সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ১২০)

রেকারিং ডেসিমাল
সেই দীপাবলি সেই ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, ঘরে ফেরেননি বাড়ির বড় বৌ।
অপারেশন করে পেটের টিউমারদের বাদ দিয়ে ফের খাদ্যনালীকে জুড়ে দেবেন বলে ঠিক করলেন ডাক্তাররা বোর্ড মিটিং করে।
ছেলে, বউ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলল অপারেশন থিয়েটারে বৌমার থাকার অনুমতি দিন।
সারাদিন, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হল। একের পরে এক অফিসার অফিসে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। কিন্তু পারমিশন মিলল না।
অগত্যা।
বৌমার বাবা মায়ের কাছে বাচ্চাদের বেশ কিছুদিন আগেই রেখে এসেছেন এরা। তারা সেখান থেকেই কারপুলে ইস্কুলে যায় আসে। রাতে ফোনে কথা হয় বাবামায়ের সঙ্গে।
অপারেশনের দিন এসে গেল।
সকাল থেকে বাড়ির ছোট বড় সব মানুষ হাসপাতালে চলে এসেছে। ওটিতে ঢোকার আগে সব দেখা করে সাহস দিয়ে গেল রোগিণীকে।
ট্রলি অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে যেতে ক্যানটিনে চা টা খেতে এসেছে ছোটোরা।
হঠাৎ মেজ ননদ বলল, বৌমণি তোমার নাম ধরে ডাকছে, ঐ শোনো।
বৌ চকিত হয়ে শোনে।
ঠিক তো। হাসপাতালের মাইক্রোফোনে শোনা যাচ্ছে তার নাম। ওটিতে তাকে যেতে বলা হচ্ছে তক্ষুনি।
পড়ে রইল চা।
দৌড় দৌড়।
লিফটে উঠে হাঁফাতে হাঁফাতে,ওটির দরজায় টোকা দিতেই, সার্জিক্যাল গাউন, টুপি মাথায় মেজো ডাক্তার দরজা ফাঁক করে বল্লেন, কই, কে সোনালি? শিগগির ঢোকো। ঢোকো, ঢোকো।
দুরুদুরু বুকে ভিতরে যেতেই বড় সার্জেন মেইন ওটির দরজা ফাঁক করে মুখ বাড়ালেন। মুখে মাস্ক।
স্ক্রাব করে ভেতরে এসো। জলদি।
বলেই আবার ঢুকে গেলেন ভেতরে।
পুত্রবধু মেজো ডাক্তারকে বললেন, কাল অবধি যে বলল, বাইরের ডাক্তারকে ওটি তে ঢুকতে দেবে না?
সেই ডাক্তার ভীষণ গম্ভীর হয়ে বললেন, সার্জেন নিজে তোমায় ডেকেছেন। চট করে স্ক্রাব সেরে গাউন টাউন পড়ে ঢোকো।
অনেক কিছু লাগে।
সাত বার কনুই পর্যন্ত হাত ধোয়া। তারপর আর কিছুতে না ছুঁয়ে সবুজ গাউন গ্লাভস চটি। আগে থেকেই সিস্টাররা দিয়ে রাখেন টুপি, মাস্ক। চোখ দুটো শুধু বাইরে।
ভেতরে যেতেই সার্জন বলেন, পাশে দাঁড়াও।
ছোট ডাক্তার তাকিয়ে দেখে, ইন্সিশান দেয়া আছে। দেখা যাচ্ছে পেটের ভেতর। সার্জন বলেন, হাত রাখো ভেতরে।
চমকে উঠলেও, কোন কথা বলে না পুত্রবধূ।
আস্তে হাত রাখে।
মস্ত বড় ডাক্তার হাতের ওপরে হাত রেখে ধীরে ভেতরে নিয়ে চলেন। বলেন হাত দিয়ে দেখো।
সমস্ত খাদ্যনালী এক সাথে লেগে পাথরের মত শক্ত হয়ে আছে। বুঝতে পারছো?
কাঠ হয়ে শুকিয়ে গেছে গলা।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় রোগিণীর বৌমা।
খুব দু:খ নিয়ে মাথা নাড়েন শল্যচিকিৎসক।
কিছু করতে পারব না। সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ইশ। এত কম বয়েস। বিদেশি স্টেপলার আনিয়ে রেখেছিলাম। যাতে অল্প কেটেই জুড়ে দেয়া যায় খাদ্যনালী। ফেরত পাঠিয়ে দেব। এই জন্য আরো তোমায় ডাকলাম, যে অপারেশন কিছু ও এ অবস্থায় ত করার নেই। চামড়া মাসল ফের সেলাই করে বন্ধ করে বেডে দিয়ে দিচ্ছি। কিছুই করার রইল না।
সাহস করে মুখ খোলে ক্যান্সার অনভিজ্ঞ ডাক্তার।
স্যার, যে কদিন পেশেন্ট পারেন, একটু খাবার রাস্তা করতে পারেন না?
গত মাস থেকেই ত খাবার ভিতরে রাখানোই যাচ্ছে না।
আর সময় কতটা পাব চিকিৎসার?
ছুরি কাঁচি রেখে ঘুরে দাঁড়ালেন বহু অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সার্জন।
বেশ। আমি কোলোস্টমি করে, ব্যাগ লাগিয়ে দেব। কিন্তু তিন মাসের বেশি সময় তুমি পাবে না। তুমি ডাক্তার। তোমায় সবার আগে মানতে হবে, বিশেষ কিছু করার নেই।
যাও ড্রেস চেঞ্জ করে নাও।
আস্তে আস্তে অপারেশন টেবিল থেকে পিছিয়ে এসে হাত ধুয়ে গাউন টুপি মাস্ক ছেড়ে ওটির পাশের রুমের সোফায় এসে বসে তিরিশ ছোঁয়া মেয়ে।
অস্থির হয়ে যায় ভেতরটা।
তিন মাস!!!
মাত্র তিন মাস???
তারপর এই হই হই করা বিশাল মানুষটি থাকবে না?
কোথায় যাবে?
কি এমন হবে যে এত বড় মানুষটা আর থাকবেই না?