T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় রোজা সিনহা

শারদ প্রাতে
প্রত্যেক বছরের মত, সেই সকালেও ঘুম ভাঙল ঠিক ভোর চারটায়। প্রতি দিন এর মত এই সকালের ঘুম ভাঙা টা এলার্ম ঘড়ি বা পাশের বাড়ির রান্নার শব্দে নয়, এটা প্রায় একুশ বছরের অভ্যেস। কিন্তু সেই আলো-আঁধার ভোরের বাতাসে প্রত্যেক বছর এর মত শ্রী বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রর কণ্ঠস্বরে মহালয়ায় মহিষাসুর মার্দিনী …”আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা …” শোনা গেলনা। বাড়ি থেকে অনেক দূরে এক নতুন, অচেনা শহরের এই বাড়িতে দাদুর কেনা, বাবার সারানো কোনো পুরোনো রেডিও যে নেই। এই শহরে, তেমন দুর্গা পুজো হয় বা কোথায়? তাই মা দুর্গার আগমনির সকাল টাও শান্ত, আর জানলার বাইরে, নীচে রাস্তায় মানুষজন-গাড়ি ঘোড়ার শব্দেই কেটে গেল।
মাঝের সাতটা দিন ঠিক অন্য প্রত্যেক দিন এর মতোই এগোলো। রাস্তা, ঘাট, মানুষ, ভিড় সব ঠিক অন্য আর এক দিন যেন, আর সাথে শুধু এক শূন্যতা, এক খালি ভাব। নেই কোনো পুজোর বাজার, নেই কোনো গলির কোনে জরির কাপড় জড়ান অর্ধেক তৈরি প্যান্ডেল। রাস্তা গুলো সাজেনা নেই সোনালী, রঙিন আলোয়। ট্রেনের বাইরে তাকালে জান-বাহনের ভিড়, অট্টালিকা আর বসতি, নেই কোথাও সবুজ খোলা মাঠে সারি-সারি সাদা কাশ ফুল।
পুজোর পাঁচটা দিন,
ঘুম ভাঙে আসে-পাশের জন বহুলের আওয়াজে, পাড়ায় লাগানো মইক্রোফোনে পুরোনো বাংলা গান কোথায়? আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখার কোনো কারণ নেই এই শহরে।
এই শহরের মতই আমরাও সারা রাত জাগি, কিন্তু ছোট বেলার বন্ধুদের সাথে প্যান্ডেল হপপিং যাওয়া নেই। মা, বাবার সাথে বেড়াতে যাওয়া নেই। ভাই, বোন, দাদা, দিদি দের সাথে রাস্তায়, রাস্তায় ফুচকা, এগ্রোল খেয়ে শরীর খারাপ করা নেই।
এই শহরে হয়তো দুর্গা পূজার মতো কিছুই নেই।
শেষ দিনে সিঁদুর খেলা নেই। কিন্তু দশমীর বিকেলে বাড়ি থেকে অনেক দূরে আসা, লোকাল ট্রেন এর একটা কোনে, জানলা ধারে বসে থাকা, প্রত্যেক বাঙালির মনে না বোঝা যেন এক গুমোট ভাব থাকে।
পশ্চিম বঙ্গের কোনো এক ছোট্টো শহরের এক ছোট্টো প্যান্ডেলে মা দুর্গার মূর্তির চোখের কোনে আটকে থাকা যে অশ্রু, বহু দূরে এই শহরের ভীড়ে এক বাঙালির চোখেও সেই একই জলের ফোঁটা আটকে থাকে, আর রয়ে যায় মনের ভেতর শুধু আগামী বছর বাড়ি ফেরার আশা।