সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৪৫)

পুপুর ডায়েরি

আমার শৈশবে, বেতার জগৎ বলে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত, আকাশবাণী র সমস্ত খবর ও সাহিত্য নিয়ে।
কারণ, বেতার তখন, মানে ক্যালেন্ডারের উনিশশো লেখা সালের সময়ে মানুষের জীবনের খুব খুব জরুরি অংশ ছিলো।
বেতার ; বললে আজকের প্রজন্ম বুঝবে কী?
তার-বিহীন যোগাযোগ যে কত আদরের জিনিস ছিলো পৃথিবীতে , আর বিদ্যুৎগতিতে সমস্ত দেশে যোগাযোগ করার ওই একটিই মাধ্যম, সেটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মুঠোফোনের মধ্যে ধরে রাখা বিশ্বের মানুষজনের কাছে কল্পনার ও বাইরে।
অথচ, আমরা যখন বড়ো হচ্ছিলাম, তখন খবরের কাগজ, আর বেতার মানে রেডিও ছাড়া বিশ্বকে কাছে পাওয়ার উপায় ছিলো না।
কাজেই আমাদের সেই পৃথিবী রেডিওময়।
সকালে, “আকাশবাণী কলকাতা ” শুনে ঘুমভাঙা। বাবা খবর শুনছেন দাড়ি কাটতে কাটতে। সময় বাঁধা। খবরের মধ্যে দাড়ি কেটে চানে না গেলে অফিসে লেট হয়ে যাবেন।
কোনো দিন একটু আগে ঘুম ভাঙলে চোখ বুজে শুনি বাবাকে চা দিতে দিতে মায়ের কথাবার্তা, কিন্তু পিছনে সুগম সঙ্গীতের সুর।
“ তোমার সুরে ভাঙ্গলো ঘুম, তোমার আলোয় ভরলো আঁখি…
আড়াল থেকে সরে এসে কিছু এবার বলবে নাকি…”, বা “ এ কোন সকাল… ”, অথবা সাগর সেনের মিষ্টি গলায় “ এ জীবন সূর্যের স্বপ্ন… ”।
মোটমাট, ভারি সুরেলা সুর শুনবার চেনবার ভোর মানেই বেতার অর্থাৎ রেডিও।
পুপুর বছর পাঁচেক, মানে উনিশশো সত্তরের আসেপাশে অবধি বড়ো খয়েরী কাঠের বাক্স, তাতে সাদা জাল দেয়া সামনে, আর ঘোরানোর গোল গোল নব, এই ছিলো রেডিও। সেই যে মার্ফি বেবির ছবি দেয়া রেডিও, যে নাম ব্যবহার করে পরে জনপ্রিয় সিনেমা হল, মার্ফি, সেই বিজ্ঞাপন আমরাই দেখে বড়ো হয়েছি তো।
সে বাক্স পালটে ফিলিপ্সের স্টিলের ফুটোফুটো ছোট্ট বাক্স ট্রানজিস্টার এলো যখন, সবাই কী উত্তেজিত!!
সেই বেতারের সব খবর কলকাতার শিক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছে যেত, বেতার জগত পত্রিকার মাধ্যমে।
তার এক বছরের শারদীয়া সংখ্যায় এক সাথে ছাপা হয়েছিল নজরুলের এই কবিতা, “ আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মুর্তি আড়াল
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তিচাঁড়াল..”,এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতা “আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে …”।
সেটা বোধ করি উনিশশো সত্তর । আমি তিন বছর। সবে বাংলা পড়তে শিখেছি।
এত নাড়া দিয়েছিল লেখাটি, বারবার পড়ে মুখস্থ করে ফেলেছিলাম এই লম্বা লেখাদুটোই ।
মা বাবার দ্বারস্থ হতাম শক্ত শব্দের মানে বুঝতে। তখন স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প জমা হত আমার মনে। পরে পত্রিকাটি তুলে রেখেছিলাম শুধু এই কবিতাদুটি আবার আবার পড়ব বলে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।