সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৪১)

রেকারিং ডেসিমাল

বাবা মায়ের সঙ্গে শ্বশুর বাড়ির প্রীতির সম্পর্ক থাকলে মেয়েদের একটু আরাম হয়। তার পরিমাপটা বিবাহিত জীবন শুরু না হলে টের পাওয়া যায় না।
এ বাড়িতে মাথার ওপরে থাকা মানুষ দু জনের সাথে প্রথম থেকেই বাবা মার স্নেহের এবং পারস্পরিক সম্মানের একটা আদানপ্রদান নতুন বউকে অনেক অন্য রুক্ষতার থেকে আজও আরামের মলম লাগিয়ে দেয়।
দাদু তার বাবা আসলেই কাঁধে হাত দিয়ে বলেন, বলাই বুঝবে, এই বাড়ি করতে আমার কি ধকলটাই না গেছে।
বাড়ি দাদুর প্রাণ। বহু কষ্ট করে একে বানিয়েছেন।
নাতবউয়ের বাবাও যে চাকরি জীবনের শেষের দিকে এসে নিজেদের বাড়ি বানাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, সেটার সহমর্মি হন দাদু।
আর মাকে কর্তা গিন্নি দুজনেই গলে গিয়ে আদর করেন।
দিদা বাবা মা চলে গেলে নাতবউকে বলেন, কি জানো, স্বভাবে ত তোমার মায়ে লক্ষ্মী, সেয়াই শুধু না, তার ত নাম দীপালি, তাই আরও বেশি মন কাড়ে।
আমার মেজ মেয়ের নাম…
কত দিন তারে দেখি না।
নতুন বউয়ের আবছা মনে পড়ে, তার বৌভাতের দিন বিকেলে, সামনের বাড়ির দিদি এসে সাজাচ্ছিল যখন, দিদা কাঁদছিলেন নিজের ঘরে।
সবাই নিজেদের মধ্যে নীচু গলায় বলছিল, কেউ মারা গেছেন। আজ উৎসবের বাড়িতে কেউ এটা নিয়ে আলোচনা করো না।
একেবারে কুচি ক্লাস সিক্সের ননদিনী খালি ফিসফিস করে বৌমণিকে বলে গিয়েছিল, খুব কালো তো, তাই কয়লা পিসেমশায় বলে সবাই। জানো, ওদের বাড়িতে না, ভুত আছে।
এই রোমাঞ্চকর খবর নিয়ে বেশি ভাবার আগেই, চোখ বোজ, মুখ তোল, এই কেউ চুলের কাঁটাগুলো পাস কর… মানে কনের সাজের পুরো হইহই শুরু হয়ে গেছিল।
সে রীতিমতো যুদ্ধ।
তাতেই ধামাচাপা পড়ে গেছিল সেই অনেক দূরের না দেখা মানুষদের গল্প।
এদের কারোর সঙ্গেই দেখা হয়নি নতুন বউয়ের এখনো।
পরে বাড়িতে সবার মুখে মুখে শোনা টুকরো টুকরো ছবি।
মস্ত জমিদার বংশের মানুষ মেজপিসেরা।
বিশাল বাড়ি এখন অর্থাভাবে ভগ্নস্তূপ হয়ে আছে।
জুটমিল আছে, কিন্তু ভালো চলে না।
মফস্বলে বাস।
তাই হয়ত হীনমন্যতার দেয়াল ক্রমশ অদেখা করে রেখেছে এই আত্মীয়দের।
সব ছাপিয়ে বউয়ের মনে থাকে, এই পিসিমার তার মায়ের নামেই নাম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।