সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সায়ন (পর্ব – ৫)

অমৃতায়ণ

আমি অবাক হয়ে অমৃতার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছু হাসি থাকে এই মরপৃথিবীর মধ্যে যার শব্দে আলোর বিন্দুগুলো আস্তে আস্তে বুজে আসে। জানলার ঠিক পাশে – দাঁড়িয়ে আছি , দুই জানলার- মাঝখানে -একটা টেবিল, কেন জানি না ওখানে সব সময় মোটা তুলির দাগের অন্ধকার শুকায় না – ঠিক সেইখানে এখন অমৃতা – আমি শুধু ওর দাঁতের উপরের আংশটা দেখতে পাচ্ছি, সাদা চোখের মণির থেকে হাতের উপর আলো এসে পড়ছে – বাকিটা ওই হাসি …….
মুখটা ফিরিয়ে নিলাম , দেখবো কি আর একবার ওকে!
বাইরে কলা গাছের উপর কয়েকটা কাক বসে ছিল, হঠাৎ একটা নির্জনতার বিরুদ্ধে উড়ে গেল। তবে, শুধু একটা কাক উড়তে যাবে এমন সময় আমার চোখের রেটিনা থেকে ছিটকে যাওয়া প্রতিফলিত রেখাদাগ আস্তে আস্তে কাকটাকে যেন আটকে দিচ্ছে একটা আঠালো পথের টানে, এখন জানলা পেরিয়ে পিছনের উঠোন তার হহহহহঠাৎ নেমে যাওয়া গভীর ডোবার খাদের ধারে কলাগাছের পাতার উপর কাকের চোখের মণির কাছে গিয়ে থামলো সেই আলোপথ :
– কেন উড়ে গেলো ওরা?
কাঁচে কাটা স্বচ্ছ কালো দাগ, একটা শূন্য বৃত্ত, তার ভিতরে শুধু ডোবাচাপা অন্ধকার। চোখের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে বলহীন ডানা আর মনের
– ভয়
– ভয়! কিসের ভয়?
– ওই যে ……. ওর তীব্র ঠোঁট নির্দেশ করছে জানলার দিকে , ঠিক তার পাশেই অমৃতা !
আমার বুকের মধ্যে জরিয়ে হাত রাখলো অমৃতা । সবটা আবার : আলোরেখা ফিরে এলো- চোখের সামনে এসে গেলো জানলার রেলিং- হাতে লোহার স্পর্শ – কিন্তু, শুধু কলাপাতা একা একা দুলছে, দুলছে, কারোর চলে যাওয়ার সময় রেখে যাওয়া স্মৃতির মতো …দুলছে ……. চারদিক নিঝুম …… আকাশ খালি …. এখন অমৃতার বিরাট খোঁপার সুগন্ধ বুক জুরে, স্নায়ুতলদেশে।
– কখন এলে! এই তো …….
– বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলে বউকে দেখবে আর কখন !
গালটা ধরে বললাম – কে হাসলো হাসিটা এখন? হাসিতে এমন শব্দ …… আচ্ছা তুমি কি আজকাল এইভাবেই হাসো?
– আমি আবার কিভাবে হাসলাম! অমৃতার মুখে ফিরে এসেছে বেলা এগারোটার আলো।
“আরে না না, এই মুখটাকে তো আমি চিনি” মস্তিষ্কের মধ্যে এই শব্দগুলো এদিক করছে, কিন্তু যা মুখে এলো – “তোমার হাসিটা শুনছিলাম গো!”
অমৃতা চোখ আরও দৃঢ় করে বললো – তাহলে কি এই চিঠি থেকে ……
একবার শুধু চোখাচোখি হল আমাদের। চোখের স্পর্শ হলো আমাদের কিন্তু প্রশ্ন? প্রশ্নটা – মনের মধ্যে থেকে একটা টানেলের ভিতর দিয়ে যাতায়াত করতে শুরু করে দিলো।
চিঠিটা নিয়ে আরাম করে নিয়ে বসলাম বিছানায়, অমৃতা বিছানার ধারে আমার গলা জরিয়ে ধরে একমনে দেখছে চিঠিটার ভাঁজ খোলা।
– বাবা রে, এটা চিঠি কি করে বুঝলে গো ! চিঠির বাইরে তো ঠিকানা লেখা থাকে , তার বদলে একটা সাংকেতিক আখ্যান লেখা থাকবে কি করে বুঝবো ।
প্রথমদিন ঘরটা দেখতে এসে কাগজটা আমি ফেলে রেখেই ঘর দেখতে ঢুকে গেছিলাম, কিন্তু কখন এক ফাঁকে যেন অমৃতা কাগজটা তুলে যত্ন করে রেখে দিয়েছে আবার সেটা যে একটা চিঠি তাও আবিষ্কার করে রেখেছে।
– “কানে কানে বললো , – আমি কি চিঠিটা পড়ার সময় থাকতে পারি, যদি কোনও তোমার অপার্থিব সুন্দরী হয়, তার ভাষার সামনে কি আমার দাঁড়ানো উচিত বলো!” উষ্ণ নিঃশ্বাসগুলো আমার কান দিয়ে নেমে আসছে শরীরের কোণায় কোণায়!
– ও আচ্ছা তাই বুঝি! জরিয়ে ধরে কাছে টেনে নিলাম , তুমি একটা কাগজকে চিঠি বলে আমার ভাবনাটাকে নিয়ে এদিক ওদিক করছো তাই তো সুন্দরী!
– আজ্ঞে না, দাও আমাকে।
বলে অমৃতা চিঠিটা নিজের হাতে নিয়ে , একদম ধার থেকে একটা টিযা়র পার্ট ছিল ওটা খুলতে শুরু করলো, একি !
একদম সাদা একটা পেজ, আমি তো দেখতেই পেলাম না। তাহলে কি এই যে চিঠিটার গা’যে় লেখাছিল – নারীর চোখে কাঁচ থাকে, সেই আয়নায় সবটা দেখা যায়…….. অমৃতার চোখেও কি –
– কি দেখছো , এই নাও তোমার চিঠি
দেখলাম একটাই পাতা ভাঁজ করে রাখা চিঠি :
” পুরনো বন্ধু, শত্রু, আর সাদা পাতার কথা মনে পড়ে কখনও কখনও! আপনার যে মনে পড়বে এটা তো স্বাভাবিক। কবরের নীচে থাকা মানুষ আর বিছানায় ঘুম ভাঙে যার তাদের জীবনের ঋতু বদলের ছবি কে আঁকে জানেন? খুঁজছি খুব … যদি হঠাৎ চলে আসি? অবাক হবেন না কিন্তু!
– ইতি,
সুলগ্না “
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।