সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৪৪)

পুপুর ডায়েরি

ইস্কুল থেকে এক সাথে মেডিক্যাল কলেজ অবধি পড়াশোনা করা বন্ধু কাল ফেবুতে লিখেছিল, তার উজ্জ্বল বিদূষী দিদার কথা, নারী দিবস উপলক্ষে। তিনি ফরিদপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন।
তাকেই গল্প বলতে বসলাম তখন।
–—+ ফরিদপুরের মেয়েরা দধীচির অস্থি দিয়ে তৈরী হয়। আমার মাকে দেখেছিস তো? তিনি ও ফরিদপুর। ঢাকা বোর্ডের স্কলার, খালি ভর্তি হওয়া ছাড়া আর কখনো পড়াশোনার জন্য তাঁর পরিবারকে অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। কলকাতায় এসে বৃত্তি নিয়ে ডাক্তার হবেন বলে ভর্তি হয়েছিলেন। এক রাতে তাঁর বাবা মা আর বাকি ৫ ভাই বোন ভিটে ছেড়ে পালিয়ে আস্তে বাধ্য হয়েছিলেন ফরিদপুর থেকে কলকাতা। ছ মাস পরে দেড় বছরের মাস্টার্স ডিগ্রী পড়তে থাকা ভাই হস্টেলে এসে বলেছিল, আমি ইস্টার্ন রেলে অ্যাপ্লাই করছি, তুই করবি? নইলে বাবার একার সামান্য মাইনেতে হবে না । যত দিনে তোর পড়া শেষ হবে দিদি, কেউ আর বেঁচে থাকবে না রে। মা, ছোটো ভাইকে স্যানিটোরিয়ামে ভর্তি করতে হল। মা আর মামা, লুকিয়ে ফেয়ারলি প্লেসে গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি নিয়েছিলেন। অ্যাপ্রেনটিস থাকতে থাকতে বাংলায় প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হয়েছিলেন দু জনে। রেলের শর্ত ছিল সেটা। ভাই বোনদের পড়াশোনা করে, বিয়ে দিয়ে তবে নিজে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়েসে। আমার টিভি দেখাও বারণ ছিলো যতক্ষণ না মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী হচ্ছি। “লাথথি” টা আমি উত্তরাধিকার সূত্রে মারতে শিখেছি রে। কারণ মায়ের জপমন্ত্র ছিলো, শুধা মানুষ হও, মাইয়া মানুষ হইও না। সেই মন্ত্রে আমার মেয়েকেও তৈরী করেছিলেন। বুঝলাম,
ওই জন্য তোকে এত ভালবাসি, ফরিদপুরি নাড়ির টান।

আমি এই দুহাজার চব্বিশ সালের আটই মার্চ, নারী দিবসে একটু বেশীই উতলা হয়ে আছি। কারণ আজ শিবরাত্রি ও বটে।
তাই আজ মায়ের কথা সারাক্ষণ আমায় ঘিরে।

মায়ের আমার অদ্ভুত সখ । রোজ দুপুরে রুগি দেখার ফাঁকে খেতে যাই । তখন এটা ওটা সারাদিনের গল্প সারি । সব শেষে বলেন , “ ওরে , নিজের যত্ন নে। বাবার শেষ কাজ সেরেছ , আমার কাজটা ও তো তোমাকেই করতে হবে ।” আমি তাড়াতাড়ি বলি , “ হ্যাঁ হ্যাঁ , ঠিক করে দেবো ।অত চিন্তা কি ? আর একটু ক’ দিন আমায় খাওয়া দাওয়া করাও…”
থামেন না । বলেন , “ শোন না , আমি রোজ শুয়ে স্বপ্ন দেখি , এক ঘর থই থই সকালের আলো ।তুই আমার বুকের ওপর শুয়ে মা গো ,মা গো করে ডাকছিস ।আর আমি চলে গেলাম।”
আসলে , বাবা চলে যেতে তো নিঃশব্দে কাজ সেরেছি । তাই বোধ হয় এই রকম দিবা স্বপ্ন ।
সে যাই হোক । চলে তো গেলেন । একে বারে হঠাৎ ই ।
শিব রাত্রির সারা রাতের সব প্রহর সেই জীবনে প্রথম বার জাগলাম , আই সি সি ইউ তে। মহাশ্বাস কে সঙ্গে নিয়ে । ডাক্তার নিজেকে কোন মিথ্যা আশা দিয়ে ভোলাতে পারে না। কোলে করে , আদর করতে করতেই প্রত্যেক মুহূর্তে মনে মনে বললাম, “ চলে যাচ্ছ ? চলে যাচ্ছ? …”
শেষে মনে হল, এত রাতে চলে যাবে ? কিন্তু না । সকালে ভোরের আলো যখন আকাশকে ছাপিয়ে দিলো , সব মন্দিরে ঘণ্টা ধ্বনিতে পূজা শেষে পারণ করলেন ব্রতীরা , তখন ই আলোর মধ্যে মিলিয়ে গেল এক জন অসাধারন সুন্দর ,জ্বলন্ত শিখার মত মানুষ ।
আমি কথা রেখেছিলাম। অনেক ডেকে ছিলাম । হাতে করে কাজ সেরেছিলাম মনুর বিধান কে গুলিয়ে দিয়ে । শেষে দুই বছর পরে গয়াধামে গেলাম গদাধরের কাছে সমস্ত শ্রাদ্ধ কর্ম মিটিয়ে আসতে ।
সে খানে ভারত সেবাশ্রম সংঘ, আমায় একজন পুরোহিত আর একটি বই দিলেন।
হিন্দু শাস্ত্রের মাধুর্য অনুভব করলাম আবারও । পুরোহিত উচ্চারন করলেন , আমি সঙ্গে বই খুলে পড়লাম সেই মন্ত্র । কত কাল আগে , কে লিখেছিল এই কবিতা তার মাকে মনে করে , কে জানে ? কিন্তু , এ সারা পৃথিবীর মা আর সন্তানের সম্পর্ককে এমন ছবির মত তুলে ধরেছে ; তাকে বুঝতে কারো অসুবিধে হয় না। সেই মন্ত্রটিই অবোধ প্রানের আকুতিতে অনুবাদ করে দিলাম এ লেখার সুরুতে ।
এ যে সারা পৃথিবীর সন্তানদের মনের কথা।
আমায় পৃথিবীতে আনার জন্য তুমি সমস্ত প্রান পেতে বসেছিলে
সমস্ত মন , সমস্ত চিন্তা দিয়ে আমাকেই চেয়েছিলে ।
মা গো ,তোমায় প্রনাম করি ।
১০ মাস আমায়ে গর্ভে বহন করার কষ্ট সহ্য করেছ
তারপর ৩২ নাড়ি ছিঁড়ে অসহ প্রসবযন্ত্রণা সয়ে আমায় জন্ম দিয়েছ ।
মা , তোমায় প্রনাম করি ।
দশ মাস আমায় গর্ভে নিয়ে ,
শীতের কষ্ট ,গ্রীষ্মের দহন সহ্য করেছ ,
মা আমার প্রনাম নাও ।
আমার অসুখ করলে দিনরাত আমার শিয়রে বসে
আমার জন্যে কষ্ট পেয়েছ ।
তোমায়ে প্রনাম করি ।
যখন কিছুই খেতে পারতাম না,
তোমার কাছেই দিবা রাত্রি খাদ্য পেয়েছি ।
মা ,তোমায় প্রনাম।
কটু ,নোংরা কত কিছু মুখে দিয়ে ফেলেছি
তুমি ব্যস্ত হয়ে পরিস্কার করেছ।
মা গো , প্রনাম করি ।
ক্ষুধায় বিহ্বল হলে অন্ন নিয়ে
দৌড়ে এসেছ,
পড়ে গেলে , ব্যথা পেলে
আমার জন্যে কষ্ট পেয়েছ,
প্রনাম করি তোমায় , মা গো ।
ভালো মন্দ খাবার এলে
নিজে না খেয়ে আমায় খাইয়েছ ।
মা, তোমায় প্রনাম করি ।
দিবা রাত্রি, তোমার ঘর বিছানা ভিজিয়ে, “পটি ” করে নোংরা করেছি,
তুমি সারা দিন পরিস্কার করেছ।
তোমায় কত প্রনাম করি।
আমার জন্যে তোমার কত কষ্ট
তাও তুমি আমায় এত এত আদর করেছ।
মা গো , সারা জীবনের সব মুহূর্তে প্রান লুটিয়ে
তোমায় প্রনাম করি।

“মা” এই একটি শব্দে পৃথিবীর কত কিছু এঁটে যায় ।এ শব্দ আন্তর্জাতিক গণ্ডির বাঁধন মানে না। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের , যে কোন দেশের শিশু প্রথমেই বলে , “ মা ”। বিভক্তি যোগ হয়ে , পরে সে শব্দ , মম , মুই, মুতার, মাম্মা ইত্যাদি হয়ে দাঁড়ায় হয়তো । কিন্তু মানবাত্মার বুকের মধ্যেখান থেকে “ম” কে কাছে ডাকার যে আকুল আর্তি , তার সুর , তাল, কম্পাংক বুঝতে , মানুষ মায়েদের তো বটেই পশু –পাখি মায়েদের ও ভুল হয় না। ছোট বেলাতেই তাই সেই কবিতাটি এত মনে ধরেছিল; “জগত জননী মা না হত যদি দোপাটি পেত কি ফোঁটা ? গোলাপ পেত কি রাঙা চেলি তার ? কদলী গরদ গোটা …” মায়ের আদর যে সমুদ্রের মত সব খোকাখুকুরাই তা টের পায় ।
নিজের ঘরের গণ্ডীতে ফিরে আসি । মা আমার দ্বিতীয়ার চন্দ্রকলার মত তন্বী ।সোনার মত রঙ ।কপালে বড় লাল টিপ , যেন সাক্ষাৎ মা দুর্গা ।ফরসা হাতে শাঁখা পলা । চওড়া লাল পাড়ের ঘোমটা , মা অফিসে গেলেও নড়ে না ।আঁচলের প্রান্তটি গায়ের ওপর দিয়ে টেনে এনে কোমরে গোঁজা । সঙ্গে একটি ধবধবে পরিপাটি ভাঁজ করা রুমাল ।
তিনি অনর্গল সংস্কৃত পড়েন, বলেন, আকাশবাণীতে সংস্কৃত খবর শোনেন । সঙ্গে অস্কার ওয়াইল্ড , জেন অষ্টেন , ক্রনিন, আগাথা ক্রিস্টি পড়েন । ইদানিং আমার সাথে ড্যান ব্রাউন পড়ে সমালোচনা চালাচ্ছিলেন । অ্যাসটারিস্ক পড়তে ভাল বাসি দুজনেই । কিন্তু বেতাল , ম্যানড্রেক নিষিদ্ধ ছিল ছোট বেলায়ে , ওতে নাকি চিন্তার খোরাক নেই , শুধুই মাথাকে হাল্কা করে দেওয়া ।
মায়ের রাজত্বে কোন খানে অপরিচ্ছন্নতা , অনিয়ম থাকার যো নেই ।আমি বকুনি খাই শুদ্ধ ভাষায় , অনিয়মানুবর্তিতা ,পল্লবগ্রাহিতা ,দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য । এক দিন বললাম , “পরীক্ষার আগে আমায় পড়াতে গিয়ে তোমার যে ছুটি ফুরিয়ে উইথাআউট পে লিভ হয়, তাকে কি বলবে ? ” হেসে বললেন , “ কেন বেতন কর্তন ছুটি ।”
পাছে ভুলে যাই, ছুটির দিনে দুপুরে ভাত খেয়ে মায়ের পাশে শুলেই পড়া ধরতেন। বাংলা মাস আর তাদের সঙ্গে যুক্ত রাশি , নক্ষত্রের নাম । সহজে মনে রাখার জন্যে একটা ছড়া ছিল “বৈশাখ মাসে পুষে ছিলাম একটি শালিক ছানা ।জ্যৈষ্ঠ মাসে গজাল তার ছোট্ট দুটি ডানা …” কখন ও বা সংস্কৃত শ্লোক , পুরাণের নানান গল্প , চরিত্র , তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হত । তখন আমি ক্লাস টু , থ্রি, ফোর । এমনি এক দুপুরেই শিখেছিলাম মার্ক্স এঙ্গেলস এর থিয়োরি , প্রলেতারিয়ত –বুর্জোয়া –পেতি বুর্জোয়া দের সংজ্ঞা ।
মা সকলের ওপরে সকলেরই মহা গুরু হন । আমার গুরু ভাগ্য একটু বেশি । এমন জ্ঞানের ব্যাপ্তি পেয়েছিলাম , যার দু এক মুঠো মাত্র তুলে নিতে পেরেছি।
খালি বেশি করে মনে রেখেছি জপের মত বলে যাওয়া সাবধান বানী , “ শুধু মানুষ হও । মেয়ে মানুষ হোয়ো না। আলো জ্বালিয়ো । শিক্ষার , চিন্তাশীলতার বাতি রিলে রেসের ব্যাটনের মত জ্বালিয়ে রাখা সামাজিক কর্তব্য । মেয়েদের সাহসী হতে শেখাও ।”
মায়ের নাম দীপালি । সেই সোনার প্রদীপের শিখাকে বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে চলেছি , আলো জ্বালাবার চেষ্টায় ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।