শীল-তোরসা নদী, যেখানে কুচবিহার টাউনের মাঝখানে চওড়া হয়ে তারপর পুব-কাত হয়ে বয়ে চলেছে, তার সংলগ্ন পুব-পারে বহুদিনের পুরোন জন-বসতি নিউটাউন ও গান্ধী-কলোনি। আশির দশকে, এই কলোনিগুলিতে, বেশ কিছু উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষ বসবাস শুরু করার দরুণ, কিছু রাস্তা মেরামতির কাজ হয়েছিল – তাই, স্থানিয় রিক্সাওয়ালারা, এই এলাকাটাকে নতুন-পাড়া বলতো। আশির দশকের শেষে, এই দুইটি কলোনির কোল ঘেঁষে তৈরী হল রূপসি-কলোনি – একটু দূরে-দূরে রঙ-ফর্সা, এক-দুই-তিনতলার নতুন অনেক বাড়িতে, অনেক নবিন-আবাসিক এসে বসবাস শুরু করলেন এই রূপসি-কলোনিতে। রাস্তাগুলোও, টাউনের অন্য এলাকার চেয়ে চওড়া, পরিচ্ছন্ন এবং দুইপাশে বৃক্ষরোপন করায়, এই টাউনের মানুষের আকর্ষণের ও গর্বের বিষয় এই কলোনি। বর্ধিত আবাসিক সংখ্যার ফলস্বরূপ, এই কলোনির দক্ষিনদিকে, চালতাতলার মাঠ, বহুবছরের অবহেলার পর, পরিণত হলো পাঁচ-ফুট পাঁচিল ঘেরা পার্কে। এই পার্কেই ১৯৯০ সালে শুরু হয় বারোয়ারি সরস্বতী পুজো ও অন্নপূর্ণা পুজো। বলা বাহুল্য, এই উদ্যোগের মধ্যে কোন সংঘ বা ধর্মজিগিরের প্রয়াস ছিল না – এই উদ্যোগ, ছিল এলাকাবাসির, সহজ উৎসব-ব্যাকুলতার একটা আত্মপ্রকাশ। এছাড়া, পার্কটাকে আগলে রাখার কৌশল ও বলা যায়। এই রূপসি কলোনির ৯০ শতাংশ মানুষ, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বা ব্যাংকে চাকুরিরত – তাই পারস্পরিক মিঠে-খুনসুটি বজায় রাখার মতন তারতম্য থাকলেও, মোটামুটি সম-উপার্জন ও সম-মানসিকতা সম্পন্ন।
রোহিতের বাবা, যখন ১৯৮৭ তে, এই রূপসি-কলোনির মধু-সেন লেনে তার বাবা-মা ও স্ত্রি-পুত্রকে নিয়ে একটি দেড়-তলা বাড়ি করে এসে উঠলেন, তখন রোহিত, ক্লাস টেনের ছাত্র। সেন্ট্রাল টাউন একাডেমির শিক্ষক-শিক্ষিকারা, যে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর দিকে অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন, রোহিত তাদের মধ্যে একজন। তাই ABTA test paper ছাড়া, আর কোনকিছুর প্রতি তার নজর কম। এপাড়াটা শান্ত – ছাতের একটা ঘর ও একটা ছোট টয়লেট বানানো হয়েছিল, রোহিতের কথা ভেবে। রোহিতের ঠাকুমা বলেছিলেন রোহিত চাকরি করে, বাকি দু’তলার ঘর বানিয়ে ফেলবে, আর কয়েকবছরের মধ্যেই। তৎকলীন বঙ্গসমাজের, আর পাঁচজন মেধাবী ছাত্রের মতন, রোহিত ও একনিষ্ঠ ছিল মাধ্যমিকের ভালো ফলের লক্ষ্যে। এতটাই একনিষ্ঠ, যে সরস্বতী পুজোর প্যান্ডালে অঞ্জলি সেরে বান্ধবী সংকলনের অবকাশটুকুর ও কখনও সদ্ব্যবহার করেনি। যদিও, রোহিত যখন তিনটে বিষয়ে লেটার মার্ক্স নিয়ে, ওভার অল স্টার মার্ক্স পেয়েছিল, চৈতি-বিপাশা-সোমা’র অনেক আবেগের মধ্যে “পাড়ার রোহিত” নিয়ে গর্ব, কিছু কম ছিলনা। এর দুই বছর পর, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করে, কলকাতায় ইন্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল রোহিত।
গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে, বাড়িতে এসে , মা-ঠাকুমার বিশেষ আদর উপভোগ করে রোহিত। তাদের মুখেই গল্প শুনে, খানিকটা পাড়া পরিচিতিতে রপ্ত হয় রোহিত। এছাড়া কলোনির কারো বাড়িতে বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণ থাকলে, পড়শির সাথে আলাপ-পরিচয়ের বিশেষ অবকাশ। ঐসব অনুষ্ঠানে, তার ব্যাচের চৈতি-বিপাশা-সোমা তাকে পড়শি-অধিক খাতির করে, রোহিত সেই ব্যাপারে সচেতন। সেই খাতির, কখনোই দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠেনি।
১৯৯৫ এর জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি, রোহিত ফিরলো, ইঞ্জিনিয়ারিং এর পরে কলকাতায় ছ’মাসের ট্রেইনিং শেষ করে। এই রূপসি কলোনিতে আসার পরে, এই প্রথম সে ছুটির মেজাজে। শীত আলগা হয়ে বসন্তের উষ্ণতা, বিকেলের হাওয়াটাকে মনোরম করেছে। সন্ধ্যার আকাশের আলোর আভা, কলোনি আর পার্কের গা মুছিয়ে শীল-তোরসা নদীর প্রান্তে বিলিন হয়। এই সময়টা পার্কে দু’পাক দৌড়ে আসতে বেশ লাগে। দেখতে দেখতে, সরস্বতী পুজোর প্যান্ডাল মাথা তুলে দাঁড়ালো পার্কের একদিকে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা মিলে, কাগজ কেটে মন্ডপ সাজাচ্ছে, নীচু স্বরে সাউন্ড-বক্সে মান্না দের গান বাজছে – সব মিলিয়ে ফুরফুরে আমেজ।
পুজোর দিন সন্ধ্যাবেলা মন্ডপে বিচিত্রানুষ্ঠানের তোড়-জোড়। তার পাশের চেয়ারে এসে বসলো চৈতি, খুব সহজ ঢঙে গল্প শুরু হল। কিছু সময় পরে চৈতি আলাপ করিয়ে দিল তার সঙ্গীনির সাথে – সে তার বৌদি। তাদের বাড়িতেই থাকে, বললো চৈতি।
“তা তো বটেই”, সায় দিল রোহিত।
” রোহিত বললো “বহুদিন পর কাঠি-আলুরদম ওয়ালাকে দেখছি, খাবি নাকি?”
“সে খেতে পারি, কিন্তু এই সিট কেউ নিয়ে নেবে যে এখন উঠলে”।
আমি তাহলে তিনটে নিয়ে আসছি” ,বলে রোহিত উঠে গেলো।
“তুই বেশ ছুটির মেজাজে আছিস, তাই নারে রোহিত?”, চৈতি বলতে থাকে, “আবার যাচ্ছিস কবে?”
“এখন কিছুদিন ছুটি কাটাই, তারপর নতুন চাকরি নেবো, ইচ্ছে ছিল মা-বাবাকে নিয়ে বেড়াতে যাবো, মা বলছেন এখন স্কুল ছুটি নেবেন না”, বললো রোহিত।
“তবে ঘরে বসে ছুটি কাটা”।
“সেটাতো ঠিক ছুটি হয় না, চেনা পথ-ঘাট, গাছপালা, লোকজন…..মনটা তো ছুট দিতে চাইছে” বলে হেসে ফেলে রোহিত।
” একটা কাজ কর..”বলে চৈতি, ” এক ছুটে মাথাভাঙায় ঘুরে আয় তিনটে দিন, সকালে বাস পেয়ে যাবি, এক্সপ্রেস বাস”।
“আমার আইডিয়া চাই নারে, সঙ্গী চাই”, একটু থেমে রোহিত আবার বললো, ” তুই যাবি?!”….
হঠাৎ একটা কেমন ঝাঁকুনি বোধ করে, সামলে নিয়ে, চৈতি বললো, “আগে কখনো বলিসনি তো!”…
“সবকিছুর একটা টাইমিং থাকে রে…”
“তোর বাড়ির লোক কী বলবে?”….
“তুই তোর বাড়িতে ইন্ফর্ম করবার জন্য আমার সাহায্য চাস কি?” জিগেস করে উঠে দাঁড়ালো রোহিত “বলিস কলেজের স্টুডেন্টদের নিয়ে এক্সকারশনে যাচ্ছিস, ফিরে এসে আমাদের বাড়িতে মাসীমাকে নিয়ে দেখা করতে আসিস”।
“ব্যাপারটা এরকম গল্প লেখার মত হালকা নয় রোহিত, সিরিয়াস!”
“পরশু বিকেল সাড়ে-চারটে, চালাকাঠা বাস টারমিনাসে দেখা হচ্ছে, প্রস্তাব অপছন্দ হলে, আসিস না”, বলে রোহিত চলে গেলো।
দু’দিন পরে, শুক্রবারে, বাস টার্মিনাসে নির্ধারিত “টাইমিং” মত, ছুট দিতে এলো রোহিত আর চৈতি।