পুরাতনী-২
পক্ষীর দল ও রূপচাঁদ পক্ষী / রূপক সামন্ত
উনিশ শতকের ‘কলির শহর কলকেতা’। ইংরেজদের কলিকাতা, বাবু’র শহর কলিকাতা। জেলেপাড়ার গাজনের সং দেখা কলিকাতা। বিবিবিলাস আর রং -তামাশার কলিকাতা।
চুনোট করা ফরাসডাঙার বা সিমলের ধুতি, চোগা-চাপকান, শান্তিপুরে ডুরে উড়নি, এলবার্ট ফ্যাশানের চুল, মাথায় চুনী বসানো পাগড়ি, পায়ে বার্নিশ জুতো, বুকপকেটে ঘড়ির সোনার চেন ঝোলানো, আঙুলে হীরে-পান্নার আঙটি, মুখে গুড়গুড়ির নল- এই হোলো গিয়ে বাবু। বাবুরা ব্রুহাম, ল্যান্ডো, বগী, ফিটনে চেপে, গোঁফে আতর লাগিয়ে, হাতে বেলফুলের মালা জড়িয়ে সন্ধ্যের পর গরানহাটা, জানবাজার বা সোনাগাছিতে রাঁড়ের বাড়ি যান। সাথে চলে মোসাহেব, ইয়ার দোস্ত, হুকোবরদার আর খাস বেয়ারা। গুড়গুড়ির নল বেয়ে আসা অম্বুরী তামাকের ভুরভুর গন্ধে মাৎ। কুচি বরফ সহযোগে ব্র্যান্ডি, হুইস্কি, শ্যাম্পেন, শেরী-বোতলের পর বোতল উড়ছে রোজ রাতে। সাথে বেলোয়াড়ি ঝাড়ের নীচে ঠুংরী গানের টুকরো আলাপ। কেয়াবাৎ কেয়াবাৎ।
বাবুরা বেলা দুপুরের পর ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর দু-তিন ঘণ্টা আহ্নিক। ঝাড়া চারঘণ্টা ধরে চাকরের হাতে তৈলমর্দন। বাবু উলঙ্গ হয়ে তেল মাখতে মাখতে বিষয়-কর্ম দেখেন, সই সাবুদ করেন। আঁচাবার সাথে সাথে সূর্যদেব অস্ত যান। তখন আবার রাতের রঙ-মজলিশের তোড়জোড়।
বাবুর মোসাহেবরা দুটো বুড়ো আঙুল মুখে পুরে শিস দিয়ে লক্কা পায়রা ওড়ায়, বিশ্বকর্মায় ঘুড়ির লড়াই চলে। বাবুর বিড়ালের বিয়েতে লাখ টাকা খরচ। বাবু বুলবুলির নাচ দেখে মেজাজ শরীফ করেন। দোল-দুর্গোৎসবে বেজায় ধূম। বজরা করে, বারাঙ্গনা নিয়ে, ইয়ার-দোস্তদের সাথে মাতাল হাসির গররা তুলে মাহেশের স্নানযাত্রা বা শান্তিপুরের রাস দেখতে যান। বাঈনাচ, খেমটা, ফুল আখড়াই, হাফ আখড়াই, কবির লড়াই, পাঁচালি, খেউর আর যাত্রার আসর বসিয়ে টাকা ওড়ান। আর কলকাতার বাতাসে বাতাসে উড়ে বেড়ায় কেচ্ছা-কাহিনী। এ সেই সময়কার কথা।
উনিশ শতকের প্রথমদিকে কলকাতায় কয়েকটা নেশার ঠেক খুব বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে উঠেছিলো। যেমন- ঝকমারি, গুখুরি আর পক্ষীর দল। ‘ঝকমারি’র দল ছিল আঁতেল গোছের। নেশায় তা দিয়ে তর্ক জুড়তো। হাঁস আগে বা ডিম আগে থেকে, কুমারী নাকি এক ছেলের মা, হুইস্কি বড় না ব্র্যান্ডি বড় – বিষয়ের কি আর অভাব আছে! এই তর্ক থেকে ঝামেলা মায় হাতাহাতি পর্যন্ত। আজও তাই ঝকমারি শব্দটা ঝামেলার সমার্থক।
পক্ষীর দলের সবাই গাঁজাড়ু। এই দলে ঢোকার সময় গুণকর্ম অনুযায়ী প্রত্যেকে একটা করে পক্ষীর নাম পেতো এবং গাঁজাতে উন্নতিলাভ সহকারে উচ্চতর পক্ষীর শ্রেণীতে উন্নীত হতো। বাগবাজার, বটতলা, বউবাজার – এসব জায়গায় গাঁজার ঠেক আর পক্ষীর দল ছিলো বিখ্যাত। শহরের ভদ্রঘরের নিষ্কর্মা সন্তানদের অনেকে পক্ষীর দলের সভ্য হয়েছিলো। এদের নিয়ে নানা গল্প আছে। শিবনাথ শাস্ত্রী মশায় জানাচ্ছেন- ‘একবার এক ভদ্রসন্তান পক্ষীর দলে প্রবেশ করিয়া কাঠঠোকরা পদ পাইল। কয়েকদিন পরে তাহার পিতা তাহার অনুসন্ধানে আড্ডাতে উপস্থিত হইয়া যাহাকেই নিজ সন্তানের বিষয়ে প্রশ্ন করে, সেই পক্ষীর বুলি বলে। মানুষের ভাষা কেহ বলে না। অবশেষে নিজের সন্তানকে এক কোণে দেখিতে পাইয়া যখন গিয়া তাহাকে ধরিলেন, অমনি সে ‘কড়ড়ঠক’ বলিয়া তাহার হস্তে ঠুকরাইয়া দিল’।
পক্ষীর দলের উৎপত্তি সম্পর্কে ‘কলিকাতার বারোইয়ারি-পূজা’ নক্সায় হুতোম জানাচ্ছেন- ‘রাজা নবকৃষ্ণ* কবির বড় পেট্রন ছিলেন। ইংলণ্ডের কুইন এলিজাবেথের আমলে যেমন বড় বড় কবি ও গ্রন্থকর্ত্তা জন্মান, তেমনি তাঁর আমলেও সেই রকম রাম বসু, হরু, নিলু, রামপ্রসাদ ঠাকুর ও জগা প্রভৃতি বড় বড় কবিওয়ালা জন্মায়। তিনি কবি ও গাওনার মান বাড়ান, তাঁর অনুরোধে ও দেখাদেখি অনেক বড়মানুষ কবিতে মাতলেন।
বাগবাজারের পক্ষীর দল এই সময় জন্মগ্রহণ করে। শিবচন্দ্র ঠাকুর ( পক্ষীর দলের সৃষ্টিকর্ত্তা ) নবকৃষ্ণর একজন ইয়ার ছিলেন। শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বাগবাজারের রিফরমেশনে রামমোহন রায়ের সমতুল্য লোক- তিনি বাগবাজারেদের উড়তে শেখান। সুতরাং কিছুদিন বাগবাজারেরা সহরের টেক্কা হয়ে পড়েন। তাঁদের একখানি পাবলিক আটচালা ছিলো, সেইখানে এসে পাকি হতেন, বুলি ঝাড়তেন ও উড়তেন- এ সওয়ার বোসপাড়ার ভেতরেও দু’চার গাঁজার আড্ডা’ ছিল। এখন আর পক্ষীর দল নাই, গুখুরি ও ঝকমারির দলও অন্তর্দ্ধান হয়ে মরে গেছেন, পাকিরা বুড়ো হয়ে মরে গেছেন, দু-একটা আধমরা বুড়োগোচের পক্ষী এখনও দেখা যায়, দল ভাঙ্গা ও টাকার খাঁক্তিতে মনমরা হয়ে পড়েচে, সুতরাং সন্ধ্যার পর ঝুমুর শুনে থাকেন। আড্ডাটি মিউনিসিপ্যাল কমিশনেররা উঠিয়ে দেছেন, আখ্যান কেবল তার রুইনমাত্র পড়ে আছে’।
এমনই একটি পক্ষীর দলের পক্ষীরাজ ছিলেন রূপচাঁদ দাস ( তাঁর মৃত্যু ১৮৮৫ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে । মতান্তরে তিনি ১৮৮৮ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন ) । লোকে আজও তাঁকে ‘রূপচাঁদ পক্ষী’ নামে চেনে। এঁর বাবার নাম গৌরহরি দাস মহাপাত্র। এঁদের আদি নিবাস ওড়িশার চিলিকা হ্রদের ধারে। ওড়িশার মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের বংশে কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায় গৌড়েশ্বর ষড়ঙ্গদেব এই সিংহাসনে বসেন। রূপচাঁদের পিতামহ হরেকৃষ্ণ দাস ষড়ঙ্গদেবের বংশোদ্ভূত। তাঁর পুত্র গৌরহরি রাজা হরিহর ভক্তের আমমোক্তারী চাকরী করার কারণে কলকাতায় বাস করতেন। রূপচাঁদ খুব ছোটো বয়স থেকেই সুকণ্ঠ গায়ক ছিলেন। তখনকার কলকাতার গানের আসরে তাঁর খুব আদর। রূপচাঁদের একখানা খাঁচার মতো গাড়ি ছিলো। সেটা চেপে বেড়াতেন বলে তাঁর নাম হয়েছিলো ‘পক্ষী’-একথা অনেকে বলেন। আবার অনেকে বলেন যে তাঁর নিজস্ব একটি পক্ষীর দল ছিলো। রূপচাঁদ নানা ধরণের অনেক গান বেঁধেছিলেন। আগমনী, বিজয়া, বাউল-দেহতত্ত্ব, টপ্পা প্রভৃতি গানের সাথে সাথে সমসাময়িক ঘটনা ও কেচ্ছা নিয়ে রঙ্গ-ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক গান বাঁধতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর গানে পক্ষী, খগরাজ, দীন খগ, R.C. the bird- এরূপ ভণিতা পাওয়া যায়। রেল, গঙ্গার পোল, বিধবা বিবাহ, কন্যাদায় – এমন নানা বিষয়ে তিনি গান বেঁধেছিলেন। ইংরাজি ও বাংলা মিশিয়ে অনেক প্যারডী গানও লেখেন তিনি।
রূপচাঁদ পক্ষীর কয়েকটি গান–
১. মানুষ চলে কলের বলে
২. আমারে ফ্রড করে কালিয়া
ড্যাম তুই কোথায় গেলি
৩. খগ – সম্পাতি, কশ্যপ নাতি
৪. লেট মি গো ওরে দ্বারি
আই ভিজিট বংশীধারী
৫. ধন্য ধন্য কলিকাতা শহর
রূপচাঁদ পক্ষীর অনেক গান আজও শ্রদ্ধেয় রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বৈঠকী কণ্ঠে অমর হয়ে আছে।
* শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব।
তথ্যসূত্রঃ
১. হুতোম প্যাঁচার নক্সা- কালীপ্রসন্ন সিংহ
২. ভারতকোষ, পঞ্চম খণ্ড, ৪৪১ পাতা,
দেবীপদ ভট্টাচার্যের নিবন্ধ
৩. আন্তর্জাল