সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৫৪)

রেকারিং ডেসিমাল


ফ্রেঞ্চ বলা বেশ মুস্কিল। অনেক চন্দ্রবিন্দু দিয়ে বলতে হয়। ত আর দ এরই ব্যবহার বেশি। 
কিন্তু,  এক আমাদের মত পুরোনো ইংরেজ শাসনে পরাধীন থাকা কলোনিয়াল হ্যাংওভারের লোকজন ছাড়া অন্যান্য দেশে ইংরেজি চলেই না বলতে গেলে। 
সবাই তবু ফ্রেঞ্চ বললে হাসি মুখে তাকাবে। কিন্তু ইংরেজি ? 
বলা মাত্র এমন হ্যাটা করা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি দেবে,  যাকে বলে, লুকিং ডাউন দেয়ার নোজ। 

তো সে যাই হোক। কষ্ট করে শিখে, “শঁ এলিজে ” বলা অভ্যেস করলাম। ইংরেজি বানান দেখে চ্যাম্পস এলিসেস বলতে ইচ্ছে করছিল যদিও। 
সেইখানেই সোনায় মোড়া মূর্তি মাথায় নিয়ে স্তম্ভেরা দাঁড়িয়ে। নাকি বিজয়ীদের আনন্দ। 
তা সেই ঝকঝকে জায়গায় পৌঁছাতে হয় “প্লাসে দে লা কংকর্দ ” নামের পার্কের পাশ ধরে। বয়ে চলে ব্রিজের নিচে সেইন নদীর জল। 
যেটা ফ্রেঞ্চ গাইড বলতে চান না, তা হল, এই দে লা কংকর্দের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকতেন মাদাম গিলোটিন । রক্ত গড়িয়ে ধুয়ে যেত রাস্তা, শঁ এলিজে অবধি।  
রাজা রানিকে দিয়ে শুরু হয়ে মন্ত্রী আমলা, যে কোন শিক্ষিত মানুষ, যার ওপরে আক্রোশ তারই মাথা কেটে চুল ধরে ঝুলিয়ে গেন্ডুয়া খেলা হয়েছে ফরাসি বিপ্লবের কাছাকাছি সময়ে। 
সেইনের জল কাটা মানুষের রক্তে লাল। সারা রাস্তা, প্লাসে দে লা কংকর্ড রক্ত আর ধুলোয় থকথকে হয়ে পূতিগন্ধময় দিনের পর দিন। 
খাতায় কলমের হিসেবেই সতেরো হাজার পেরোনো, যাদের গিলোটিনে মাথা কাটা পড়েছে বিপ্লবের সময়।
 আর জেলে কারণ ছাড়াই মারা পড়েছে, এ নাকি অগুনিত। 
ত, কোনো গল্পে পড়েছিলাম সুন্দরী প্যারি নগরীর তলায় বহু কংকাল, গণ কবরে থাকে থাকে রাখা আছে। নিচের স্তরে এই সব রেখে, নানান সময়ে, একটু একটু করে উঁচু হয়েছে প্যারিস। 
কিন্তু পরতে পরতে ইতিহাস শুয়ে আছে পায়ের তলায়। 
লুভরে মিউজিয়াম যাবার পথে ফুটপাথে দেখলাম উঁচু নিচু লেভেল, নিচের দিকে ভেতরে নেমে যাবার রাস্তা দেখা যায়। 
মনে পড়ে গেল, পড়েছিলাম বটে প্যারীর আদি বাসিন্দারা নিচের ক্যাটাকম্বের কবরে আজও নামার রাস্তা জানে। 

আমাদের সমাজে, জীবনে, এরকম অনেক স্তর, লেয়ার্স খুঁজে পেয়েছি বুড়ো হতে হতে। 
ক্যাটাকম্বস ও হয়ত। 

যে পরিবেশের মধ্যে বড় হয়েছি, সেখানে ফেয়ার্লি প্লেসের চাকুরে মায়েরা সন্ধ্যে বেলা  স্টেটসম্যান আর দেশ পত্রিকা পড়ে, সকালে উদভ্রান্তের মত স্বামী সন্তানকে রেডি করে দিয়ে ভ্যানিটিব্যাগে নিজেদের টিফিনবাক্স ঢোকায়। 
ছুটে গিয়ে লেডিজ ট্রামে ওঠার পর শান্তি। তখন নিজেদের মধ্যে গল্প,  শাড়ি, সংসার, রান্না, ডিএ, বোনাস, লেট মার্ক পড়ে না যায় সেই ভয়। 
আর শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে খোঁজ পেলাম আরেকটা মহিলা মহলের খবর। 
যারা বাড়িতেই থিতু। যেখানে পুরুষরাই কথা আগে বলেন। 
ইস্কুলে কলেজে, সন্ধান পেয়েছি আরেকটা বৃত্তের মানবীদের। 
যাঁরা বিদেশ এবং উচ্চবিদ্যাকে ছুঁয়ে এসেছেন। নিজেদের আলোয় অনেক বেশি উজ্জ্বল। 
টালিগঞ্জ নামক জায়গার এই গলিতে, এই সব স্তরের ও মধ্যবর্তী আরেক ফালি সমতল খুঁজে পাওয়া গেলো। 

কলেজের সাথে খুব আশ্চর্য একটা যোগসূত্র ছিল তার। 
আমাদের কিছু পরে, একটি ছোট্ট ছেলে ভর্তি হয়েছিল ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। 
সদা হাস্যমুখ এই ছেলেটাকে সবাই ভালো বেসে ফেলেছিল। আমরা বড়রা। সহপাঠীরা। ওদের ছোটরাও। 

অনেক গুণ ছেলের। 
তার জন্য তাকে কেউ প্রশংসা করলেই শুনত, আমি যা পারি, সব আমার মায়ের জন্য। 
সারা কলেজ জেনে গিয়েছিল,  এই হাসিমুখ ছেলেটার মায়ের কথা। 

টালিগঞ্জে এসে দু এক দিনের মধ্যেই আলাপ হল সেই মায়ের সঙ্গে। 
শ্বাশুড়ি মা আলাপ করিয়ে দিলেন। 
আর কাকি, পিসিরা সবাই বলল, গলির সামনের দিকে ওনার বুটিকের কথা। 
কলকাতা তখনও বুটিক কনসেপ্ট ততটা চেনেনি। 
সানন্দা ইত্যাদি পত্রিকা মারফত কিছু পরিচিতি হচ্ছে ব্যাপারটার সঙ্গে। 
কিছুদিন যেতেই বউ বুঝল, এই ছোট্ট ঘর আর তার সংলগ্ন মেঝেনাইন জায়গাটুকু, শুধু শাড়ি পোশাক বা সাজগোজ, ঘর সাজানোর জিনিসপত্র বিক্রি হবার জায়গা নয়। 
এই গলির মেয়েদের নিঃশব্দে নিজস্ব নিঃশ্বাস নেবার জায়গা ও বটে। 
এখানে লেডিজ ক্লাব। এখানে মেয়েদের নাটক। এখানে মেয়েদের পরিচালনায় পুজো। এখানে সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে দু মিনিটের জন্য মনে রাখা, আমি মেয়েমানুষই শুধু নই। শুধু মানুষ ও। বাঙালিরাই নয়, সব রাজ্যের মেয়েরাই একটু হাসি মুখ হয়ে ফিরে যাবে বলে এসে বসে ছোট ছোট মোড়ায়। কত রকম প্ল্যানিং চলে। কি উৎসাহ! 
গলির অনেক বাড়ির পুরুষ মহল অসন্তুষ্ট ও হন। 
মেয়েদের এত হ্যা হ্যা করার কি আছে ? সংসার ঘরের কাজ ফেলে, যত্তসব! 
সেই গর্জন শুনে অনেকে পিছিয়ে যেত আসতে। বসতে। 
আবার মুদির দোকান থেকে জিনিস কিনে, বা রমেশদার কাছে ব্লাউজের মাপ দিয়ে ফেরার সময় ঠিক উঁকি মারত। 
ওই নিঃশ্বাস নেবার লোভে। 
মৃদুভাষী বুটিকের ছোটোখাটো মালিকের ব্যাক্তিত্বের বর্ম পেরিয়ে কেউ কিচ্ছু বলতে সাহস পায় না। তাই মেয়েদের হই হই চলতে থাকে। 

শ্বাশুড়ি মা ও ভালো বউ। আড্ডা মারতে যান না। কিন্তু বউকে নিয়ে গিয়ে বলে এলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, গাইবে গান পুজোর সময়, নয় ত কবিতা বলবে। আমার মেয়েটা আসলে সে গান করবে অখন। তোমাদের খাতায় লিখে রেখো। 
বউ টের পায় সিন্ধু সভ্যতা খননের সময় যেমন, মহেঞ্জোদারোর অনেক স্তর পাওয়া গেছিল, বা পুরোনো প্যারিস শহরে আজও, তেমনি মেয়েদের জীবনের অনেকগুলো স্তর এক সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলছে। 
এই শহর, এই সমকালে। 
আলাদা আলাদা আর্থসামাজিক রঙ গন্ধ পরিস্থিতি। 
প্রত্যেকের নিজস্ব একটা লড়াই চলছে টিকে থাকার, সম্মান বজায় রাখার, একটা করে দিন একটু ভাল ভাবে শেষ করে শুতে যাবার আশায়। 
তাই সে বছর শারদীয়ার অনুষ্ঠানে, মেজ ননদ বেনারসির সাজে যখন নাচের তালে দুর্গা, শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে বড় ননদের অনায়াস হারমোনিয়ামে সুর তোলার সাথে তার ছোট্ট মেয়ের গলায়, পুজোর গন্ধ এসেছে,  সামনের বাড়িতে থাকা নামী শিল্পী শ্রীমতী শ্রীলা মজুমদার কবিতা পাঠে,  নতুন বউ, ফের রবীন্দ্রনাথে ফেরে। 
শুধু দিনযাপনের, শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি ছুঁয়ে… রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধার শব্দরা ছবি আঁকতেই সামনে দর্শক আসনে গায়ে আঁচল টেনে ছোট লাল টিপের সাজে শ্বাশুড়িমা নড়ে চড়ে বসেন। 
যোগসূত্র তৈরী হয় মহিলাজাতীয়। 

বাড়ি ফিরে, বারান্দার চেয়ারে বসে, শ্বাশুড়ি অনেক চীৎকার শুনেও চুপ করে থাকেন। এবং শেষে বলেন,  আমি কথা দিয়ে এসেছি। কালিপুজোর ফাংশানে আমার বউ মা নাচবে। 
চাকুরে মায়ের, আর্চিস গ্যালারিতে ঘুরে বেরানো ইংরেজি গান আর সুমন চাটুয্যে শুনে বড় হওয়া  ডাক্তার মেয়ে দেখতে পায়, শুধু এইটুকু বলার শক্তি তৈরি করতেই কতখানি বিপ্লব চলছে। 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।