সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৬০)

রেকারিং ডেসিমাল
ছোটবেলায় মায়ের বাবা মশাই সব সময় মনে করাতেন, জলের মত হও।
জলকে ঘুষি মারলে সে কি ফিরে আঘাত করে ?
না।
সে কি ভেঙে যায়?
না।
সে সরে যায়। আবার নিজের জায়গায় ফিরে এসে বয়ে চলে।
তাকে তাই ব্যথা দেয়া যায় না।
মেয়ের প্রশ্ন হত, কিন্তু বা, সামনে পাথর ফেলে আটকালে ?
বাবা বলতেন, দু রকম হয়।
এক, ক্রমাগত ঘর্ষণ পাহাড়কেও খইয়ে গভীর খাত বানিয়ে ফেলবে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মত। তবে যুগ কেটে যাবে সে লড়াইয়ে।
দুই, পাথরের পাশ দিয়ে ঘুরে চলে যাবে জল। তাকে কে ঠেকায়। নিমেষে নিজের গন্তব্যের দিকে বয়ে চলবে স্রোতস্বিনী।
ফাঁকিবাজ মেয়ের দ্বিতীয় রাস্তাটাই পছন্দসই হল বড় হতে হতে।
সে ভাল করে ঠাওর করে দেখেছিল, কখনও দশভূজা কখনও অষ্টাদশভূজা কখনও সহস্রভূজা বিজয়ী যোদ্ধা মহিলা, পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে, চুলের মুঠি ধরে লোকের মাথা কাটেন এবং বুকের মধ্যে লোহার শূল ঢুকিয়ে মারেন বটে, কিন্তু পিছনে চালচিত্রের ওপরে শিব ঠাকুরের এক পিশ ছবি মাস্ট।
ঐ, বিলংস টু এন্ড এপ্রুভড বাই।
এইটে বললেই আর জোয়ান অফ আর্ক বলে রে রে করে লোকে জ্যান্ত পুড়িয়ে দিতে আসে না।
বা পরবর্তী কালের রানি তারাবাইয়ের মত শেকলে বেঁধে গুম ঘরে আটকানোর চেষ্টা করে না।
তা বেশ। তাই হোক।
শিব ঠাকুর যোগাড় হয়েছেন। দিব্যি লম্বা এবং চওড়া। রাজস্থান বা পুনার কিল্লার চট্টান দরজার চেয়ে কম নয়।
এমন মানুষ যদি, পিছনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে ও থাকে, তাতেই দিব্যি কাজ চলে যায় মায়ের।
তিনি ভাসানের ঢাকের সাথে দুই ছানাকে সাথে নিয়ে প্রাণ ভরে নাচেন। তিনি পাব্লিক ফাংশনের স্টেজে ছেলে মেয়ে এবং অবশ্যই বর সমভিব্যাহারে বলিউডের গান গেয়ে হইহই ফেলে দ্যান। সুট, জিনস ইত্যাদি পরে কাজ এবং পার্টি সামলান।
আরো কি কি যে করেন সে লম্বা লিস্টি।
তবে, ওই, কর্তাটিকে বগলদাবা না করে কোথাও না।
আঠাশ বছর ধরে এই ফরমুলাতেই নদী আপন বেগে দৌড়াচ্ছে, চালচিত্রে শিব ঠাকুর বসে আছেন নিশ্চিন্ত হয়ে।
মা মিটিমিটি হেসে ফ্যাবইন্ডিয়া ইত্যাদির বাহারের জামা কাপড় বাবার জন্য কিনে ওয়ার্ডরোবে সাজাতে সাজাতে ছেলে মেয়েকে শোনান, তাঁদের ছেলেবেলার গান।
” আহারে হৈমবতী শিবসোহাগী রাজার নন্দিনী,
তার কপালে পাগলা ভোলা লোকে কি কবে,
সাজতে হবে শিব তোমারে সাজতে হবে… “