T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় রাজীব সিংহ

ঘুড়ি

এই শ্যাওলা-ধরা বারান্দার অনেকটা জুড়ে রান্নাঘর৷ দেওয়ালের এক ধারে ইট দিয়ে বাঁধানো দুটো পেল্লাই উনুন৷ নিভন্ত উনুনে তখনও কিছু আঁচ রয়ে গেছে৷ তার উপরে পাকা কাঁঠালের বিচি সেঁকতে দেওয়া৷ হাত দিয়ে কয়লা ভাঙার দিন শেষ৷ উঠোনের কোনে কয়লা ভাঙার ঘরে এখন বস্তা ভর্তি কোক কয়লা আর ঘুঁটের জঙ্গল৷ কালো কালো ডিমের মতো কয়লা৷ বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে গেলে বড়ি শুকনোর মতো মনার ঠাকুমা আঙিনায় চটের রোদে মেলে দিত সেইসব ডিম৷ কালো ডিম৷ মনা আর তার ভাই নামতার সুরে ঠাকুমাকে রাগাতো— আঙিনায় কানাই বলাই/রাশি করে সরিষা কলাই৷ সদ্যশেখা সহজ পাঠ মনার ঠাকুমাকে খেপিয়ে তুলতো৷ কাক খেদানোর ভঙ্গিতে ঠাকুমা গাছের ডাল হাতে ছুটে যেত৷ বোধিকল্পদ্রুমের উঁচু ডাল থেকে যুবতী কাক চেঁচিয়ে উঠতো, কা—কা! বালক তখন চক দিয়ে নোনাওঠা সিমেণ্টের মেঝেতে ছবি আঁকে খড়্গহস্ত মুণ্ডমালিনীর৷

মনাদের বাড়ি আর বালকের বাড়ি পাশাপাশি হলেও মধ্যিখানে এক প্রলম্বিত উদ্যান৷ মনাদের৷ কাঁটাঝোপ, গুল্মলতা, কচুবন, চোরকাঁটা পেরিয়ে৷ খিড়কি দিয়ে আরেক বাড়ির খিড়কি জোড়া৷ সেপথে কেউ যায় না৷ কিছু ধসে যাওয়া পতিত ঘর মনাদের৷ সেখানে সাপ-গিরগিটি-তক্ষক৷ যেন সোরা ও গন্ধকের ঘর৷ বরফে মোড়া এক হিমযুগ৷ এক তীব্র মনখারাপ৷ কিছু ঘুঘু আর হাঁড়িচাচা৷ অচেনা অর্কিড৷

সেদিন, বিশ্বকর্মাপুজো, আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর দিন৷ কাকিমা, মানে মনার মা হসপিটালের ডিউটি থেকে আর ফিরে এলো না৷ মনা আর ওর ভাই সারাদিন কেঁদে কেঁদে সারা৷ থানা-পুলিশ৷ পাড়ার মাতববরদের জরুরি মিটিং৷ বাড়িজুড়ে গোলটেবিল৷ ফিসফাস৷ অস্ফূট কথা-কাটাকাটি৷ বালকও শুনলো অমিতাভ বচ্চনের মতো কানঢাকা চুলের পাড়ার সেই বাবলুকাকুর কথা৷ মনার মায়ের মতোই বাবলুকাকুকেও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না খুঁজে৷ ওদিকে মনার বাবা বিকেল থেকেই চুপ৷ গুম মেরে আছে৷ একগুচ্ছ বিষাদঘন মেঘ ওই চোখেমুখে৷ কোনও কথাই যেন কোথাও নেই৷ কোনওদিন ছিল না৷ ওই ভিড়ের কৌতূহল থেকে, অনিবার্য বৃষ্টিপতনের আগে হঠাৎই মনার ঠাকুমা সবাইকে চলে যেতে বললো মনাদের বাড়ি থেকে৷ বালক স্পষ্টতই ঠাকুমার হাতে সেই কাক খেদানো গাছের ডাল দেখতে পেল৷ যুবতী কাক, শশব্যস্ত, ডেকে উঠলো, কা—কা

আকাশের অনেক উঁচুতে বাবলুকাকু লাটাই থেকে নির্দ্বিধায় তার ঘুড়িকে উড়ে যেতে দিত৷ বালক দেখেছে তার পাশে দাঁড়িয়ে৷ ‘নে-নে, লাটাইটা ধর৷ সুতো ছেড়ে যাবি যতক্ষণ উড়তে চায়’৷ বালকের হাতে লাটাই ধরিয়ে বাবলুকাকু উল্টোদিকের রেলিঙে হেলান দিয়ে সিগারেট জ্বালায়৷ অমিতাভ বচ্চনের মতো কানঢাকা চুলের বাবলুকাকু৷ রেলিঙের নিচের গলিপথ দিয়ে তখন ঘরে ফিরে আসতো শ্বেতশুভ্র অ্যাপ্রন, সিস্টার, মনাদের মা৷ বালক অথবা আমার কাকিমা৷

সেদিনের সেই ঘনকালো মেঘ, বিশ্বকর্মা পুজোর নিহত আকাশে বালক স্পষ্ট দেখতে পায়, দিগন্তের দিকে ভেসে যাচ্ছে দুটো কাটা-ঘুড়ি মনাদের কান্না আর সমস্ত মনখারাপ পেরিয়ে…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।