ক্যাফে প্রবন্ধে রাইলী সেনগুপ্ত (পর্ব – ২)

মেঠোপথের সন্ধানে 

পর্ব – ২

|| লোক সাহিত্য ||

সাংস্কৃতিক উপকরণের সমৃদ্ধ ও সংহতি পূর্ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন যে সাহিত্য বাংলার হারিয়ে যাওয়া বা ক্রম অবলুপ্তি প্রায় সমাজের দর্পণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাকে লোকসাহিত্য বলা হয়। লোকসাহিত্যের নিজস্বতা ছড়া, ধাঁধা, কথা, পুরাণ, প্রবাদ ইত্যাদির মাধ্যমে বারংবার প্রকাশিত হয়। অপরদিকে লোকসংস্কার মানুষের গোঁড়ার কথাকে প্রকাশ করে।
অ.লোকছড়া:
কবিদের লেখনীর মাধ্যমে আধিপত্য সাধন হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (‘মেয়েলী ছড়া’ প্রবন্ধ), শ্রদ্ধেয় রামেন্দ্রসুন্দর,যোগীন্দ্রনাথ সরকার (‘খুকুমণির ছড়া’) প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা এই বিষয়ে আলোকপাত করেছিলেন। লোকো ছড়াকে তার স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কয়টি ভাগে বিভক্ত করা যায়-
ক. ঘুমপাড়ানি ছড়া:
ঘুমপাড়ানি ছড়া বা দোলনার ছড়া(cradle song) সাধারণত দোলনায় থাকা শিশুকে দোলের তালে ঘুম পাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। একই ছড়া অঞ্চল ভেদে ভিন্ন হয়। যেমন:
“ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি ঘুমের বাড়ি এসো”-ঢাকা
“ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি ঘুম দিয়ে যেও”-বর্ধমান
“ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি আমাদের বাড়ি এসো”-উত্তর ২৪ পরগনা
আবার শিশুর সাথে পক্ষী, প্রকৃতি সবকিছুর মেলবন্ধন ঘটেছে এই ছড়ার মাধ্যমে। এই ছড়ায় সুরের চেয়ে তালের প্রাধান্য বেশি।এই ছোড়া গুলিতে কখনো কখনো মাসি, পিসি, নিদ্রার অধিষ্ঠাত্রী দেবী,নিদ্রালী মায়ের কথা ব্যক্ত হয়।
খ. ছেলেভুলানো:
শিশুর ভোজন(“খোকা এল বেরিয়ে/ দুধ দাও গো জুড়িয়ে”), কান্না (কিসের লেগে কাঁদো খোকা, কিসের লেগে কাঁদো/কিবা নেই আমার ঘরে….”), শিশুর নাচ, অভিযান, খেলার ছলে বিয়ে ইত্যাদিতেএই ছোড়া লোকমুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। এমনকি শিশুর জন্মের সাথে পল্লীবাসীর অনুভবও ব্যক্ত হয় এর মাধ্যমে-
“নন্দের দুয়ারে আজ কি আনন্দ হইছে,
যশোমতী ভাগ্যবতী গোপাল কোলে পাইছে।”
গ. খেলা:
সুমন তার আনন্দ খুঁজে নেয় খেলার মাধ্যমে। খেলার গান লোকনাট্যের আদি উৎস বলে মনে করা হয়। এই গানে দৈহিক ক্রিয়া প্রাধান্য লাভ করে বহু ক্ষেত্রে ছড়ার অংশ গৌণ হয়।বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার তারতম্য লোক ছড়া হয়ে ওঠে স্বয়ং সমৃদ্ধ। পল্লী জীবনের জীবনধারার বর্ণনায় ব্যক্ত হয়েছে-
“আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে/ লাল মিরগেল ঘাঘর বাজে।।”
আবার, “আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে /ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে।”
আবার,” আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে, /ঢাঁই মিরগেল ঘাঘর বাঁজে।।”
আবার,”আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে/ডান মেকড়া ঘাঘর বাজে।।”
বর্তমানে লোকো ছড়া ইংরেজি ভাষার ব্যবহার লক্ষ্যনীয় (আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি/I come, ভাই Come তাড়াতাড়ি)
তাছাড়াও “ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি” যা পরিবর্তিত হয়েছে “ইকির মিকির চাম চিকিড়”। শুধু তাই নয়, হাডুডু, প্রশ্নোত্তর বাচক, বুড়ো বুড়ির ছড়া যা লোকমুখে বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রচলিত সঞ্চারিত হয়েছে।
ঘ. কন্যা:
বাস্তবধর্মী এই ছড়াগুলো মূল বিষয়টি নারীর জীবনের বাস্তবতা গার্হস্থ্য জীবন কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের স্থান কে প্রকাশ করা হয় এই ছড়ার মাধ্যমে। নারী-জীবনের আঙ্গিকে রচিত এই ছড়ায় পিতার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশিত হয়-
“বাবা কেন কাঁদ গো চালের বাতা ধ’রে/কাল যে বাবা মেরেছিলে চালের বাতা দিয়ে।।”
এইভাবে অধিবাস, কন্যাদান, কন্যা বিদায়, কন্যা আন, গুণবতী ভাই ইত্যাদি নারী জীবনের চিত্র অঙ্কিত হয় এই ছড়ার মাধ্যমে।
ঙ. পরিবার:
বাংলা পারিবারিক জীবনের রস ও রহস্য প্রকাশিত হয় এই ছড়ায়। অঞ্চলভেদে ইহা পরিবর্তিত হলেও পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক ও নির্ভরশীলতা এখানে প্রকাশ পায়। যেমন- মাসীর হৃদয়হীনতার প্রকাশ ঘটে:
“কিসের মাসি কিসের পিসি কিসের বৃন্দাবন,/আজ হতে জানিলাম মা বড় ধন”
কখনো জামাই সম্পর্কে বিদ্বেষ প্রকাশ পায়-
“কাপড় দিলাম জোড়ে জোড়ে কন্যা দিলাম দানে/তবু জামাই ভাত পেলনা কিসের অভিমানে”
এইভাবে বিভিন্ন পারিবারিক সম্পর্ক করার আঙ্গিকে প্রকাশিত হয় ‘মামা বাড়ি যাই’, ‘তবু জামাই ভাত খেলো না’, ‘গুণের ভাসুর’ ইত্যাদির কাহিনী।
চ. প্রাকৃত ও অতিপ্রাকৃত:
লোকসাহিত্যের একটি ধারায় পশুপাখির বর্ণনার আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়, যা প্রাকৃত ধারায় বর্তমান। যেমন:
“বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদী এলো বান।/ শিয়ালের বিয়ে হচ্ছে তিন কন্যে দান।।”
এক্ষেত্রে শিয়ালের মত ধূর্ত প্রাণী অধিকতর প্রাধান্য পেয়েছে। শিয়াল, বাঘ, টিয়া ময়না, মাছ প্রভৃতি প্রাণীদের বর্ণনায় প্রাকৃত এবং ঋতুকালীন উৎসব, ঐন্দ্রজালিক ছড়া বসুন্ধরার ভোগ, আম কুড়াবার ছড়া ইত্যাদি নিয়ে প্রকাশ হয় অতিপ্রাকৃত লোকছড়ার। কখনো নদী কে উদ্দেশ্য করে-
“নদী নদী কোথা যাও ,/বাপ ভাইয়ের বার্তা দাও।”
ইহা ব্যক্ত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে রচিত হয়।
ছ. সাহিত্যিক ছড়া:
কোন ব্যক্তি বা সমাজের সচেতন ধারায় সমৃদ্ধ না থেকে এই ছোড়া লৌকিক ছড়ার ভাব, ভাষা, রূপ, ছন্দ, অলঙ্কারে আবিষ্ট। কবি রবীন্দ্রনাথের ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থে এর নিদর্শন পাওয়া যায়।
সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতায় এর নিদর্শন সর্বজনবিদিত-
“এক যে ছিল মানুষ/নিত্য ওড়ায় ফানুস।”
সুনির্মল বসু,বুদ্ধদেব বসু, সুখলতা রাও, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিদের রচনা সাহিত্যিক ছড়াকে অনন্য মাত্রা প্রদান করেছে।
সবশেষে লোকমুখে প্রচলিত এই ছড়া বাংলা লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেখানে প্রোথিত আছে বাংলার লুপ্তপ্রায় শিকড়।
আ. লোক কথা:
বর্তমানে বাংলার বাইরের লোক কথার সমন্বয় কে পৃথক করা কঠিন হলেও বাংলা লোককথা একটি পৃথক স্থানে দাবি রাখে। এর মাধ্যমে ভাষার সর্বাপেক্ষা রক্ষণশীল রূপে প্রকাশ ঘটেছে। ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণে এর মূল অভিপ্রায় অক্ষুণ্ন থাকলেও বহির্গত ভাবে এর নানান পরিবর্তন ঘটে। বাংলায় বিভিন্ন গোষ্ঠী (শঙ্খ কুমার, রুমনা-ঝুমনা, নাগ সন্তান ইত্যাদি) থেকে নানান লোক কথা যেমন- অলৌকিক, ঐন্দ্রজালিক, ভুত-প্রেত, নিষ্ঠুরতা, নির্বুদ্ধিতা, চতুরতা, লোভী ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে।
ক. অলৌকিক জন্মকথা: অলৌকিক বিষয়বস্তু যেমন অপুত্রক রাজার পুত্র লাভ, সূর্য রশ্মির মাধ্যমে কুমারী কন্যা সন্তান লাভের মত কাহিনী এই বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা পরবর্তীতে রামায়ন-মহাভারতেও প্রকাশ পেয়েছে। ডালিমকুমার, পুষ্প মালা, ঘুমন্ত পুরী, মালঞ্চমালা দুধকুমার রূপ কুমার, সাত ভাই চম্পার মত কাহিনীতে লোককথা সমৃদ্ধ হয়েছে।
খ. ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া:
ইচ্ছামতী,কাঞ্চনমালা সোনার কাঠি, শিকড়ের গুণ ইত্যাদি কথায় এই ক্রিয়া প্রকাশ পায়। তন্ত্র শাস্ত্রের উপর প্রভাবিত হয়ে যাদুবিদ্যার প্রচলনও বিস্তার এর মূল বিষয়বস্তু।
গ. ভূত-প্রেতের কাহিনী:
জীবন-মৃত্যু, পরলোক- ইহলোক, মৃত্যুর পরের অশরীরী ইত্যাদি নানান ধারণা থেকে এই কাহিনি গড়ে ওঠে। ইউরোপে খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর পর থেকে এই বিশ্বাস হ্রাস পেলেও লোক সাহিত্যে এর প্রভাব রয়েছে।
বামুন ভূত, ভূতুরে ভূত ,প্রেত লোক ইত্যাদি নিয়ে গড়ে উঠেছে লোকসাহিত্যের এই ধারা।
ঘ. দৈব:
দৈব অর্থাৎ ত্রিনাথ, সুমতি, ব্রাহ্মণের দুঃখ, শনির দৃষ্টি উদ্ধার চন্ডী , দেবতার লোভ,নিদানের সাথী, বন্ধনমুক্তি, ব্রতের ফল ইত্যাদি প্রকাশ পায় দৈব কথায়। দেবতার অনুগ্রহ, নিগ্রহ, ব্রত কথার মাধ্যমে মানবিক আশা আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয় দৈব কথার দ্বারা। দৈব এবং অলৌকিকতার সঙ্গে লোক কথার মেলবন্ধন ঘটে এখানে।
ঙ. নিষ্ঠুরতা ও নির্বুদ্ধিতা:
সামাজিক-পারিবারিক জীবনের কিছু ব্যক্তিদের নিষ্ঠুর আচরণ নিয়ে নিষ্ঠুরতা এবং কৌতুক রস মিশ্রিত সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের চরিত্র অবলম্বনে নির্বুদ্ধিতার কথা বর্ণনা করা হয়।’যমুনা-ঝমুনা’,’উমনো-ঝুমনো’,’মাসির তাড়না’,’বিষ্ণুপদ’শীতকালে নিষ্ঠুরতার কথা এবং ‘মটকী’,’ছুতোরের খাট’, ‘তৃষ্ণার্ত আত্মা’,’বোকা ভূত’ ইত্যাদির মত নির্বুদ্ধিতার গল্প এই লোক কথায় প্রকাশ পায়।
চ. বিবিধ:
ঘটখালী, শিয়াল ঘটক, বুড়ির পরিত্রাণ ইত্যাদির মধ্যে চতুরতার কথা; বাছুরের মাংস, লোটন, বধূর লোভ, মাছের মুড়ো ইত্যাদির মতো লোভীর কথা এর অন্তর্গত।এই সকল লোক কথায় কখনো লোভকে চরিত্রের দোষ এবং পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র বধুর কাহিনী ব্যক্ত হয়-
“ছুবনে ছুবনে শ্বশুরা গো।/মুই তো শুসনাবতী।।”
তাছাড়াও দ্বিতীয় আর ফটোর মাধ্যমে ভাই ভগিনী, বন্ধুত্বের কথা এই লোককথার অন্তর্গত।
‘মঙ্গল কাব্য’-এর বিষয়বস্তু আলোচনা করলেও সেখানে স্ত্রী সমাজের দেব কথার চরিত্রকে পাওয়া যায়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনীতে এই লোককথা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। ‘কড়ি ও কোমল’ থেকে ‘মানসী’-এর যাত্রায় কবি বাংলার প্রকৃতির প্রতি স্পর্শকাতর হয়ে ওঠেন।
প্রকৃতপক্ষে, লোককথা জাতির মনস্তত্ত্ব অনুশীলনের সহায়তা করে। কাল ক্রমে, আঞ্চলিকভাবে অপরিবর্তিত হলেও এটিকে একটি ঐতিহ্যপূর্ণ রচনাশৈলী রূপে মূলত রূপকথা, উপকথার আঙ্গিকে ও বর্ণনা করা যায় যেখানে ভাস্বর থাকে বাংলার আদি প্রাণ।
ই.ধাঁধা:
বাংলা লোকসাহিত্যের তাৎপর্যমণ্ডিত অংশ ধাঁধা। রূপক,অলংকার, উপমার সাহায্যে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সাধন করতে সহায়তা করে ধাঁধা।আচার-আচরণ, কাহিনী, গাণিতিক,কাব্য ইত্যাদি নিয়ে ধাঁধা তৈরি হয়েছিল।
ক.নরনারী :নরনারীর জীবনকে কেন্দ্র করে জীবন রহস্য ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠনকে কেন্দ্র করে এই ধাঁধা রচিত হয়।
“চ্যাংড়া বেলা চার পাও/ জোয়ান হলে দুই পাও/ আর বুড়া হলে তিন পাও/কি কন দিনি?”(রাজসাহী)
খ.তৈজসপত্র:
যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের নির্দিষ্ট আকার আছে, তা দিয়েই এই ধাঁধা তৈরি হয়। যেমন:
“যে আনলো আমাকে এসে গেল ঘর/ তু যদি ধরবি মরবি তো মর?”-(বেলপাহাড়ী)
গ. পশুপাখি:
পশু পাখির আকৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে এই ধাঁধা রচিত হয়। যেমন : “বেকা লেজ /ভাঙ্গি দিতে বেড় পেঁচ”(কুকুর)
ঘ. গাছপালা:
গাছপালা ও ফুলের উপর নির্ভর করে এই ধাঁধা তৈরি হয়-
“সাজালে সাজে বাজালে বাজে /হেন ফুল ফুটিয়াছে দুনিয়ার মাঝে”
ঙ.আচার মূলক:
বিভিন্ন রীতি- আচার পালনের মাধ্যমে এই ধাঁধা প্রকাশিত হয়। যেমন- শ্বশুর জামাতাকে দেখে বলেন,
“কোথা থেকে এলেন মহাশয় আঙিনায় দিলেন পা/আঙিনা খানি ফেটে গেল জোড়াই দিয়ে ঘা”
চ. গ্রহ -নক্ষত্র, কাহিনীমূলক, গাণিতিক, কাব্য:
গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, কিছু ঘটনা,গণিত ও কাব্যচর্চা ইত্যাদি বিষয়ে নানা ধাঁধা বর্তমান। যেমন:
“জীব নয় জন্তু নয় জীবনে বাস করে।/জীবন বিহীন
হইলে যথা তথা মরে।।/জীবে যদি পরশে জীবন টানাটানি।/সত্য বল সেই কে সুন্দর গুণমণি”-কাব্য(জলের ফেনা)
ছ. কালিদাসের হেঁয়ালী:
কবি কালিদাস লৌকিক ও শৈল্পিক ধারায় ধাঁধা প্রণয়ন করেছিলেন, যা কালিদাসের হেঁয়ালি নামে পরিচিত। যেমন-
“বাঘও নয় ভাল্লুকও নয় /আস্ত মানুষ গিলে খায়।।”-জামা
ঈ. প্রবাদ:
লোক সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল প্রবাদ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত প্রকাশ যা সমাজ দ্বারা সমৃদ্ধ তাই হল এই প্রবাদ। ইহা সহজ-সরল, সুনির্দিষ্ট রূপে প্রকাশিত হয়। কখনো এর অর্থ বোঝানোর জন্য একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়। প্রবাদে কখনো কোনো নির্দিষ্ট জীবনের চিত্র প্রকাশ পায়। আবার প্রবাদাঙ্গ বা ক্ষুদ্র অনেক প্রবাদ নিয়ে একটি পূর্ণ প্রবাদ তৈরি হয়। নীতিবাক্য, সংস্কৃত শ্লোক ও বাংলা ভাষার, স্বাস্থ্য, রস বচন, প্রিয় বচন, খনার বচন,হিত বচন, কবীন্দ্র বচন, পুরাণের বচন,সূ বচন ইত্যাদি সব প্রবাদের অন্তর্গত।
ক. নীতিবাক্য: সমাজে কিভাবে চলা উচিত বা জীবন যাপন করা উচিত এই বিষয়কে নীতিবাক্য বলা হয়।যেমন-“ধর্মের জয় ,অধর্মের ক্ষয়”
খ. শব্দগুচ্ছ :পরিপূর্ণ বাক্য প্রয়োগ করে কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে প্রবাদ প্রকাশিত হয়। যেমন- ‘আদায়-কাঁচকলায়’, ,’আদুরে গোপাল’ ইত্যাদি।
গ.পারিবারিক : পিতা-মাতা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও এই প্রবাদ বলা হয়। যেমন- “চাপলে বোঝা,বাপের ঘাড়”
ঘ. স্বাস্থ্যের বচন: স্বাস্থ্য রক্ষার কৌশল এই প্রবাদের প্রকাশ পায়-“নিম নিসিন্দা যেথা,/রোগ থাকে না সেথা”
ঙ. পুরাণের বচন ও আইনের বচন: রামায়ণ-মহাভারতের মত কাহিনীর প্রেক্ষাপটে পুনঃনির্বাচন এবং আইনি ব্যাপারে সহায়তায় আইনের বচন প্রকাশ পায়।যেমন:
“টাকা টাকা কর তুমি মামলা কর নাই /বল বল কর তুমি রোগে পড় নাই।”
চ. জ্ঞানের বচন:এর মাধ্যমে কাউকে আক্রমণ না করে নিজের লব্ধ জ্ঞান কে প্রকাশ করা হয়-
“আশায় যে ভর করে,/ অনাহারে সেই মরে।”
ছ. বিবিধ: এছাড়াও সমাজের মঙ্গল কাজে হিত বচন, সদুক্তি বোঝাতে সুবচন, চাণক্য বচন, কবীন্দ্র , বৃদ্ধের বচন,ভবিষ্যতের বচন ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয় নানান প্রবাদ, যা লোক সাহিত্যের এক অনন্য ধারা।
উ. পুরাণ:
সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে নির্মিত অলৌকিক কাহিনী কে পুরাণ বলে। এর মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে আদিম ও লোকসমাজ। ঐক্য বিশ্বসৃষ্টি আদিবাসী সমাজ, কার্তিকের চির কৌমার্য ,ব্রত কথা,জীব- প্রকৃতি,ইত্যাদি সব নিয়েই গড়ে উঠেছে পুরাণ সাহিত্য।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জাতির মধ্যে ঐক্য দেখা যায় পুরাণের মাধ্যমে। আবার বুদ্ধির বিকাশের সাথে সাথে বিশ্বসৃষ্টির নানান কাহিনী প্রকাশ পায় পুরাণে।কখনো মৃত্যু-অমরত্ব, রাত-দিন ইত্যাদির বিভেদহীন ঘটনা প্রকাশিত হয়। এক একটি অঞ্চলে একএক রকম ভাবেই এই কাহিনী বর্ণনা করা হয়। জীব সৃষ্টি ও পূজার উপকরণ ও কখনো বলা হয় এর মাধ্যমে-
“মাটি মাটি সৃজন করিল কে/ ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ তিনে মাটি সৃজন করিল যে।”
তাছাড়া বিবাহ সংগীত, স্ত্রী আচার,পশুপাখির আকৃতি এবং ঊষা ও কার্তিকের কাহিনী ইত্যাদি এর অন্তর্গত।
||সংস্কার||
লোকাচারের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কখনো নানা অনিশ্চয়তা থেকেই নানা সংস্কারের সৃষ্টি হয়েছে।এই লোক সংস্কারগুলি নানাভাবে মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। যেমন- অরন্ধন, আইবুড়ো তেল, আইবড় নাড়ু, অগ্রহায়ণ সংস্কার,বিটলাহা, কাপড় কোটা, ব্যাঙের বিয়ে, ভর হাওয়া, নজর লাগা ইত্যাদি। এই ধরনের সংস্কারগুলো মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
অর্থাৎ লোকসাহিত্য ও লোক সংস্কার এক প্রাচীন ধারা। নগরায়নের যুগে এই ধারা প্রায় অবলুপ্ত হলেও এর মধ্যেই রয়েছে শিকড়ের টান ও সোঁদা মাটির গন্ধ।
ঋণ: বাংলার লোক-সাহিত্য
– শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।