পুরাতনী-১
কলের গান
গ্রামোফোন! ফোনোগ্রাফ! নাকি কলের গান! সেই যে একটা সিন্দুকের মতো কাঠের বাক্স। বাক্সটার নীচের দিকে গোল করে কাটা। তার উপর খুব সূক্ষ্ম জাল বসানো। বাক্সটার ভিতরে এই জায়গাটায় একটা ধাতুর চোঙ আছে। কোনো কোনো গ্রামোফোনে চোঙটা আবার বাক্সের উপরেই আছে। অনেক গ্রামোফোনের বাক্সে আবার রেকর্ড রাখার জন্য খোপ করা আছে। চোঙটার সাথে জুড়ে দেওয়া একটা ধাতব দণ্ডের মাথায় ছোটো লোহার পিন লাগানোর ব্যবস্থা। বাক্সটার মাথায় একটা গোল ভেলভেট মোড়া মোটা চাকতি। বাক্সটার গায়ে, ডানদিকে একটা হাতল ঘোরালে চাকতিটা ঘোরে। তখন রেকর্ড চাপিয়ে তার উপর পিনটা রাখলে ওই চোঙ দিয়ে শোনা যায় গান, আবৃত্তি, বাজনা, হাস্যকৌতুক ও আরও কত কী। বেকেলাইটের তৈরি, কালো রঙের, বেশ ভারি, এই রেকর্ডগুলোর ব্যাস ২৫ সেন্টিমিটার।
যন্ত্রটির উদ্ভাবন ও বিবর্তনের পথটি বেশ রোমাঞ্চকর। পিছনে তাকালে দেখা যায় যে শব্দকে যথাযথভাবে যন্ত্রের সাহায্যে বারবার বাজানোর চেষ্টা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শুরু হয়। ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী থমাস ইয়ং ‘টিউনিং ফর্ক’ আবিষ্কার করেন। ইংরাজি U আকারের দেখতে এই যন্ত্রটিতে আঘাত করলে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ উৎপন্ন হয়। আজও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়।
ফরাসি কবি চার্লস ক্রোস শব্দ ধারণ ও সেই ধৃত শব্দকে বাজানোর একটি যন্ত্রের কথা ভাবেন। তাঁর লেখা Phonograph শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে এপ্রিল ফরাসি বিজ্ঞান আকাদেমিতে পাঠান। যন্ত্রটি তৈরিও করা হয়।
স্বনামধন্য থমাস আলভা এডিসন ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দের মে-জুলাই মাস নাগাদ শব্দ ধারণ ও ধারণকৃত শব্দ পুনরায় বাজানোর কারিগরী কলাকৌশল আবিষ্কার করেন। ওই বছরের ২১শে নভেম্বর বিষয়টি প্রকাশিত হয় এবং ডিসেম্বর মাসে এডিসন যন্ত্রটিকে জনসমক্ষে হাজির করেন। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি পেটেন্ট অফিসে গিয়ে যন্ত্রে বাজিয়ে শোনালেন–Good morning. How do you do? How do you like the phonograph? তিনি এই ফোনোগ্রাফ যন্ত্রের স্বত্ত্বাধিকার লাভ করেন।
আদি ফোনোগ্রাফ যন্ত্রে একটি পাতলা টিনের পাতের উপর শব্দ ধারণ করা হত। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে শব্দ ধারণ করা হয়। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে এমিল বারলিনার ফোনোগ্রাফ যন্ত্রটিকে আরও উন্নত করেন। সমতল ও গোলাকার ডিস্ক ব্যবহার করা শুরু হয়। একটি মাস্টার ডিস্ক থেকে একাধিক ডিস্ক কপি করার পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হয়। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে বারলিনার মোম ও বেঞ্জিনের প্রলেপ দেওয়া দস্তার চাকতির উপর শব্দধারণ শুরু করেন। এই যন্ত্রটি গ্রামোফোন নামে পরিচিত হয়।
১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ৫ ইঞ্চি বা ১৩ সেমি ব্যাসযুক্ত রেকর্ড বাজারে বিক্রি করা শুরু হয়। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে বার্লিনার রেকর্ড কোম্পানি তাদের ট্রেডমার্ক যুক্ত রেকর্ড বাজারজাত করে। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ যন্ত্রটি একটি সম্পূর্ণ রূপ লাভ করে। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোল্টা গবেষণাগারে গ্রাফোফোন নামক আরও একটি যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়।
১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ভিক্টর টকিং মেশিন কোম্পানি ১০ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ড বাজারে আনে। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের, ২ মিনিট বাদনকালের রেকর্ড বাজারজাত হয়।
১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে কলাম্বিয়া কোম্পানি ফাইবারের রেকর্ড ব্যবহার করা শুরু করে। সোনায় মোড়া পিন দিয়ে সে রেকর্ড বাজানো হত। এইসব রেকর্ড ৬৯-১৩০ rpm গতিতে ঘুরতো। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের বারলিনার কোম্পানির ৭ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ড বাজতো ৭০ rpm ঘূর্ণগতিতে। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে রেকর্ডের ঘূর্ণগতি ৭৮ rpm নির্দিষ্ট করা হয়। তখন রেকর্ডের প্রতি পিঠে ৪১ মিনিটের শব্দ ধাটন করা হত। চোঙের মধ্য দিয়ে উৎপন্ন শব্দকে পাঠিয়ে শব্দের তীব্রতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বৈদ্যুতিক লাউড স্পিকারের ব্যবহার শুরু হয়। এই সময় ৩৩.৫, ৪৫ এবং ৭৮ rpm — এই তিন ধরণের ঘূড়ণনগতির রেকর্ডকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে বেতার সম্প্রচারের জন্য ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ৩৩ rpm ঘূর্ণগতির রেকর্ড ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে কলাম্বিয়া কোম্পানি ৩৩.৫ rpm ঘূর্ণগতির দীর্ঘবাদন রেকর্ড বা Long playing record প্রকাশ করে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বৈদ্যুতিন ট্রানজিস্টর ফনোগ্রাফ বাজারে আসায় হাতল ঘুরিয়ে কলের গান চালানোর দিন শেষ হয়ে যায়।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমেই ভারতবর্ষে গ্রামোফোনের আগমন ঘটে। এই শতাব্দীর প্রথম তিন দশক এই গ্রামোফোনই ছিল সবচেয়ে আধুনিক বিনোদন মাধ্যম। কলকাতাতেই রেকর্ড তৈরি করা শুরু হয়। ‘দ্য গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি লিমিটেড ‘ ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ ব্র্যান্ড নামে একটি রেকর্ড প্রকাশ করে। এই রেকর্ডের একপিঠের শিরোনাম ছিল-‘ হাওড়া স্টেশনে বাঙালি পল্টনকে বিদায়’। এখানে ধারণ করা হয় বিদায় অনুষ্ঠানের দৃশ্য, যার দৈর্ঘ্য ছিল ৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। আর অপর পিঠের শিরোনাম ছিল ‘বাঙালি পল্টনের মার্চ সংগীত’। এখানে ধারণ করা হয় বাংলায় একটি রণসংগীত, যার দৈর্ঘ্য ছিল ২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। রেকর্ডটি সম্পর্কে তৎকালীন পত্রিকায় নিচের বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ পায়—
‘মার্চ সঙ্গীত ও হাওড়া স্টেশন হইতে যাত্রাকালীন দৃশ্যের সবিশেষ বিবরণ
প্রথম পৃষ্ঠা —তূর্য্যধ্বনি ও ভেরী নিনাদ ব্যান্ড বাদ্যের সহিত পদ বিক্ষোপের তালে তালে সমস্বরে মার্চ গীত
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা —হাওড়া স্টেশনে আরোহী ও ফেরিওয়ালাদের কলরব—ব্যান্ড বাদ্য—মহিলাগণের আশীর্বাদ গীত-ব্রাহ্মণ ও ভদ্রমহোদয়গণ কর্তৃক কল্যাণকামনা—গাড়ির ঘণ্টা—গার্ডের শিটি—আনন্দ ও জয়ধ্বনি—গাড়ি ছাড়ার শব্দ ইত্যাদি।
রেকর্ডখানি সর্বাঙ্গ সুন্দর হইয়াছে। নিকটস্থ গ্রামোফোন ব্যবসায়ীর দোকানে গিয়া শ্রবণ করুন। মূল্য আড়াই টাকা।’
গ্রামোফোনের রেকর্ডগুলো ভরা থাকতো কাগজের খামের মধ্যে। মধ্যেখানটায় গোল করে কাটা। সেই কাটা দিয়ে ভিতরের রেকর্ডের গান বা হাস্যকৌতুকের নাম, শিল্পীর নাম – এসব পড়া যায়। কাগজের খামের উপর কোম্পানির নাম, লোগো এসব ছাপা। কোনো কোম্পানির নাম -HINDUSTAN RECORDS ( H.M.P. & V. SYNDICATE. LD. ) , কোনো কোম্পানির নাম- The PIONEER RECORDS & MUSICAL VARIETIES LTD., কোনোটার নাম- NEW THEATERS’ Megaphone, কোনো কোম্পানীর নাম – মেগাফোন রেকর্ড ( সর্ব্ব-জন-প্রিয় শিল্পীদের গীত-বাদ্য )। আবার কোনোটার গায়ে লেখা আছে “His Master’s Voice” RECORD ( GREATEST ARTISTS-FINEST RECORDING” )।
His Master’s Voice কোম্পানির লোগো সেই চিরচেনা গ্রামাফোন চোঙের সামনে পোষা কুকুর। NEW THEATERS’ Megaphone কোম্পানির লোগো – শুঁড় তুলে কপালে ঠেকানো বৃংহনকারী দাঁতাল হাতি। এর একপিঠে নিউ থিয়েটার বাড়ির ছবি, অন্যপিঠে নদীপাড়ের ঝোপে ছুটন্ত হরিণের ছবি। মেগাফোন রেকর্ডের লোগো একটি দাঁড়িয়ে থাকা হরিণ। এর খামের একপিঠে বিখ্যাত গায়কদের ছবি ও নীচে নাম। যেমন- জ্ঞানেন্দ্র গোস্বামী, অনুকুল দাস, পরেশ দেব, ভীষ্মদেব, ভবানী দাস, নুরউদ্দীন। জ্ঞানেন্দ্র গোস্বামী ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আরও কারও নাম আমি শুনি নি, গান শোনা তো দূরের কথা। গায়িকাদের নাম – কমলা (ঝরিয়া), অনন্তবালা বৈষ্ণবী, ছায়া দেবী, কানন দেবী, পটল (চীনা), ফুল্লনলিনী। কমলা ঝরিয়া, ছায়া দেবী ও কানন দেবী ছাড়া অন্যদের নাম আমার শোনা নেই। যদি কেউ এঁদের সম্পর্কে জানেন, তাহলে জানাবেন।
দি পাইওনিয়ার রেকর্ডস্ এর খামে গাছপালা, সূর্য, প্রকৃতির ছবি। হিন্দুস্থান রেকর্ডস এর খামের ছবিতে একটি ছেলেকে গাছের নীচে বসে বাঁশি বাজাতে দেখা যাচ্ছে।
আমার সংগ্রহের রেকর্ডগুলির মধ্যে দুটি রেকর্ডে এপিঠ ওপিঠ করে চারখণ্ডে ‘কর্ণ ও কুন্তী সংবাদ’। আবৃত্তিকার – DR. RABINDRA NATH TAGORE। আর একটি রেকর্ডের একপিঠে ‘ঝুলন’ কবিতার আবৃত্তি ও অন্যপিঠে ‘আশা’ কবিতার আবৃত্তি করেছেন স্বয়ং Dr. Rabindra Nath Tagore। রবীন্দ্রনাথের নামের আগে ডঃ ব্যবহার করার নমুনা আমার আর কখনও চোখে পড়ে নি।
একটি রেকর্ডে মি. পরিতোষ শীলের বেহালা ও মি. অমর ডাট এর ম্যান্ডোলিনের যুগলবন্দীতে বেজেছে গানের সুর। একপিঠে – ‘ওকে নীল-যমুনায় ভরা-বেদনায়’। অন্যপিঠের গান – ‘মাধবী-রাতে মম মন-বিতানে’।
আর একটি রেকর্ডে পিয়ানোয় গানের সুর বাজিয়েছেন Prof. Annul Chandra Das (Calcutta)। একপিঠে- ‘ফোটে ফুল শুকনো ডালে’। অন্যপিঠে- ‘ চাঁদ চকোরে অধরে অধরে’।
এককালের আভিজাত্য ও সংস্কৃতিমনস্কতার প্রতীক গ্রামাফোন বহুদিনই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।কোনও পুরোনো আমলের বাড়িতে যত্নে বা অযত্নে পড়ে পড়ে ইতিহাস হয়ে রয়েছে এককালের ইতিহাস সৃষ্টি করা কলের গান এই গ্রামোফোন। আর সংরক্ষিত আছে জাদুঘরে। পরে আবিষ্কৃত হওয়া বৈদ্যুতিন রেকর্ড প্লেয়ার, টেপরেকর্ডার, স্টিরিও টেপ রেকর্ডার, ওয়াকম্যান, সিডি, ডিভিডিও কালেরই নিয়মে আজ জাদুঘরের জিনিস। এখন মাইক্রোচিপের যুগ। শব্দধারণ ও পুনরুৎপাদনের গুণমান আকাশচুম্বী। তথাপি কলের গান বা গ্রামোফোন আজও নস্টালজিয়া। মন মেদুর হয়ে ওঠে। আর এই গ্রামোফোন রেকর্ডেই ধরা রয়েছে প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের গান, বাজনা, নাটক, অভিনয়। সেই মণিমুক্তোর সন্ধান করলে আজও গ্রামোফোন রেকর্ডই ভরসা।