ক্যাফে গল্পে সুমন

গোপন সত্য
শংকর চৌধুরী কলকাতায় নিজের বাড়িতে ফিরেছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর পর। যখন কলকাতা ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন তখন তিনি ছিলেন বছর কুড়ির এক যুবক আর ফিরছেন সওর বয়স্ক এক বৃদ্ধ হিসাবে। তার মতো এই শহরের চেহারাও অনেক বদলেছে, বদলেছে এই শহরের চরিত্রও। কিন্তু তাও কলকাতায় এসে একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছেন তিনি। তার ঠাকুরদার তৈরি পুরনো বাড়িতে উঠেছেন তিনি, শংকর চৌধুরীর বাবা ও শেষ বয়সে তার কাছে বিলেতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের ভার একজন কেয়ারটেকারের ওপরে ন্যস্ত ছিল। তারাও এখন আশির উপর বয়স। তবে ভদ্রলোক এখনও বয়স অনুপাতে সুস্থই আছেন, তবে খুব বেশি চলাফেরা করতে পারেন না। শংকরবাবু দেশে ফেরার মাসখানেক আগে সেই কেয়ারটেকার পুষ্পলদাকেই জানিয়েছিলেন যে তিনি কলকাতায় ফিরবেন। সেই অনুযায়ী পুস্পলদাই সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। রান্নার লোক, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার ঠিক ঝি, গাড়িসহ একজন ড্রাইভার এমনকি একজন সেক্রেটারি পর্যন্ত। কলকাতায় ফিরে তাই শংকরবাবুর কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না।
সেক্রেটারি সৌমিক লোকটি বেশ করিতকর্মা এবং তৎপর। অবশ্য শংকরবাবুর কাছে সে ছেলে হলেও তার বয়স অবশ্য পঞ্চাশের এর ওপর। শংকরবাবুর কলকাতা আসার পর থেকে তার দৈনন্দিন এপয়েন্টমেন্ট ও অন্যান্য কাজ দিব্যি সামলে দিচ্ছি ছেলেটি। এমনকি দুদিন আলাদা আলাদা দুজন ডাক্তারের কাছে এপয়েন্টমেন্ট করার ছিল, সেটা খুব সহজেই করে ছিল সৌমিক। শংকরবাবুর শরীর একদমই ভালো নেই, তিনি এজন্যে নার্সের প্রয়োজনের কথা বলতেই সৌমিক এক নার্স সেন্টারের সঙ্গে কথা বলে একজন মধ্যবয়সী নার্সের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
দুপুরবেলা খাওয়ার পর নার্স এসে ওষুধ দিয়ে গেছে। শংকরবাবু বিছানায় গিয়ে শুলেন একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য। মাথাটা যেন একটু ভার লাগছে। শরীরটা হঠাৎই ভীষণ খারাপ লাগছে শুরু করল শঙ্করবাবুর। তিনি গলা একটু চড়িয়ে ডেকে উঠলেন,’সৌমিক, সৌমিক, একটু এঘরে এসো প্লিজ’। শংকর বাবুর গলার আওয়াজ শুনে দ্রুত ঘরে ঢুকল সৌমিক আর অঙ্কিতা।
শংকরবাবুর তখন বুকে বেশ জোরে ব্যথা উঠেছে, মাথাটাও প্রচন্ড ভারী লাগছে। প্রচন্ড যন্ত্রণায় মাথা যেন ফেটে পড়তে চাইছে। তিনি কোনওমতে খাবি খেয়ে বলতে পারলেন,’শরীর…খুব খারাপ… ডাক্তার ডাক্তার’।
অঙ্কিতা দ্রুত ছুটে শংকরবাবুর স্নায়ুচাপ পরীক্ষা করে বলল,’ডাক্তার আসতে গেলে দেরি হয়ে যাবে, মনে হচ্ছে সিরিয়াস এটাক হয়েছে। আপনি এম্বুলেন্স ডাকুন, এক্ষুনি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’সৌমিক দ্রুত কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকল, অ্যাম্বুলেন্স এসেও গেল খুব তাড়াতাড়ি। সৌমিক বাড়ির কাজের লোকেদের সাধারণ কিছু নির্দেশ দিয়ে অঙ্কিতাকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্করবাবুকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। এম্বুলেন্সে যখন স্ট্রেচারে করে শংকরবাবুকে তোলা হচ্ছে তখনই তিনি মাথার যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
শংকর চৌধুরীর যখন জ্ঞান ফিরলো তখন নিজেকে একটা শক্ত লোহার চেয়ারে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় বসা দেখলেন। প্রথমে তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। তারপর যখন জ্ঞান ভালোভাবে ফিরে এল তখন তার দুপুরে ওষুধ খাওয়ার পর শরীর খারাপ হওয়ার স্মৃতি মনে পড়ল। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়েছিল সেকথাও মনে পড়ল। কিন্তু হাসপাতালের জায়গায় তাকে কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। কিন্তু তিনি যে বিপদের মধ্যে রয়েছেন সেটা উপলব্ধি করতে পারলেন। যে ঘরে তাকে রাখা হয়েছে সেটা কোন গোডাউন গোছের ঘর। ঘরের দেওয়ালের ওপর দিকে শুধু একটা খোলা স্কাইলাইট দেখা যাচ্ছে। ঘরে কোনও জানলা নেই। স্কাইলাইট দিয়ে আসা ক্ষীন আলোতে ঘরের একদিকে শুধু একটা স্লাইডিং দরজার পাল্লা বন্ধ অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আসছিল শংকর চৌধুরীর। তাও তিনি যতটা সম্ভব জোরেই চেঁচিয়ে উঠলেন,”কেউ আছেন এখানে? কেউ আছেন? আমাকে এখানে এভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছে কেন?”বার কয়েক জোরে জোরে কথাগুলো বলতে বলতে বেশ একটা ক্লান্তি অনুভব করলেন শংকরবাবু। ঠিক তখনই স্লাইডিং ডোরের পাল্লাটা খুলে গেল আর শংকরবাবুকে অবাক করে ঘরে এসে ঢুকল সৌমিক আর অঙ্কিতা। তাদের দেখে অবাক হয়ে শংকরবাবু বললেন,”তোমরা? তোমরা আমাকে এখানে এনেছ? আমাকে এখানে বেঁধে রেখেছ কেন? কি চাও তোমরা?”
সৌমিক বলে উঠল,’আপনার সব প্রশ্নের উত্তর মাস্টারমশাই দেবেন।’
শংকরবাবু জানতে চাইলেন,’মাস্টারমশাই? কে তোমাদের মাস্টারমশাই? আমার কাছে তিনি কি চান?’
অঙ্কিতা বলল,”সে কথা উনি নিজ মুখেই বলবেন, পঞ্চাশ বছর আগের একটা অসমাপ্ত হিসেব আপনাকে চুকাতে হবে।”ওই যে মাস্টারমশাই এসে গেছে। অঙ্কিতার কথামতো শংকরবাবুর নজর গেল খোলা পাল্লার দরজার দিকে, একজন বয়স্ক লোক সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে এলেন। ভদ্রলোকের একটা পায়ে সমস্যা রয়েছে। স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে ঢুকে স্লাইডিং দরজার পাল্লাটা আবার লাগিয়ে দিলেন তিনি। তারপর স্ক্র্যাচের সাহায্যে এগিয়ে এসে শংকরবাবুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। পাকা দাড়ি গোঁফে ভর্তি মুখ আর পুরু কালো ফ্রেমের চশমায় ঢাকা চোখ দেখে প্রথমে ভদ্রলোকে চিনতে পারলে না শংকরবাবু। তারপর একটু সময় ধরে চারদিকে ঠায় চেয়ে থাকতেই তিনি চিনে ফেললেন ভদ্রলোককে। চোখ বড় বড় করে শংকরবাবু বলে উঠলেন,”বিশ্ব… বিশ্বজিৎ তুমি? তুমি এদের মাস্টারমশাই? তুমি আমাকে এখানে তুলে আনিয়েছ?”
বিশ্বজিৎবাবু একটা বাঁকা হাসি হাসলেন,”আমি শুধু এদেরই নই, আরও অনেকের কাছেই মাস্টারমশাই। শত অত্যাচারও আমার মনোবল ভাঙতে পারেনি। কিন্তু আমি এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি কেন জানো? শুধু তোমার জন্য;পঞ্চাশ বছর আগে তোমার বিশ্বাসঘাতকতা আমি এখনও ভুলতে পারিনি শংকর। এখনও কুনালদা আর সুভাষদার মুখ আমাকে ঘুমোতে দেয় না। ওরা এখনও আমার স্বপ্নে এসে জানতে চায়, কোথায়?কোথায় আমাদের হত্যাকারী? কোথায় সেই বিপ্লবের শত্রু শংকর? কোথায় সে বিশ্বাসঘাতক? আর যখনই এই দুজনকে এই সৌমিক আর অঙ্কিতাকে আমি দেখি তখনই আমার মনে সংকল্পের জন্ম হয়, এদেরকে এদের বাবার স্নেহ-ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে যে তাকে কবে শাস্তি দেবো, সেই জন্যেই আমি আজও বেঁচে আছি। তোমার বাড়ির কেয়ারটেকার পুষ্পল দার সঙ্গে বহু আগেই ভাব জমিয়ে রেখেছিলাম আমি। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম কবে তুমি দেশে ফিরবে। সেই অপেক্ষা আজ পঞ্চাশ বছর পরে সফল হল। আজ তোমাকে তোমার বিশ্বাসঘাতকতার সব হিসেব দিতে হবে শংকর।”
শংকরবাবু কাতর কণ্ঠে বললেন,”মানে সৌমিক আর অঙ্কিতা, ওরা… ওরা কুনালদা আর সুভাষদার ছেলেমেয়ে? ওরে সেই ছোট বয়সে দেখেছিলাম। এখন তো ওরা নিজেরাই বয়স্ক পরিণত হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্ব, তুমি ভুল করছ, আ…আমি বিশ্বাসঘাতক নই, আমি কাউকে ধোকা দিতে চাইনি। বিশ্বাস কর, তুমি বিশ্বাস কর আমি খুন করিনি। আমি শুধু পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম”।
‘চোপ’, ধমকে উঠলেন বিশ্বজিৎ, তারপর বললেন,”আমি নিজের চোখকে কি করে অবিশ্বাস করব শংকর। আমি নিজে দেখেছি কুনালদার মৃতদেহ সামনে পড়ে রয়েছে। তোমার হাতের রিভলবার তাগ করা রয়েছে সুভাষদার দিকে। সেই দিনটাকে আমি কি করে ভুলব। সুভাষদা আমাকে চিঠি পাঠিয়ে ডেকে বলেছিলেন যে আমাদের মধ্যে যে বিশ্বাসঘাতক যে বিপ্লবের শত্রু তার পরিচয় ফাঁস করে দেবেন। কিন্তু তখন তো আমি জানতাম না সেই বিশ্বাসঘাতক তুমি। তুমি সুভাষদাকে গুলি করার আগেই কেউ আমার মাথায় পেছন থেকে বাড়ি মারে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। যখন জ্ঞান ফেরে দেখি আমি হাজতে, সেসময় আমাকে প্রচুর পুলিশি অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু আমার মুখ খোলাতে পারেনি। আমার এই ডান পায়ের হাড় এমনভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে যে আমি কোনওদিন সোঁজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি,কিন্তু তোমার মত লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়নি বিশ্বাসঘাতক,তোমাকে আজ তোমার পাপের শাস্তি পেতেই হবে।”
এবার শংকরবাবুও গলা চাড়ালেন, হ্যাঁ হ্যাঁ লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। শুধুমাত্র সেটাই আমার একমাত্র অপরাধ। কিন্তু আমি বিশ্বাসঘাতক ছিলাম না। আর কাউকেও আমি খুন করিনি। পার্টির সাথে, বিপ্লবের সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সে কুনালদা, আমি নই। এবার গর্জে উঠল সৌমিক,’একদম বাজে কথা বলবেন না, আপনার বিশ্বাসঘাতকতার দায় আমার বাবার ঘাড়ে চাপাবেন না। অপরাধী আপনি, আমার বাবা নন।’
শঙ্করবাবু বললেন,’সবটা তুমি জানো না সৌমিক। কুনালদা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন, আমাদের পার্টির সব গোপন তথ্য কুনালদাই পুলিশের হাতে তুলে দেন। পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু কুনালদাই জানতেন সুভাষদা তাকে ছাড়বে না। কুনালদা পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে সোজা আসেন আমার কাছে। আমাকে তিনি বলেন ওনার পরিবারের কথা, তোমার কথা। তিনি বলেন তোমার মুখ চেয়ে তার একমাত্র ছেলের মুখ চেয়ে যেন তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আমার বাড়িতেই আমি আশ্রয় দিয়েছিলাম কুনালদাকে। সে কথা জানতে পেরে সুদীপকে দিয়ে গৌরব দা আমাকে খবর পাঠান। আমি যেন কুনালদাকে নিয়ে নীলমাধবের গোডাউনে ওনার সাথে দেখা করি। কুনালদা ভয় পেয়েছিল কিন্তু আমি তাকে অভয় দিয়ে সেখানে নিয়ে যাই। আমি ভেবেছিলাম গৌরবদা কুনালদাকে বকেঝকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু ওখানে পৌঁছতেই গৌরবদা সরাসরি গুলি করে দিলেন কুনালদাকে লক্ষ্য করে। আমি হঠাৎই রেগে গিয়ে গৌরবদার হাত থেকে তার রিভলবার ছিনিয়ে নিয়েছিলাম, তখনই গৌরবদার আমাকে বলেন যে বিপ্লবের সামনে কোনও সম্পর্ক টিকতে পারে না, বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনে প্রিয়জনকেও ত্যাগ করতে হয়। গৌরবদাই বলেন যে তুমিও এসে পড়বে ওই জায়গায়। কিন্তু আমি যে কথা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম কুনালদাকে,যে তাকে মরতে দেব না। রাগে গৌরবদার দিকে রিভলবার ত্যাগ করে দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু গুলি আমি চালাইনি আর ঠিক তখনই বিশ্ব তোমার আর্তনাদ আমাদের কানে যায়। আমরা চমকে তাকিয়ে দেখি পুলিশ এসে গেছে সেখানে। আর পুলিশ দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমার কাকা স্বয়ং। একজন কনস্টেবল পেছন থেকে তোমার মাথায় বন্দুকের বাঁট দিয়ে মেরে তোমাকে অজ্ঞান করে দিয়েছে। আমি কিছু বোঝার আগেই গৌরবদা আমার হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিয়ে পুলিশের দিকে গুলি চালাতে যায়। কিন্তু তার আগেই পুলিশ বাহিনীর বন্দুক গুলো গর্জে উঠেছে। আমার সামনে গৌরবদার দেহটা ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে যায়। কাকা আমাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। আমি অস্বীকার করলে তিনি বলেন যে অজ্ঞান হয়ে থাকা তোমাকেও অজ্ঞান অবস্থাতেই মেরে এনকাউন্টার দেখিয়ে দেবেন তিনি। আমার সামনে আর কোনও পথ ছিল না। আমি পার্টির জন্য, বিপ্লবের জন্য তোমাকে বলি দিতে পারিনি, আমি আত্মসমর্পণ করি। আমার বাবা সব সময় প্রগতিশীল কথাবার্তা বললেও তার ছেলে ক্যারিয়ার ফেলে রেখে রাজনীতি করুক সেটা চাননি। কুনালদাকে যখন বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলাম তখনই সব জেনে যান বাবা। আমি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে সেটা হেলায় হারিয়ে রাজনীতি করি সেটা তিনি চাননি। তাই যে পুলিশ ভাইয়ের সমালোচনা তিনি একসময় করতেন তাকেই আমাদের সবকথা জানিয়ে দেন। কুনালদা আগেই আমাদের সব নামধাম প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। তাই পুলিশের অসুবিধা হয়নি আমাদের পিছু নিয়ে ওই গোডাউনে পৌঁছতে। আমি সারেন্ডার করার পর কাকাই আমার নামে কেস হওয়া থেকে আটকান। আমাকে ভয় দেখানো হয় যে আমি যদি তাদের কথা না শুনি তাহলে তোমাকে ওরা…আমাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।হ্যাঁ, আমি লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাই। আর দেশে ফিরিনি।বাবাও পরে অসুস্থ হয়ে লন্ডনে আমার কাছে চলে আসেন আর সেখানেই মারা যান। আমি জানতাম তোমরা আমাকে ভুল বুঝবে। আমার মধ্যে বেঁচে থাকার বাসনা তীব্র হয়ে ওঠে আমি তাই আর দেশে ফিরিনি। কিন্তু পুষ্পলদা আর তার ভাই সৌণকের মাধ্যমে আমি এখানকার সব খবর রেখেছি।”
‘মিথ্যে মিথ্যে মিথ্যে,সব মিথ্যে বলছো তুমি,নিজেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যের আশ্রয় নিচ্ছ তুমি শংকর’। বলে উঠলেন বিশ্বজিৎ
অঙ্কিতা বলল,’আমার বাবাকে আপনি হৃদয়হীন মানুষ সাজাচ্ছেন, নিজের অপরাধ আমাদের বাবাদের মাথায় চাপিয়ে দিচ্ছেন?’
শংকরবাবু বলে উঠলেন,’না অঙ্কিতা না।বিশ্ব তুমি এখনও আমাকে ভুল বুঝছ। উকিল সঞ্জয় ব্যানার্জি নিজে থেকেই কেন তোমার কেস নিয়ে তোমাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনলেন বিশ্বজিৎ, এই প্রশ্ন তোমার মাথায় কখনও আসেনি? অঙ্কিতা তোমার মায়ের কাছে সৌণক বলে একজন লোক নিয়মিত মাসেহারা নিয়ে আসত আর তোমার মাকে সে বলত পার্টির তরফ থেকে পাঠানো হয়েছে, বল আমি কি ঠিক বলছি না? আর সৌমিক তোমার অনাথ আশ্রমের খরচ, তোমার নামে হঠাৎ করে শুরু হয়ে যাওয়া স্কলারশিপের টাকা যা তুমি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগে অবধি নিয়মিত পেয়ে গেছো,সেগুলো নিশ্চয়ই মিথ্যে নয়।’
বিশ্বজিৎ অবাক হয়ে বললেন,’তার মানে তুমি বলতে চাইছ,এসব কাজ তুমি করছ?তুমি?’শংকর বললেন,’আমি দেশ ছেড়ে যেতে চাইনি, পরিস্থিতি আমাকে পালাতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু তারপর আর ফিরে আসতে পারেনি। বাঁচার আকাঙ্ক্ষা জন্মে গিয়েছিল। হয়তো সত্যিই আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু তোমাদের আমাকে ভুল বোঝার ভয় থেকেই আমি আর ফিরিনি। সৌণক আর পুষ্পলদাকে দিয়ে আমি যতটা পেরেছি তোমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছি।অর্থ আমি কম রোজগার করিনি, কিন্তু বিশ্বাস কর এক মুহূর্তের জন্যেও এই পঞ্চাশ বছরে আমি শান্তি পাইনি। আর তোমাদের সামনে সব কথা বলতে পেরে নিজেকে অনেক হালকা অনুভব করছি। এখন তোমরা যদি আমাকে শাস্তি দিতে চাও আমি মাথা পেতে গ্রহণ করব। আমার আর কোনও ভয় নেই।সৌমিক বলল,’আপনি হঠাৎ এত অকুতোভয় হয়ে উঠলেন যে?এত বছর বাদে দেশে ফিরে এলেন কেন?
শংকরবাবু হাল্কা হেসে বললেন,’এখানে আসার পর তোমাকে দিয়ে দুজন ডাক্তারের কাছে এপয়েন্টমেন্ট করালাম, তাও বুঝতে পারোনি?বিশ্বজিৎ,সৌমিক আর অঙ্কিতা একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে মুখচাওয়াচাওয়ি করলেন।
শংকরবাবু আবার বলতে শুরু করলেন,’মৃত্যুই আমাকে অকুতভয় করেছে। সব গোপন সত্য তোমাদের সামনে প্রকাশ করতে সাহায্য করেছে। আমি এখন ক্যান্সারের পেশেন্ট। ব্লাড ক্যান্সার, ফাইনাল স্টেজ। আমার কাছে আর বেশি সময় নেই। ইংল্যান্ড থেকে মাঝে আমেরিকাতেও গিয়েছিলাম। সেইখানকার সেরা ক্যান্সার স্পেশালিস্টকে দেখিয়েছি। তিনি বললেন যে আর কিছুটা আগেও যদি ধরা পড়তো তাহলে কিছু করা যেত, কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার হাতে বড়জোর টেনেটুনে আর একটা বছর আছে।এখানে এসে তাই ক্যান্সার স্পেশালিস্টদের সাথে কথা বলে নিলাম। সামনের মাস থেকে আমার রক্ত পরিশুদ্ধকরন শুরু হবে। যখন জানতেই পারলাম যে এক বছরের বেশি সময় আমার হাতে নেই, তখন মনের সব ভয় ঘুচে গেল। আমার জন্মভূমিতেই আমি মরতে চাই। তাই আমার প্রিয় শহরে ফিরে এলাম। যে শহরে সত্তরের শুরুতে দাপিয়ে বেরিয়েছি, যে শহরকে ভালবেসেছি,যে শহরে ভালোমন্দ সব স্মৃতি ফিরে এসেছি, সেই শহরকে জড়িয়ে ধরে মরব বলেই ফিরে এসেছি। তাই আজ আমি ভয় মুক্ত,চিন্তা মুক্ত, আজ আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোবো’।
সৌমিক এসে বাঁধন খুলে দিল শঙ্করবাবুর। তার আর অঙ্কিতার দুজনেরই চোখে জল। শংকরবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, বগলের স্ক্র্যাচ ফেলে দুহাতে নিজেকে শঙ্করের কাছে সঁপে দিলেন বিশ্বজিৎ।পঞ্চাশ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দুই বন্ধু একে অপরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলেন।