সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৭৪)

রেকারিং ডেসিমাল
সেই ফুলো ফুলো দু’দিকে দুটো ঝুঁটিওয়ালা জীব, যে কিনা নানান রকম ফ্রক পরে চটি ফটর ফটর করে ঘোরে, থেকে থেকে উত্তেজিত হয়ে প্রাণপণে নখ কামড়ায় আর চকোলেট খেতে বায়না করে, তার দাদার ত বিয়েও হয়েছে।
রেজিস্ট্রী হবার সময় সাদার উপর ফুলফুল ছাপ কুঁচি দেওয়া ফ্রক পরে সই করতে থাকা দাদার ঘাড়ের ওপরে হুমড়ি খেয়ে রয়েছে দাদা কি লিখছে দেখার জন্য।
বউমণির জন্য বড় দিদি মেজ দিদি জামাইবাবুর বিয়ের তত্ত্ব সাজানোয় হাত লাগাতে চেষ্টা করেছে। বকুনি ও খেয়েছে ফাঁকে ফাঁকে।
তারপর নতুন এক পিস বউ আসার পর আল্লাদে আটখানা হয়ে রয়েছে।
বুঝেছে এ ভারি সুবিধে।
দাদা অফিসে গেলেও ফুচকা কোল্ড ড্রিংকস খাওয়ার সুবিধে। নানা প্রকার ফাংশনের নাচ গান শিখিয়ে রিহার্সাল দেয়ার সুবিধে। দোলে খুব হই হই করে রঙ খেলার সুবিধে। ভুতু হয়ে বাজির মশলা মেখে বাজি বানালে গরম জলে চানের ব্যবস্থা হবার সুবিধে। পাড়ার বন্ধুরা শুদ্ধু লাইন দিয়ে বসে, নানা প্রকারের চুল বাঁধা আর লিপিস্টিক আইলাইনার ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে দেবার সুবিধে। ক্লাসের পড়া করিয়ে দেবার সুবিধে ত বটেই, এমনকি ক্লাসে না যেয়ে থাকলে, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট অবধি পাওয়ার সুবিধে এক খান ডাক্তার বউমণি হলে।
সুতরাং ইনি ভারি বশংবদ পোষ্য হলেন।
বউমণি ছানা হতে নার্সিং হোম গেলেন যখন, দাদা ডাক্তার, রেডিওলজিস্ট সবাইকে একশো বার জিজ্ঞেস করলেন, একটা মেয়ে হবে ত? আমার ছোট বোনের মত?
ডাক্তাররা হেসে বলতেন, সে হয়ত হবে, কিন্তু আপনার বোনের মত কিনা সে গ্যারান্টি দেয়া যাবে না।
অবশেষে হল মেয়ে।
সবাই বলল, ও মা কি সুন্দর। ঠিক যেন ছোট পিসি।
ছোট পিসিমা আল্লাদে গলে জল হলেন।
দুই পিসিই ঘাড়ে করে ঘোরেন ভাইঝিকে।
থেকে থেকে এ ঘরে এসে পর্যবেক্ষণ করেন এ ছোট প্রাণীকে।
খাটের ওপর স্পিডে হামা দিয়ে চলে বেড়ায় ভাইঝি। পিসিরা অবাক বিস্ময়ে পাহারা দেয়। পড়ে না যায় পাছে।
এই রকম সময়েই ছোট পিসি ডাক দেয় বউমণিকে, দেখ দেখ।
মা সেরেল্যাক গুলতে গুলতে তাকিয়ে দেখেন, পিছন দিকের শিক দেয়া জানলা দিয়ে উঁকি মারছে নিমগাছের ডালে চিকরি চিকরি পাতা।
মেয়ে সেই দিকে হামা দিয়ে গিয়ে, জানালার শিক ধরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ছে আস্তে আস্তে। ইচ্ছে, সবুজ পাতাদের ধরে ফেলার।
চার হাতপায়ে হামা থেকে দুই পায়ে প্রোমোশন।
ছোট পিসি বড় বড় চোখে চেয়ে থাকে।
একটু হাঁ হয়ে যায় মুখখানা।
তারপরেই বেরিয়ে আসে সেই অমোঘ বাণীঃ
মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কি অপরিসীম চেষ্টা, দেখেছো বউমণি ?
সেই সময়েই ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল তার দিদি। দরজার চৌকাঠে বিষম টিষম খেয়ে বলল , বউমণি কি শুনলাম? এত শুদ্ধ বাংলা? আমি কি বাঁচব?