সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩৩)

পুপুর ডায়েরি
শীত কাল
সকালে ঘুম ভেংগে উঠে দেখলাম শীতকাল আমার বারান্দা টপকে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দরজা খুলে দিয়ে বললাম ভিতরে এসো। আর লেপ কম্বলদের বারান্দার গ্রিলে গরম হতে মেলে দিলাম।…. হঠাৎ মনে পড়ে গেলো, আমার এক বন্ধু আমি আসব বলে রোদ্দুরে কম্বল গরম করে রেখেছিল। তোমরা বলবে এ আর এমন কি? আমার কিন্তু ভারি মিষ্টি লাগল মনে পড়ে। খুব খুশী হয়ে শীতকালকে বললাম ভিতরে এসো।
ছোট বেলায় শীত আসত গুটি গুটি। এক দিন ভোরে দেখতাম, মা মশারীর ওপরে পাতলা চাদর চাপা দিয়ে দিয়েছেন। পাখার হাওয়া কমতে কমতে রেগুলেটর কটাস করে বন্ধ।চোখ বুজে চেঁচাই, “বন্ধ করলে কেনো ”
মা বলেন, “আচ্ছা বেরিয়ে এসো তো চাদরের ভেতর থেকে,সোনা। “মশারীর বাইরে বেরোলেই, ওরে বাবা, ছ্যাঁক করে কামড়ায় ঠান্ডা।মেজেতে পা রাখলেই ইসসস।
মা ঘরে পড়ার হাওয়াই চপ্পল, আর গরম জামা পড়িয়ে দেন ফ্রকের ওপরে। স্কার্ফ বেধে দেন কান ঢেকে। হাতের কাছে স্কার্ফ না থাকলে, কত সময় মায়ের সুন্দর গন্ধ ওয়ালা কটস উলের ব্লাউজ দিয়েই কান গলা পেঁচানো হয় ব্রাশ করতে করতে। হাতে জল লাগলেই হিহি শীত। কোন রকমে মুখ ধুয়ে ছুট্টে খাটে ওঠা। ততক্ষনে খাটে সুন্দর নরম সাদা ওয়াড় দেওয়া ন্যাপথালিনের মিস্টি গন্ধ মাখা পরিস্কার লাল লেপ এসে গেছে। তার মধ্যে ঢুকে পড়তে কি মজা, কি মজা।
শীত মানেই পাটালী গুড়। লাল পায়েস। পাটি সাপটা, দুধ পুলি,ক্ষিরে চোবানো লাউয়ের পায়েস। শীত মানেই মায়ের বানানো কড়াইশুটির কচুরি।
সে একবার খেলে আর ভোলা যায় না।আমি আর ‘বা, মানে আমার বাবা মশাই, আমরা শীত কালে পেটুকপনা করে বড়ই ভালো থাকতাম। শীত কালে কড়াই শুটি ছাড়িয়ে বাটি ভরে দিতাম মাকে।সারি সারি মুক্তোর মত গোল, নিটোল, ছোট বড় মাঝারি কড়াইশুটিরা সবুজ পাতার মত খোসার ডোংগায় শুয়ে আছে। দেখতে ভারি মজা।আর শীত মানেই সকাল বিকেল রাশি রাশি কমলা লেবু আর টমেটো খাওয়া।
আমাদের পাড়া মানে একটা সাত আট ফুট রাস্তা। তার দুধারে মুখোমুখি সার দিয়ে বাড়ি। পিছনে উঁচু দিয়ে রেল লাইন। তার পাশে বস্তির ঝুপড়ি। আমরা গলির সামনের দিকে একটা দোতলা বাড়ির একতলায় থাকি।সামনের দরজা দিয়ে বেরোলে বড় রাস্তা। গলির সাথে কোন যোগাযোগ থাকে না।বাবা মা সে দিক দিয়েই অফিসে চলে যান।আমিও ইস্কুলে যাই।পাড়ার কোন বাড়িতে যাওয়া আমার বারণ।
কিন্তু আমি একলা থাকি আর বাবা মা অফিসে যান তাই আমার আলমারি ভরতি খেলনাপাতি। নানা মাপের ছোটরা আমার সাথে খেলতে আসে।আমাদের ফ্ল্যাটের একটা পিছন দিকের দরজা আছে। জমাদার আসার জন্য একটা রাস্তা, সেখান দিয়ে কাজের লোকেরা ও আসে। সে দরজাটা খুললেই পাড়া। ছুটির দিনে সেখান দিয়েই আমার সংগীরা ঢোকে। ঠিক পাসের বাড়ির দোতলার রোগা, সাদা,সরু সরু আঙুলের বুকুনি।ওদের এক তলার ভাড়াটেদের গোব্দা, ঝাঁকড়া চুল দোলানো খ্যাপাটে পুচকে, কেকা। দু তিনটে বাড়ি পরের ক্ষয়াটে আরো ছোট ছেলে, বাবুল। এদের থেকে আমি ক্লাসে ঢের উঁচু। কিন্তু মনের বয়েসটা কাছাকাছি যে,সেটা ওরা টের পেতো। তাই খেলতে ডাকত আমায়। একে আমার ঘর ভরতি খেলনা।তায় পড়াশুনোয় ভাল বলে পাড়ায় খাতির, কাজেই খেলার দক্ষতায় লাড্ডু হলে ও পুপু দিদিই ওদের লিডার।
শীত কালে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোনোর অনুমতি মিলত।সকালে জল খাবার খেতে না খেতেই নানা রকম আওয়াজের কোরাস।
কখন বেরোবে?
বল কে আনবে?
র্যাকেট আছে তো?
আগে কার খেলার কথা?
সঙ্গে বড়দের গলা ও ভেসে আসে, -“হোমটাস্ক সারো আগে।”
-“এত সকালে কেনো রে?”
– “গরম জামা পড়েছিস? ”
দশটা থেকে এগারোটার মধ্যেই, গলি খেলার মাঠ।
আমার দুটো র্যাকেট আর খেলুড়ে চার কাজেই দু জনকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।সেই নিয়ে টানাটানি। মাঝেমাঝে ব্যাড মিন্টন থামিয়ে তাই পিট্টু খেলা।সাতটা পাতলা চারা মানে প্লেন হয়ে যাওয়া ইট বা টালির টুকরো ওপর ওপর সাজিয়ে বল দিয়ে ছুড়ে সেটা ভেংগে দিয়েই দৌড়। অন্য পক্ষ বল ছুড়ে আউট করে দেবার চেস্টা করবে, যারা ভেংগেছে তাদের। সব শুদ্ধু ভয়ানক চেঁচামিচি দৌড়াদৌড়ি, হা হা হি হি।ঘেমে ঝোল হয়ে,ধুলো মেখে, কোথায় পালিয়েছে শীত। বারোটা বাজলে সব বাড়ি থেকে মায়েদের ডাক ভেসে আসত। আমিও ঢুকে পড়ি পিছনের ছোট দরজা দিয়ে। কোন রকমে চান খাওয়া সারলেই হু হু কি ঠান্ডা শিগগির ছাদে চল।আবার কল কল করে ছোটদের কলরব।
–”চল চল…. ”
দোতলার বাড়ি ওয়ালা ঘটক পরিবার, কখনওই আমাদের বাইরের লোক ছিলেন না।
চটি ফট ফট করে সবাই মিলে ছাদে শতরঞ্চি নিয়ে উঠে যেতাম, বিনা বাক্য ব্যয়ে কোলাপ্সিবল গেট খুলে ঢুকিয়ে নিতেন। দুপুর কেটে যেত লুডো, তাস,ওয়ার্ড মেকিং,ফল-ফুল-নাম-দেশ,হাবিজাবি খেলে। সঙ্গে মায়ের রেখে যাওয়া আচার, কমলা লেবু,ক্রিম বিস্কুট। এখন বুঝি আমার একা থাকা ঠেকাতে কত বেশি খাবার গুছিয়ে রেখে যেতেন। সবাই মিলে খেতাম। কম পড়ত না তো কখনো।
ইস্কুলে প্রথম যাওয়া তিন বছর বয়সে। আন্টিরা মাকে আভাস দিয়ে ছিলেন পরীক্ষাটা ভাল হয়েছে।
তাই বাবার সঙ্গে চুক্তি হল।
ফার্স্ট হয়ে নার্সারি টু তে উঠলে একটা বড় ক্যারাম বোর্ড।
ক্রিস্টমাসের আগের দিন রেজাল্ট। হলাম ফার্স্ট।
সাউদার্ন এভিনিউর মোড় থেকে চারু মার্কেট অব্ধি বাবার ঘাড়ে চড়ে ফিরল একটা লালচে সাদা, গোল মত মেয়ে।সারা রাস্তার লোক অবাক হয়ে শুনল দু জনের গলা ছেড়ে গান, “টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার, ফার্স্ট হলেই ক্যারাম বোর্ড!! ”
একেবারে ঘরে ঢুকে নামলাম বাবার কোল থেকে। হাটার তালে বাবার পিঠে মাথা রেখে ঝাঁকুনির আরামটা চিরকালের মত রয়ে গেলো সঙ্গে ।
সে দিন সন্ধ্যে বেলায় বাবা গলির মোড়ের সঞ্জীবদার দোকান থেকে খালি বিস্কুটের টিন নিয়ে এলেন। মা ইস্কুলে ভরতি হতেই স্টিলের পড়ার টেবিল কিনে দিয়েছিলেন,তিনটে ড্রয়ার ওয়ালা। তার ওপরটা সাদা টেবিল ক্লথ আর বিস্কুট টিনের ঝিরঝির সাদা কাগজ, সবুজ মারবেল পেপারের পাইন গাছে আশ্চর্য বরফের দেশ হয়ে উঠলো। আমি গোল গোল চোখে দেখলাম,সিগারেট বাক্সের সোনালি রুপালি রাংতা ঘন্টা আর তারা হয়ে সাজিয়ে দিল ক্রিসমাস ট্রিকে। সে গাছের নিচে রাখা রইল পুপুর রিপোর্টকারড।
অনেক আদরের ওমে মুড়ে মা বললেন, “সুনু মা, ঘুমিয়ে পড়,জেগে থাকলে সান্টা বুড়ো আসবেন না।”
স্বপ্নিল ঘুম থেকে উঠে পর দিন দেখলাম, টেবিলে সোনালি ফিতের বো করা কেক,কত কমলা লেবু, চিনি মাখা জেলি লজেঞ্চুসে রামধনু রং, আর দারুন মজার ছবি দেওয়া বই,”কানকাটা রাজার দেশ “।
বাবা বল্লেন,”ভাবছ কি?আমরা কিনে দিয়েছি? খুলে দেখো।”খুলে দেখলাম, সে আশ্চর্য লেখা। যেন ছোট ছোট তারা দিয়ে তৈরি অক্ষর। তাতে যে আদর ঝরে পড়েছিল, তারি ছোঁয়া এখন ও আমাকে, আমার চারপাশের মানুষকে,আমার ছোট্ট ছেলে মেয়েকেও আলোয় ভরিয়ে রেখেছে। সারা জীবন ওম্নি করেই ক্রিসমাস সাজাই আর বলি, “জয় হোক মানুষের, ওই নব জাতকের, ওই চির জীবিতের……”