবি দূর্গার দশ হাতে আছেন দশ মহাবিদ্যা । এই দশমহাবিদ্যার উপর ভিত্তি করেই অনেকটা তন্তশাস্ত্র গড়ে উঠেছে । তন্ত্রের বিষয়টা অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত । সাধারনভাবে, তন্ত্র অসীম জ্ঞানের আধার । সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের তন্ত্রসাধনা রিসার্চ করলে দেখা যায়, যা অবিদ্যাকে গ্রাস করে তাই জ্ঞান। তন্ত্র জ্ঞানচক্ষু উম্মোচন করে।সৃষ্টির কারন বুঝতে সাহায্য করে তন্ত্র। তন্ত্র সৃষ্টি , স্থিতি ও বিনাশের পরিচালনা শক্তি। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এই তিন শক্তির পরিচালনা নিয়ম ব্যাক্ত করে তন্ত্র।তন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত আছে মন্ত্র ,যন্ত্র । তন্ত্র সাধনায় সাধক সৃষ্টির রহস্য জেনে পরমানন্দ অনুভব করে। চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকে তুষ্ঠ করতেই পূজা করা হয়; যাতে পূজারী / ভক্তের জীবন আনন্দময়, কল্যাণময় হয়ে ওঠে। তন্ত্র হচ্ছে দর্শন বা তত্ত্ব। তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তার কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, মা বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে; দেবী মা (প্রাকৃতি কে) কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে। চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী দূর্গা- কালী- বাসুলী – তারা- শিবানী। কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন (আমি আগেই একবার ইঙ্গিত দিয়েছি) অনার্য দেবতা শিব। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছে কালীর কাছ থেকে। আবার শিব- এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তিলাভ করে নারীশক্তি থেকে। শিব শক্তি লাভ করেছেন তাঁর নারীশক্তির প্রকাশ- গৌড়ীর শক্তি থেকে। তবে শিবের নিজস্ব শক্তিও স্বীকৃত। তন্ত্রসাধনার মূল উদ্দেশ্যই হল- (প্রাকৃতিক) শক্তি দেবীর সাধনা করে “শিবত্ব” লাভ তথা শক্তিমান হওয়া।
ঈশ্বর নিরাকার। রূপহীন। যে কারণে প্রাচীন বৈদিক আর্যরা ঈশ্বরের রূপ বর্ণনা করেছেন এভাবে-
‘রূপংরূপ বিবর্জিতস্য ভবতো ধ্যানেন যদবর্ণিতং।’
এর মানে হল-‘হে রূপহীন ঈশ্বর! ধ্যানে তোমার রূপ বর্ণনা করেছি।’
তন্ত্রমতে নারী জগতের আদি কারণ এই জন্য যে এই নিরাকার রূপহীন ঈশ্বরকে যখন নারী ভাবা হয় তখন ঈশ্বরের মাহাত্ম ক্ষুন্ন হয় না। কাজেই ভক্তের মানসিক প্রবনতার ওপরই মাতৃমূর্তির কল্পনা।
যে কারণে বলা হয়েছে -‘সাধকানাং হিতার্থায়ৈ ব্রহ্মণে রূপকল্পনা ‘
এর মানে হল- ‘সাধকের হিতের জন্য ঈশ্বরের রূপ কল্পনা করা হয়েছে।’