গল্পে ঋত্বিক সেনগুপ্ত

কলকাতায় জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঋত্বিক সেনগুপ্ত, ছোট ভাই মৈনাকের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন বাবার চাকরির সুবাদে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেক্ট ঋত্বিক এবং স্ত্রী পর্ণা বাঙালিয়ানাকে ভালোবেসে ছুঁয়ে থাকেন দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কেও। শৈশব আর এখনকার কাজের খাতিরে খুঁজে পাওয়া দেশের বিভিন্ন স্বাদ গন্ধ মানুষের রীতিনীতির গল্প কল্পনার তুলিতে সাজিয়ে ঠাকুমার ঝুলির গল্পের মত পরিবেশন করেন ঋত্বিক। কখনও বা কবিতায় ও ফুটে ওঠে নষ্টালজিক বাংলা, বর্তমান আর অতীতকে মিলিয়ে মিশিয়ে। নবনালন্দার ছাত্র ঋত্বিক তাঁর সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে তুলে দিয়ে যেতে চান পুত্রকন্যা তিথি ও দেবের হাতে। তিনি বলেন, পাঠকদের মতামত জানতে পারলে ভালো লাগবে।

অদ্ভুতুড়ে

যেমন মনে পড়ছে, সেপ্টেম্বর ২০০৩ পার করে, অক্টোবর মাসের শুরু। রামপুরহাট স্টেশনে নামলাম সকাল ১০ টা নাগাদ। প্ল্যাটফর্মে নেমে উত্তরদিকে তাকালে, দেখা যাচ্ছে কিছুদূরে দুটো টিলা, ছোট পাহাড় বললে অসত্য হয়না। টিলা-দুটোরই পাদদেশে ছোট দুটো গ্রাম, কেউ যেন সবুজ রং দিয়ে লেপেছে – একটা গ্রামের অর্ধেকটা টিলার ছায়ায়। দেখে মনে পড়ে গেলো, রবিঠাকুরের পদ্য – “ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি, আছে আমাদের পাড়াখানি…”। প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন, স্টেশন-মাস্টারের ঘরের পেছনে, বেশ কয়েকটা উঁচু গাছ – তার মধ্যে গোটা তিনেক কদম-ফুলের গাছ – পাতাগুলোয় সকালের রোদের পালিশ – তখন ও কিছু ফুল রয়েছে গাছে। সব মিলিয়ে, মন-জোড়ানো দৃশ্য। ভাবলাম, এমন সুন্দর স্টেশন ছেড়ে লোকে ট্রেনে ওঠে কেন? বলেও ফেললাম আমার সহকর্মী, গোপালকে। হেসে বললো, “আপনিও তো এখন এই স্টেশন ছেড়ে যাবেন স্যার, আমাদের গাড়ি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে”। আমি বললাম, আমরা তো বোধহয় আরো সুন্দর লোকেশনে যাচ্ছি!
আমাদের গন্তব্য, দুমকা, ঝাড়খন্ড প্রদেশের অন্যতম শহর। তখনও কথা চলছে, দুমকা ঝাড়খন্ডের রাজধানী হলেও হতে পারে। রামপুরহাট থেকে, গাড়িতে দুই ঘন্টার রাস্তা, জাতীয় সড়ক ১১৪-১১৪এ ধরে। এমন বলা যায় , রাস্তার একদিকে ছোটনাগপুর প্লেটোর চারিত্রিক ভূপ্রাকৃতিক রূপ, আর বাঁদিকে থাকে-থাকে সাঁওতাল পরগনার সবুজের পরত্ – এমনকি পাথুরে ঢিপির উপরেও সবুজ শ্যাওলা, মখমলের চাদরের মতন। তুলনামূলকভাবে, ছোটনাগপুরের দৃশ্যপট, রাস্তার চেয়ে কিছু দূরে। আমাদের চালক শশী। বেশ মিশুকে, রাস্তার বিবরণ দিতে দিতে গাড়ি চালাচ্ছে। বললো, পথে দুটো ছোট টাউন পড়বে, হরিপুর ও লাঙ্গলভাঙ্গা – নাম শুনে বুঝলাম যে এই যায়গাগুলো বঙ্গভূমির সীমারেখার বেশ কাছাকাছি অবস্থিত। জানালো, দুমকা সংলগ্ন সাঁওতাল পল্লীতে, বছরের এই সময়, কার্মা উৎসব হয় – ভূত ও ভগবানের নাকি পর-পর পুজো হয়! আমরা যাচ্ছি ইউকো ব্যাংকের জোনাল অফিস। সেখানে কাজ সেড়ে, রাতটা দুমকার একটা গেস্টহাউসে থাকবো। আমার একটা ঝোঁক থাকে, যে কোন যায়গায় গেলে, সেখানটা একটু ঘুড়ে দেখা। তাই , রাত্রিবাসের আয়োজন। বাবা বলতেন, যে কোন যায়গায় গিয়ে, সেখানকার বাজারটা দেখলে, সেই যায়গা সম্পর্কে একটা ধারণা করা সহজ হয়। আমি শশীকে আমার সেই বাজার দেখার ইচ্ছার কথা, জানালাম।
বিকেল চারটে নাগাদ, কাজ শেষ করে বেড়িয়ে পড়লাম। আমরা গিয়ে পৌঁছলাম টিন্ বাজার। স্থানিয় মানুষ পসার সাজিয়ে বসেছে ছোট একটা রাস্তার একপারে। অন্য পারে দোকান, গায়ে-গায়ে। এই রাস্তাটা পশ্চিমমুখো হয়ে উত্তরে ত্যাড়ছা। সেদিকে সূয্যি ঢলে শালবনের মাথা ছুঁই-ছুঁই – silhouette এ দেখা যাচ্ছে রাস্তার কিছুদূরের বাঁশবন। এই বাজারে শাক-সবজি ছাড়া, বাঁশ-চেড়া কারিগরীর অনেক বাহারি পণ্য – টোকা-বাঁশি-ঝুড়ি-কুলো, এমনকি ফুলদানি। এছাড়া বাঁশপাতার তৈরী টেবলম্যাট। সব জিনিসেই, মানুষের গরজের ছোঁয়া, কল্পনার ছোঁয়া, সযত্ন স্পর্শের প্রকাশ। বাজারের সব ল্যাম্পপোস্টের গায়ে ছোট-ছোট শুকনো ফুলের মালা – আমার সহকর্মী গোপাল জানালো, এটা সাঁওতালদের উৎসবের মাস, তাই এই সাজ। যেটা আরো ভালো লাগলো, কোন মানুষকে কিছু জিগেস করলে, থেমে, সময় দিয়ে কথা বলছেন – মানুষের জন্য, মানুষের, সময় আছে!
আমরা গেস্টহাউস পৌঁছলাম,তখন সন্ধ্যা ছটা – আকাশে আলোর হালকা আভা থাকলেও গেস্টহাউসের বাউন্ডারি-ওয়ালের আলোগুলো বেশ জ্বল-জ্বল করছে। ঘরের জানলা দিয়ে দেখলাম ময়ূরাক্ষির পাড় দেখা যাচ্ছে – আবছয়াতে তাল-গাছের চুড়া। বাউন্ডারিওয়ালের ঠিক বাইরে একটা পুকুর – তার পাড় ঘিরে অনেক বড় গাছ। বেশ মন ভোলানো পরিবেশ। বাঙালি কেয়ারটেকার, স্বপনবাবু, একটু পরে এসে জানতে চাইলেন যে ‘মহুয়া’ বা সিগারেট আনাতে হবে কিনা। সন্ধ্যা সাতটা থেকে দোকান বন্ধ হতে শুরু করে, তারপর সাঁওতাল দোকানিরা যে যার পল্লীতে চলে যায় উৎসবের তোড়-জোড় চলে এই মাসটা। বললাম আমার শুধু সিগারেট আনলেই চলবে। বললো “রাতে ডাল-সব্জি-বনমুরগির ঝোল, চলবে তো?” বললাম আপনাদের কুক যদি লোকাল লোক হন তাহলে খুশী হব, তা নাহলে সেই রেলের মিলের মতন সব উপাচারে একই স্বাদ – স্বপনবাবু একটু হেসে জানালেন যে লোকাল কুক, এবং হাতযশ আছে। নৈশভোজ শেষে আমরা একটু ওয়াক-এ-মাইল করতে গেস্ট হাউস থেকে হেঁটে বেরোলাম – গেটে দারোয়ান বললো আমরা যেন পুকুরের দিকে না যাই, ওদিকে নাকি ভূত দেখা গেছে। আমরা হাসি চেপে বললাম এই সন্ধ্যা ন’টার সময়? হেসে বললো “নেহি সাব, অউর গেহরি রাতমে”। বেশ খানিকটা হেঁটে বড় রাস্তার পাশে, পুকুরটার ঘাটে সিমেন্ট বাঁধানো সীটে বসলাম আমি আর গোপাল। ঝিরিঝিরি হাওয়ায়, হাত দিয়ে কাপ করে সিগারেট ধরিয়ে, আমরা আবার গল্প শুরু করলাম। মাঝে মধ্যে টেম্পো বা অটো যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। কিছুক্ষণ পরে একটা রিক্সাভ্যান নিয়ে একটি যুবক এসে বসল, আমাদের থেকে হাত দশেক দূরে, আরেকটা সিমেন্ট বাঁধানো সীটে। গোপাল দেখে বললো গড়ন দেখে তো সাঁওতাল মনে হচ্ছে স্যার, তবে অনেক দূর থেকে আসছে মনে হয়, নাহলে এই অক্টোবর মাসটায় এই সময় ওরা বাইরে থাকেনা। খেয়াল করলাম ছেলেটা ঠায় পুকুরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে…..একটু পরে উঠে ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলো। আমি বললাম নিশ্চয় মাছ ধরবে –
গোপাল বললো, না, ওরা তো সন্ধ্যাবেলা মাছ ধরেনা স্যার! আমরা উঠে, একটু ঘাটের দিকে এগিয়ে দেখলাম, সাদা-কাপড় গায়ে, তন্বী একটি মহিলা ওই শেষ সিঁড়িটাতে দাঁড়িয়ে। আমি গোপালকে বললাম, চলো, ওদের প্রেমে বিঘ্ন ঘটিয়ে লাভ নেই। আমরা গেস্টহাউসের দিকে কয়েক পা এগিয়েছি, এমন সময় পুকুরে ঝুপ করে শব্দ শুনে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখি সেই সাঁওতাল ছেলেটি গুটি গুটি পায়ে, এসে, রিক্সা নিয়ে রওনা দিল। গোপাল আমার দিকে ফিরে বললো মেয়েটা কোথায় গেলো?
আমি বললাম, চলো প্রথমে গেস্টহাউসে গিয়ে রিপোর্ট করি।
গেটের কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন স্বপনবাবু, বললেন, “আপনারা কি পুকুর ধারে গেছিলেন স্যার” দারোয়ান মানা করেনি?”
আমি বললাম, মানা তো করেছে, কিন্তু একটা ঘটনা আপনাকে…..
আমার কথা শেষ হবার আগেই স্বপনবাবু বলে উঠলেন “আপনারা ওই পরান মান্ডিকে ডিস্টার্ব করেননি আশা করি”!
“আপনারা পুকুরের ঘাটে যাননি তো?”
আমরা বললাম “কেন?”
“স্যার গত বছর এই সময় , সাঁওতালদের ওই কার্মা উৎসবের দিন, ওই পরান মান্ডি এইখান দিয়ে রিক্সা নিয়ে যাওয়ার সময়, টেম্পোধাক্কা মেড়েছিল, আমাদের গেস্টহাউসের স্টাফ ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায়…কিছুদিন পরে পরাণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে…কিন্তু সেইদিন সন্ধ্যাবেলা খবর পেয়ে, ওর প্রেমিকা দুম্নি, এখানে আসে দৌড়াতে-দৌড়াতে, যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ওকে কেউ ভুল খবর দেয় যে পরাণ মারা গিয়েছে….দুম্নি সেই শুনে সোজা পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মারা যায়….ঠিক এইরকম সময়”।
আমরা বললাম, “আর পরাণ?”
স্বপনবাবু বললেন, “পরান সেই থেকে রোজ দুম্নির সাথে দেখা করতে আসে , দুম্নি জলে ঝাঁপ দিলে ও ঘরে ফিরে যায়।”
আমি বললাম, এমন হয় নাকি?
স্বপনবাবু বললেন, নিজেদের চোখে দেখলেন তো স্যার!!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।