সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৩৫)

পুপুর ডায়েরি 

কমলের দোকান মানেই মা হিসেব লিখবেন মাসকাবারি জিনিসপত্র আনবার।
আমি পড়তে শিখে অবদি জেনে গেছি, ক্যালেন্ডারের ১ তারিখ মানে মাস শুরু হওয়া। আর মা কাজের মাসিকে নিয়ে বা বাবার সাথে যাবেন দোকানে।
খাতায় পর পর লেখা থাকবে সারা মাসে আমাদের কি কি লাগবে তার একটা ফর্দ।
চাল,চিনি, পোস্টম্যান বাদাম তেল, আমুল মাখনের প্যাকেট, যার চেহারা এই পঞ্চাশ বছর ধরে প্রায় একই আছে, নিউট্রামুল বা আগে ছিল ভিভা, অথবা হরলিক্স, কর্নফ্লেক্স, জ্যাম, গোল মরিচ, বাবার দাড়ি কামানোর গোল সাবানের সুগন্ধি কৌটো, মায়ের তুহিনা, রাঙাজবা আলতার শিশি, ছোলা বিউলি মুগ মুসুরির ডাল, এইসব রোজকার ছোটো ছোটো গন্ধ আদর দরকার, সব লেখা থাকে দোকানের খাতায়।
ছোটো পুপু জানত ক্যালেন্ডারের ছবি আঁকা পাতায় এক লেখা থাকলে তাকে মাসের পয়লা বলে একলা নয়।
আর সেই সময় সাংসারিক হিসেবের শুরু হয়।
সেই সাথে, এও জানত, মাসের শেষ কাছে এলে দরকারদের একটু ঠেকিয়ে রাখা ভালো। মাস কাবার হয়ে আসছে।
মায়ের সতীর্থ কোনো বান্ধবী একবার বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে পুপুর কথোপকথন শুনে শোরগোল করে উঠেছিলেন।
..সেকি দীপু, মেয়েকে মাসের শেষ বলে অপেক্ষা করতে বললে? বাচ্চাদের কি এসব শেখানো উচিৎ?
মা কঠিন গলায় বলেছিলেন এইটাই যদি না শেখে তবে জীবনের বাকি সব শিক্ষাই বৃথা বলে আমি মনে করি। যদি নিজের ভাতই না খেতে পারে হিসেব বুঝে নিয়ে, তবে ত তাকে মানুষের পূর্ণ মর্যাদা দিতে পারব না। আর বাবা-মায়ের মাস কাবারের হিসেব যদি তার সন্তান না জানে, না বোঝে তবে আর কে বুঝবে?
সত্যিই, পুপু প্রথম মাসের ইন্টার্নিশিপের অর্জিত অর্থ নিয়ে মায়ের হাতে লেখা ফর্দ হাতে তেইশ বছর বয়েসে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই কমলের দোকানের সামনে। তখন সেই আলমারির মত ডেস্কখানা তার কোমরের কাছে নেমে এসেছে। তার মাথা মেডিক্যাল কলেজ অবধি ছুঁয়ে ফেলেছে যে।
মা লিখে দিয়েছিলেন, একটি মানুষের এক মাস জীবন যাপন করতে কতটুকু চাল, ডাল, সাবান ইত্যাদি লাগবে তার হিসেব।
বলেছিলেন, যা যা দাম লিখে টোটাল করে দেবেন ওনারা, তার সবটাই তোমার মাইনে থেকে মিটিয়ে দিয়ে এসো।
জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িতে ঢুকবে যখন, বুঝবো এত দিনে তোমায় স্বয়ং সম্পূর্ণ একটি মানুষ করতে পেরেছি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।