ক্যাফে কলামে সঙ্কর্ষণ

কাদের হাত ধ’রে তাঁর পূজা বাংলায় শুরু হ’লো, আমরা তাঁকে কীভাবে দেখতে চাই, তিনি শিশুর ন্যায় সরল নাকি বীর্যবান বিঘ্নহর্তা সে আলোচনা উহ্য থাক। জাতির তারুণ্য ক্ষণিকের তরে প্রিয় রঙিন কৈশোরে ফিরুক বরং। পর্দায় শ্রীমতি এ্যাহসাস্ চান্নার অন্যতম প্রিয় বন্ধু থেকে আপামর ভারতীয় শূন্য দশকের ‘বাল্যবন্ধু’ হ’য়ে ওঠার কৃতিত্ব কিন্তু দিতে হয় সেই তথাকথিত হিন্দী বলয়কেই, যাঁরা আজ বঙ্গীয় পরিসরে তাঁর ‘অনুপ্রবেশের’ জন্য দায়ী।

তাঁর শিরোচ্ছেদ ও ফলস্বরূপ করীমস্তক স্থাপন ‘প্লাস্টিক সার্জারির’ পরিচায়ক কিনা, সেই উত্তর জানেন কেবল বক্তা স্বয়ং। আমরা জানি যে শনিদেব তাঁর ভাগিনেয়ের ‘মামা, মামা’ সম্বোধন উপেক্ষা ক’রতে না পারায় এই বিপত্তি ঘটে। ২০১২তে নবরূপে পর্দায় অগ্নিপথের আত্মপ্রকাশ। রক্তে ঝড় তুলে দেওয়া ভক্তিগীতি ও মহারাষ্ট্রীয় আনন্দোৎসবে সেই অধিকাংশ বাঙালির প্রথম অংশগ্রহণ। যেসব ঘরে বা পাড়ায় তাঁর আরাধনা আদৌ কখনও হয়নি, সেসবেও “দেওয়া শ্রী গণেশা”।

শ্রী অমীশ ত্রিপাঠী স্বরচিত উপন্যাসে অবতীর্ণ তত্ত্ব বলে তিনি আপাদমস্তক রক্তমাংসের মানুষ, কেবল ঔষধির আধিক্যে তাঁর নাসিকার বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। কষ্টকল্পিত, তবু কিঞ্চিৎ প্রভাবিত করে অবশ্যই। গজাননই যে তাঁর পরিচিতি। তিনি ক্লান্ত হ’য়ে প’ড়লে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যসমূহের একটি রচিত হ’তোনা সম্ভবতঃ। তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন চিরকালীন, তবু সারস্বত সাধনার তিনি অন্যতম প্রতিভূ। তাঁর উপস্থিতি দিদির মতোই নিশ্চিত করে মানুষের সুখ, সমৃদ্ধি।

বিশ্বাসভেদে শাস্ত্র ব’লছে যে মানবশরীরের তথাকথিত অপবিত্র স্থান তলপেটেরও নীচে ‘মূলাধার চক্রে’ তাঁর অধিষ্ঠান। কথিত যে স্বয়ং পবিত্রতার যদি কোনো মূর্তি থেকে থাকে তা তাঁরই সদৃশ। সেক্ষেত্রে সূচীবায়গ্রস্থতাও মিথ্যা। কেবল মহাসুর, দুর্বুদ্ধি বা জ্ঞানারির দণ্ডদাতা হিসাবেই তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে যাদের স্মরণে থাকেনা যে তাঁকে নিমন্ত্রণ ক’রতে কুবেরের সম্পত্তি নিঃশেষ হ’য়ে গেছিলো, তারা পুরাণ সম্পর্কে সেভাবে অবগতই নয়। বিপরীতটিও সমান।

শ্লোকের সঠিক উচ্চারণ বা অর্থ কোনোটিই ক’রতে না জানা শৈশবের তিনি ক্রীড়াসঙ্গী, বয়ঃজ্যেষ্ঠা ভক্তের নিবেদিত প্রসাদের প্রলোভন সহ্য ক’রতে অক্ষম, তিনি স্নেহময়। সমৃদ্ধি বা সংস্কৃতি উভয়ক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ বিচরণ। এদিকে পিতামাতাকে সর্বস্ব জ্ঞান করা তিনি আদর্শ পুত্র, ২ভগ্নীর গর্ব, কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রণম্য অগ্রজ। ঐতিহাসিক পুরুষ না হ’য়েও কেবল ‘পুরুষোত্তম’ চিত্রায়িত ক’রতে শাস্ত্রকার তাঁর চরিত্রে সমস্ত সদর্থক ভাবনা উজাড় ক’রে দিয়েছেন।

শত্রুর বিরুদ্ধে গর্জনরত বিঘ্ননাশকের দেহসৌষ্ঠব যদি গৃহীত না হয় সেক্ষেত্রে তাঁর ‘পেটটি নাদা’ বলা চিন্তনে বিস্তৃতির অভাব হ’তে পারে, অপরাধ কখনওই হ’তে পারেনা। যাঁর “দর্শনমাত্রে মনোকামনা পূর্তি”, তাঁর কৃপাই মূল। ভারতীয় শাস্ত্রে গজানন ব্যতীত অন্য কারো পূজা ব্যতীত কোনো অনুষ্ঠান শুরু হওয়া অসম্ভব। তিনি হিন্দী বলয়ের প্রতিভূ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ ক’রেছেন কিনা, তার তুলনায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ যে বাঙালি জাতি কী চাইছে?

যে জাতি কৃষ্ণের রাসলীলার পরিবর্তে বাল্যলীলা শ্রবণে আবেগে উথলে ওঠে, মহাদেব যাদের কলমে ত্রিশূল বন্ধক রেখে তণ্ডুল সংগ্রহ করেন, তারা গণপতিকে গ্রহণ ক’রবেনা, তা’ও কি সম্ভব? বলপূর্বক বীররসই আমাদের চক্ষুশূল…

পেট যেমনই হোক, শত বিপদেও বাঙালি কিশোরের ‘গণেশদাদা’ আছে তো।

ধন্যবাদ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।