গল্পে ঋত্বিক সেনগুপ্ত

কলকাতায় জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঋত্বিক সেনগুপ্ত, ছোট ভাই মৈনাকের সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন বাবার চাকরির সুবাদে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেক্ট ঋত্বিক এবং স্ত্রী পর্ণা বাঙালিয়ানাকে ভালোবেসে ছুঁয়ে থাকেন দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কেও। শৈশব আর এখনকার কাজের খাতিরে খুঁজে পাওয়া দেশের বিভিন্ন স্বাদ গন্ধ মানুষের রীতিনীতির গল্প কল্পনার তুলিতে সাজিয়ে ঠাকুমার ঝুলির গল্পের মত পরিবেশন করেন ঋত্বিক। কখনও বা কবিতায় ও ফুটে ওঠে নষ্টালজিক বাংলা, বর্তমান আর অতীতকে মিলিয়ে মিশিয়ে। নবনালন্দার ছাত্র ঋত্বিক তাঁর সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে তুলে দিয়ে যেতে চান পুত্রকন্যা তিথি ও দেবের হাতে। তিনি বলেন, পাঠকদের মতামত জানতে পারলে ভালো লাগবে।

অভয়ারণ্য

পরেশ রায়, রিটায়ার করেছেন ২০১৭ সালে। ৩১শে জানুয়ারি।
একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কের, উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক প্রধানের পদে কাটিয়েছেন, চাকরিজীবনের শেষ ছয়বছর। ওই কয়েক বছরের সংযোজনের মধ্যে, উল্লেখযোগ্য তার অভয়ারণ্যে বেড়াতে যাবার আসক্তি। কলকাতা থেকে, উত্তরবঙ্গে বদলি হবার পরে, বিভিন্ন সরকারি প্রজেক্টের অডিট করতে গিয়ে, তার প্রথম বনভ্রমণ। সেটা ছিল ২০১১, জুন মাস। দার্জিলিঙের সেন্চাল রিজার্ভ ফরেস্টের গেস্ট হাউসে ছিলেন, তার টীম নিয়ে – একটা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের ফন্ডিং-প্রাপ্ত প্রকল্পের, অডিট রিপোর্ট তৈরী করতে।
সেই প্রথম কোন ফরেস্ট গেস্টহাউসে দিন কাটিয়েছিলেন। এতই চিত্তাকর্ষক ছিল সেই অভিজ্ঞতা, সে’বছর ট্যুর থেকে ফিরে, এক সপ্তাহের মধ্যেই স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে, আবার তিনদিনের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন সেই সেন্চাল অভয়ারণ্যে।
তাঁর বেশ মনে আছে, স্ত্রী অনসুয়া, ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘তুমি কি বনের টানে ব্যাকুল, নাকি কোন বনদেবী?’, পরেশবাবু, মৃদু হেসে বলেছিলেন ক্রমশঃ প্রকাশ্য!
পরবর্তী বছরগুলোতে, এক এক করে , জলদাপাড়া, হলং, কাজিরাঙ্গা ও গুমতি ঘুরে এসেছেন। তাঁর স্ত্রী অনসুয়া দেবী, আবদার করেছিলেন, একবছর কলকাতা যাবার পথে, বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য হয়ে, কলকাতা যাবেন। পুজোর আগে গেলে, ওখানে একটা তাঁতের কাপড়ের হাট থেকে, কিছুটা পুজোর উপহারের কাপড় কিনে নিয়ে যাবেন। সেইমত, বছরের শুরুতেই, পরেশবাবু পরিকল্পনা করে রেখেছেন, এই বেথুয়াডহরি সফরের।
* * **
পাহাড়িয়া এক্সপ্রেস এসে নবদ্বীপ-ধাম স্টেশনে ঢুকল ভোর সাড়ে-পাঁচটায়। আধা-ঘন্টা লেট পৌঁছালেও এটাকে কোন রেলযাত্রী লেট আখ্যা দেয়না। পরেশবাবু একটাই মাত্র স্যুটকেস নিয়ে নেমে, আপার-ক্লাস ওয়েটিং রুমে ঢুকলেন। এখান থেকে লোকাল-ট্রেনে বেথুয়াডহরি – ট্রেন আসবে সাড়ে-ছটায়, কাটোয়া ফাস্ট প্যাসেঞ্জার, তারপর দশ মিনিটে পৌঁছে দেবে। ওয়েটিংরুমে স্যুটকেস রেখে, আবার প্ল্যাটফর্মে বেড়িয়ে এলেন পরেশ রায়, খুড়িতে করে চা-খাবেন বলে, আর তার সাথে পটল বিস্কুট বা নিমকি বিস্কুট। খুব প্রিয় ছিল অনসূয়া দেবীর। এই ট্রিপটা তার ইচ্ছা রাখতেই পরিকল্পনা করেছিলেন, তাই তার পছন্দের সবকিছু করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ পরেশবাবু।
এই এপ্রিল মাসে, তাঁর অবসরগ্রহণের ঠিক দশ সপ্তাহ পর, একদিনের রোগভোগের পর, হঠাৎ পরলোকে পাড়ি দিলেন ৺অনসুয়া রায়। হাসপাতালে যাওয়ার পথে পরেশবাবুকে বলেছিলেন, বেথুয়াডহরিতে “আমি না পারলেও তুমি যেও, সোমাকে বিয়ে দেবার পর থেকে, আমাদের কোথা ও যাওয়া হয়নি….”, পরেশবাবু একরকম জোড় করে স্মিত-হেসে বলেছিলেন, “সব হবে, একা কেন যাবো, দুজনেই যাবো”। উত্তরে অনসুয়া বলেছিলেন, “দু’জন হোক, একজন হোক, এবছরেই বেড়াতে যাবো”। তারপর হাসপাতালে পৌঁছে অবধি আর কোন কথার সুযোগ হয়নি। পরদিন ভোরবেলায় পরেশবাবুর হাত ধরে একবার চোখ মেলে আশেপাশে তাকিয়েছিলেন শুধু। সেই চাহনি এখনো স্পষ্ট ভাসে, চোখ বুজলেই – তাঁর দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র ক্লেশের ছাপ ছিলনা!
প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের সিটে বসে বসে সেই পুরোন-ভাবনায় হারিয়ে গিয়েছিলেন পরেশবাবু। “বাবু চা-টা নিন” বলে ডাক দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে একটা বাচ্চা ছেলে – চায়ের ভাঁড় আর একটা কাগজের ঠোঙায় দুটো নিমকি বিস্কুট হাতে। প্ল্যাটফর্মের টিনের চালে, একটানা ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ – এতভোরে, যাত্রীও বেশ কম। হাওয়াতে একটা ঠান্ডা ভাব – অনসুয়ার চিন্তাটা কেমন যেন একমাত্র পরিচিত সঙ্গ। ভাবতে ভাবতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। স্টেশনে ট্রেনের আগাম ঘোষণায়, তন্দ্রা কাটলো।
ঠিক সাতটার সময়, বেথুয়াডহরি স্টেশনের বাইরে গেস্ট-হাউসের গাড়ি এসে দাঁড়ালো, উঠে বসলেন পরেশবাবু। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, চারিদিক যেন খানিক অন্ধকার। ড্রাইভার জানালো, গতকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টি হয়ে চলেছে। গেস্টহাইসে পৌঁছতেই, ম্যানেজার খানিক উপদেশের স্বরে বললেন, “স্যার, বলছিলাম এইরকম আবহাওয়ায় আগে আপনারা গরমজলে স্নান সেড়ে নিন, তাহলে শরীরটা মজবুত থাকবে, দীর্ঘপথ এসেছেন!”
চাবিটা হাতে নিয়ে, পরেশবাবু বললেন, “আসলে, ম্যাডাম আজ আসতে পারলেন না”, বলে, দোতলার সিঁড়ি ধরে রুমে চলে গেলেন। রুমের দরজার উপরে লেখা ‘দোয়েল’। সাথের রুম-বয় বলল, এখানে পাখির নাম দিয়ে সব ঘর চেনা যায়, কোন নম্বর নেই রুমের। ঘরে ঢুকেই উল্টোদিকের দেয়ালের মাঝ বরাবর বড় কাঁচের জানালা, বাইরে বনের মাথায় ঘনমেঘে ঢাকা। জানলার খুব কাছে , একপাশে কোন একটা গাছের ডালে একটা মাছরাঙা বসে ঝিমিয়ে আছে যেন – বহুবছর এত কাছ থেকে মাছরাঙা দেখেননি বলে জানলার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন পরেশ রায়। ঘরের সব সুইচ ও এক কোনে রাখা টেলিফোন দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল রুম-বয়।
* * **
স্নান সেড়ে এসে চশমাটা চোখে লাগিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে দেখলেন ভরা বর্ষার মনোরম রূপ। গেস্টহাউসের অদূরে গাছের ফাঁকে একটা শাপলা-বিল,তার পাড়ে গায়ে-গা লাগিয়ে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে সেগুন গাছ। শিকেয় ঝোলানো লেপ-কম্বলের মতন, সেই গাছের মাথা ছুঁয়ে মেঘ-পুঞ্জ। গাছগুলো যেন ওই বিলে পা চুবিয়ে একে অপরের গায়ে হেলে রয়েছে। একস্বরে, কাছেই কোথা ব্যঙের ডাক নৈঃশব্দটাকে আরো গভীর করেছে। সব মিলিয়ে সকালটা যেন এই জানলার উপর গা এলিয়ে দিয়েছে।
পরেশবাবু খোলা গলায় গেয়ে উঠলেন, “কখন বাদল ছোঁয়া লেগে….”। তারপর, অনুভব করলেন ভারি হাওয়ায় চোখ টেনে আসছে – তাই ফোন তুলে ব্রেকফাস্ট দিতে বললেন। জানলার পাশে রাখা আরাম কেদারাটা মেলে, জানলার ধারে বসে আবার গাইতে শুরু করলেন, “মাঠে মাঠে ঢাকে মাটি, সবুজ মেঘে মেঘে…ওদের দোল দেখে আজ প্রানে আমার দোলা ওঠে লেগে”।
হঠাৎ চোখ খুলে দেখলেন রুম-বয় হাতে ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে কেমন অভিভুত হয়ে বলল “স্যার! বড্ড ভালো গাইলেন, আমার খুব ভালো লাগলো, আমি কাজ সেড়ে রাতে একবার আপনার গান শুনতে আসতে পারি?”
খানিক অপ্রস্তুত হয়ে, স্মিত হেসে, পরেশবাবু বললেন “আসিস।”
ছেলেটি চলে গেলে, ঘরের দরজা বন্ধ করে, আবার জানলার পাশে আরাম-কেদারাটাতে বসে চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলেন। মনে মনে ভাবলেন, শুধু অনসুয়া এখানে থাকলে গান গেয়ে উপভোগ করতে পারতেন প্রকৃতির এই প্রাচুর্য। চা শেষ করে আকাশের দিকে চাইতেই, যেন বর্ষার হাওয়ায় চোখ জুড়িয়ে এলো। আজকাল কেমন চোখ টেনে এলেও ঘুম হয়না, দেখতে দেখতে চার মাস অতিক্রান্ত! দিন কাটতে চায়না, কিন্তু কোথা থেকে একাকিত্বের চার-চারটে মাস অতিক্রান্ত! ভাবছেন, এখানে এলাম কি অনসুয়ার ভাবনায় সঙ্গ পেতে, নাকি হাঁফ ছাড়তে?
মনে হল একা থাকতেই ইচ্ছে করছে যেন। মোবাইল ফোনটা সাইলেন্ট করে দিয়ে , মেয়ে সোমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিলেন “নিরাপদে পৌঁছেছি, এখন ব্রেকফাস্ট করে বিশ্রাম করব, বিকেলে কল করিস”।
* * **
অনেকদিন পর আবার এমন অবসর।
মাথার উপর সিলিং ফ্যানটা একটানা হালকা গোঙানির শব্দ করে ঘুরে চলেছে।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর ব্যঙের ডাক মিলে কেমন যেন সারিগান বেঁধেছে।
বাইরে যেই ডালটাতে মাছরাঙা ছিল, তার উপর দুটো গঙ্গা ফড়িং গুঁটি-গুঁটি একে অপরের দিকে এগোচ্ছে – যেন সন্ধ্যার আবছায়ার আড়ালে সাক্ষাত করতে এসেছে।
আলো কমে এসেছে, ভিজে হাওয়াটা মাঝে মাঝে গা-জুড়িয়ে দিচ্ছে। একাত্মে, পরেশবাবু কী যেন ভাবছিলেন, যখন, অনসুয়া দেবী বলে উঠলেন, “তুমি রিটায়ার না করলে এমন অলস ছুটি হত না”।
“ঠিকই,” বললেন পরেশবাবু, “তুমি লোকেশনটা ভালো সিলেক্ট করেছ”।
“হ্যাঁ, আর বর্ষাকাল বলে কোথাও ঘুরতে যাবার প্রয়োজন নেই, ঘরে বসে, পাশাপাশি বসে গল্প পড়ব, আর ফাঁকে ফাঁকে চা খাবো”।
” মাঝে মধ্যে সেই আগের মতন, একটু মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দাও, অনু”!
“ঠিক আছে দিচ্ছি, চোখ বুজে থাকো”, বললেন অনসুয়া।
“বাইরে পাখিগুলো কেমন পাশাপাশি বসে চুপ করে আছে, কোন কাজ নেই যেন, আমাদের মতন হবে…ওদের ও হয়তো বাচ্চারা বড় হয়ে দূরে চলে গেছে”।
অনসুয়া বললেন, ” বর্ষাকালটা বোধহয় প্রৌঢ়দের বেশী আরাম দেয়, এটা যেন আমাদের ছায়াকুঁজ”।
পরেশবাবু বললেন, ” আগে বেড়াতে গেলে মনে আছে, বৃষ্টি পড়লে মনে হত সময় নষ্ট হচ্ছে, নিজেরা অধৈর্য্য হয়ে কথা কাটাকাটি করতাম, আর সোমা বলত ‘তোমরা ঝগড়া করলে কি বৃষ্টি থামবে?’, আর এখন মনে হচ্ছে ভালোই তো, চুপচাপ পাশে বসার একটু অবকাশ”!
“এটা স্বাভাবিক, আমার মনে হয় সন্ধ্যের সময় যেমন ধীর গতিটা মানানসই, তেমন বয়স বাড়লে, এমন নিস্ক্রিয় সঙ্গ পাওয়াটা, অনেক বড় প্রাপ্তি ।”
পরেশবাবু বললেন, “ঠিক বলেছ, তোমার মনে আছে, সোমার বিয়ের পড়ে, তুমি একবার লোডশেডিংয়ের সময় বলেছিলে, আলোটা একটু পরে জ্বালিও, অন্ধকারে, কিছুটা সময় কথা বলি, কথা শেষ করবার তাড়া থাকবে না, কোন কাজ করবার তাগিদ থাকবে না, শুধু আমরা দুজন ঘরে বসে আছি, এইটুকু টের পাবো, সময়টা জুড়ে সঙ্গ পাওয়ায় থমকে থাকি!”
অনসুয়া বললেন, “মনে আছে, কিন্তু সেদিন তো বলেছিলে ‘কোন মানে হয় না'”!
“আসলে কি জানো অনু,” পরেশবাবু বললেন,।”তখন ও রিটায়ার করিনি বলে, উপলব্ধি করিনি, এই বয়সটা আসলে আবার অকারণ কাছে বসার!”
“আরেক কাপ চা হলে কেমন হয়, অনু?”, “কি হল চুপ করে আছো -“, বলে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল পরেশবাবুর। ফাঁকা ঘরের দিকে তাকিয়ে চোখ ভিজে হয়ে উঠল।
খানিকটা সম্বিত ফিরে পেয়ে, মোবাইলটা হাতে তুলে দেখলেন দুপুর সাড়ে-বাড়োটা। মোবাইল চেক করে দেখলেন কোন মিসড্ কল আছে কিনা – নেই।
বাইরে বৃষ্টি একটানা।
গান গাইতে ইচ্ছে করছেনা।
মোবাইলে ইউ টিউব খুলে জর্জ বিশ্বাসের গান চালালেন পরেশবাবু – “আজ কিছুতেই যায়না মনের ভার….”।
বাস্পে, আর হিমেল হাওয়ায়, দেখলেন জানলার কাঁচ ঝাপসা হয়ে উঠেছে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।