সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৪১)

পুপুর ডায়েরি
পাপুদের ছাদে নতুন করে সিমেন্ট করা হচ্ছিল। পাপু আর পুপু তখন সাত কি আট বছর ।
একটু কাঁচা সিমেন্টের মধ্যে কিতকিত খেলার কোট কাটলাম ভাঙা ইঁটের টুকরো দিয়ে । সিমেন্ট জমে যেতে সেটা শক্ত হয়ে রয়ে গেলো । এখনও আছে সেই কোট কাটা ।
ছুটিতে মামা বাড়ীতে গিয়ে শিখে এসেছিলাম খেলাটা । যাদবপুরে , ওখানে এত খেলার চান্স পেতাম না ।
অনেক খেলুড়ে ।আর অনেক পাকা খেলুড়ে সব ।
আমি ত চার দেয়ালের মধ্যে নড়াচড়া করে থাকা চুপচাপ মানুষ , এইসব পাকা খেলুড়েদের মধ্যে পাত্তা পেতাম না খুব একটা। সবাইকে খেলতে দেখেই আনন্দ হত ।
পর পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে খুকিরা। বিকেল হলেই পরিষ্কার করা মুখ , ঘাড়ে মা বা দিদিদের মাখানো সাদা পাউডার , দু দিকে দুটো শিঙের মত বা একসাথে পেঁচিয়ে দেয়া বেড়া বিনুনি, তাতে রঙিন ফিতের বো বাঁধা। কত খেলুড়ে।
কী উৎসাহের চীৎকার আর খেলার হুল্লোড় !
আমার নবনালন্দা ইস্কুলের গ্র্যান্ড পিয়ানোর সুরে ভাসা অ্যাসেম্বলিতে প্রেয়ার আর ইংরেজি রাইমস , আর নিয়ম করে ঘড়ি ধরে ফল আর ছানা , চিজ কিউব আর জ্যাম টোস্টের নিয়ম থেকে কত আলাদা ; একেবারে অন্য গ্রহ ।
দারুন লাগত , রীতিমত অ্যাডভেঞ্চার ।
এখন মনে হয় , সব বাচ্চাদেরই এরকম একটা আউটলেট থাকা উচিৎ যেখানে সে গ্লোবাল সিটিজেন নয় , কসমোপলিটান নাগরিক নয় । সে নেহাত বাঙালি বাচ্চা । যার কায়দা করে অ্যাকসেন্ট মেনে কথা বলতে হবে না । ক্রকারি ব্যবহার মেনে এসি রেসটোরান্ট বা শপিং মলে ইন্টারন্যাশনাল চিল্ড্রেন্স হলিডে কাটাতে হবে না । যে কাদামাটি , গরম কালের আম পাতা, টগর ফুল , ঘাসের গন্ধ শুঁকে দুপুর কাটাবে । আর গরমের বিকেলে হইহই করে কুমিরডাঙা , ধাপ্পা , আইস্পাই, খেলবে খুব চেঁচামিচি করে ।
পুপু খুবই লাকি , তাই এমন একটা সোনার ছোটো বেলা পেয়েছিলো ।
বড়দের নানান অ্যাডাল্ট মার্কা ছায়া , সংসারের মালিন্য , বা কোনো “এ” মার্কা গন্ধ কোনো মতেই ঢুকে পড়তে পারেনি মনের কোথাও ।
রোদ , আকাশ , মেঘ , বৃষ্টি , সবই উজ্জ্বল ছিলো । আর ভীষণ ভীষণ পরিচ্ছন্ন।