গল্পে রাশেদ রেহমান

বজ্রপাত
শেষ ফাগুনের বাসন্তী সন্ধ্যা। দখিনা হাওয়ায় জুঁই, শিমুল আর পলাশের সুরভী সৌরভে মুখরিত প্রশান্তির আবেশ চারপাশে। বিকেলে আচমকা ঝড়ো হাওয়ার সাথে কয়েক দফা বৃষ্টি হওয়াতে মাটির গর্ত থেকে বেড়িয়ে আসা বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙের প্রণয়ের উচ্ছ্বসিত আহ্বানে প্রমত্ত প্রকৃতি। ঝিঁঝি পোকার মাধুরী মেশানো বিরামহীন সুর আর জোনাকির নিভু নিভু আলোয় প্রাণবন্ত রাত। দূরের বাঁশ ঝাড়ে নিশিজাগ্রত পাখিদের সমন্বিত কলধ্বনিতে বুঝলাম, রাতের প্রথম প্রহর শেষ হতে চলেছে। তারাভরা রাতের আকাশে অপরিপক্ক আধখানা চাঁদ সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁধার সরিয়ে জোছনায় ভরিয়ে পৃথিবীকে প্রজ্জ্বলিত রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত। অবশেষে রাত্রির ঘন অন্ধকারের কাছে পরাজিত আধখানা চাঁদ অভিমানে অতল গহিনে নিমজ্জিত হয়ে যায়। অন্ধকার আরো ঘনীভূত হতে থাকে। দূরের মাইকে গানের সুর ভেসে আসছে। (একদিন..স্বপ্নের.. দিন বেদনার বর্ণবিহীন…)।
তারাকান্দির লোকাল রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত বেঞ্চিতে বসে মধ্যরাতের চট্টগ্রামগামী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমি আর আমার ছোট মামা। ঘুমের তাড়নায় মামা বেঞ্চিতে বসেই ঝিমুচ্ছিল আর নাক ডাকছিল। হঠাৎ বে-সুরে সাইরেন বাজিয়ে বিকট শব্দ করতে করতে রেলস্টেশনে ট্রেনটি ঢুকে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা তড়িঘড়ি করে ব্যাগপত্র নিয়ে একটি কামরায় উঠে পড়ি। মন্থর গতিতে ছন্দ তুলে চলতে থাকে ট্রেন। জানালার পাশে বসে আলো আঁধারির ধূসরতার মাঝে অবলোকন করতে থাকি ঘুমন্ত শহর, নগর ও গ্রাম গুলির সৌন্দর্যকে। হঠাৎ বিজলী খেলে গেল চোখেমুখে, বাহিরে তাকাতেই দেখি সহস্রকোটি তারকারাজির মিটি মিট আলো ম্লান করে দিয়ে আকাশ ছেঁয়ে গেছে মেঘে। মেঘের গর্জন আর বিজলীর আলোর ঝলকানিতে প্রকৃতির বিরুপ রূপ দেখে ঘাবড়ে যাই। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয় প্রবল ঝড় ও প্রচণ্ড ঝাপটাসহ ভয়ানক শিলাবৃষ্টি। আকস্মিক অপ্রত্যাশিত ঝড়ের কারণে জামালপুর স্টেশনেই ট্রেনকে আটকে দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। প্রায় দুই ঘন্টা ধরে চলতে থাকে প্রলয়ংকরী ঝড় ও বিরামহীন বৃষ্টি। স্টেশনে নীড়হারা উদ্বাস্তু মানুষ ও হকাররা অবস্থা বেগতিক দেখে দণ্ডায়মান ট্রেনের ভিতরে এসে অবস্থান নেয়। শেষমেষ স্টেশনের আশে পাশে ঘুর ঘুর করা নিশিকন্যারা ক্ষুধার পেটে লাথি মেরে প্রকৃতির বিকারগ্রস্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে প্রাণপণ যুদ্ধ করে কাকভেজা হয়ে ট্রেনের কামরাগুলোত ঠাসাঠাসি করে কোন মতে মাথা গোঁজে। ‘কত বিচিত্রই না এই পৃথিবী আর বৈচিত্র্যময় স্রষ্টার সকল সৃষ্টি।’ ঝড়ের মধ্যেই ফজরের আজানের সুর ভেসে আসছিল। যখন ঝড় থামল; ততক্ষণে পূর্বাকাশে ভোরের সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে সারা পৃথিবী। ঝড়ের কারণে রেল লাইনের ওপর গাছপালা উপড়ে পড়ায় মোট চার ঘন্টা বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। তখন রেল লাইনের দু’ধারসহ আশে পাশে গ্রামগুলিতে চালহীন উলঙ্গ ঘর-বাড়ি, লণ্ড-ভণ্ড গাছ-গাছালি সদ্য সন্তান প্রসবকারিণী বিমর্ষ মাতার মতো বেদনায় বিদগ্ধ প্রকৃতি। নীড় হারা মানুষের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী। প্রকৃতির এহেন আচরণে ভাবনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাই। কয়েক ঘণ্টা আগেই কত সুন্দর ছিল সব কিছু অথচ সামান্য সময়ের ব্যবধানে প্রকৃতি ক্ষোভে অভিমানে তছনছ করে দিল আপন স্নেহধন্য ধরণীকে। এসব ভাবতেই অজানা এক শংকায় বুকের ভেতরটা নাড়া দিয়ে ওঠে। মুহূর্তেই আপন অস্তিত্বে মনোনিবেশ করি নিজেকে। আমি অধরাকে খুব ভালবাসি; এককথায় ওর জন্য জীবনও দিতে প্রস্তুত। ও খুব অভিমানী মেয়ে এবং ভীষণ জেদী। একটু পান থেকে চুন খসলেই একমাস পর্যন্ত কথা বলতো না। অথচ অষ্টম শ্রেণিতে যখন পড়ি, মানে কৈশোরে পদার্পণ করি তখন থেকে ওর সাথে আমার প্রেম। অধরার মা, সুমী খালা আমার নানীর পেটমুছা মেয়ে। খালুজান ব্যাংক কর্মকর্তা, তাই চাকুরিগত কারণে সুমী খালাকে খালুর সাথে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে হয়েছে। তাই অধরাকে শিশু শ্রেণি থেকে এইচএসসি পাশ পর্যন্ত নানা বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করতে হয়েছে। গত বছর খালুজান চট্টগ্রামে জমি কিনে বাড়ি করার পর থেকেই অধরা বাবা-মা’র কাছে থাকছে। অধরা আমার জীবনের এক অধরা স্বপ্ন। আমার সর্ব সত্তায় যার অস্তিত্ব বিরাজমান। অধরার চাঁদ মুখখানি দেখি না দীর্ঘ আটটি মাস। ফোনে অবশ্য প্রতিদিনই কথা হয়; আশা ভালবাসার কথা, স্বপ্ন দেখা, ঘর বাঁধার কথা। দুই পরিবার একত্রিত হয়ে ঠিক করে রেখেছে গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট হওয়ার পর অধরার সাথে আমার বিয়ে। পারিবারিক সম্মতিটা ছিল আমাদের জন্য ভালবাসার সনদপত্র স্বরূপ। অধরা কে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য গতকাল থেকে ফোন বন্ধ রেখেছি। রওনা দেওয়ার সময় মামা বলেছিল অধরাকে একটা ফোন করলে হয় না? সবাইকে সারপ্রাইজ দিব বলে মামাকে চুপ থাকতে অনুরোধ করলে, মামা যথারীতি নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে। হঠাৎ দেখলাম ট্রেন থেমে গেছে; মামাকে জিজ্ঞেস করলাম মামা এটা কোন জায়গা? প্রত্যুত্তরে মামা জানাল আখাউড়া জংশন; এখানে ইঞ্জিন চেঞ্জ হবে।
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ তাই কোন ভূমিকা না করে মামাকে বললাম ভাত খাব। কারণ এরই মধ্যে মামা দু’টো বিশ টাকা দামের ফ্যামিলি সাইজ পাউরুটি ও চারটি সাগর কলা অনায়াসে গলাধঃকরণ করেছেন। তাই কোন উপায়ন্তর না দেখে মামা বলল, খেয়ে তাড়াতাড়ি আসিস-। ট্রেন কতক্ষণ দাঁড়াবে তার ঠিক নেই। পঞ্চাশ টাকা অগ্রিম জমা দিয়ে হোটেলে খেতে বসতে হয়। অপরিচ্ছন্ন ছোট খাটো জরাজীর্ণ হোটেলে অগত্যা খেতে বসলাম। খাবার পরিবেশনের জন্য মালিকসহ মোট তিনজন কর্মচারী। মাছির ভন ভন শব্দ আর সাউন্ড বক্সে উচ্চস্বরে বাজছিল শাহ্ আব্দুল করিমের বিখ্যাত গান ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…..আমরা। খাওয়া শুরু হওয়ার সাথে সাথে মালিকসহ কর্মচারীরা চিল্লাতে শুরু করে দিল এই ট্রেন গেল- এই ট্রেন গেল। সবাই হাতের ভাত ঝেড়ে দৌড়। আমি মাছের মাথাসহ বাটির ঝোলগুলি ভাতের প্লে¬টে ঢেলে নিয়ে, ডান হাতে ভাতের প্লেট আর বাম হাতে পানির গ্লাস নিয়ে ঘণ্টায় ষোল’শ মিটার বেগে দৌড়ে ট্রেনের বগিতে গিয়ে উঠলাম। একজন কর্মচারী অবশ্য আমার পিছু নিয়েছিল, ট্রেনের চেকার তাকে থামিয়ে দিয়েছে। দৌড়ের সময় গ্লাসের সব পানি পড়ে যাওয়ায় পানি ছাড়াই সিটে বসে ভাতগুলো উদরপূর্তি করছিলাম। কামরার যাত্রিরা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আমার মায়ের চার বোনের একমাত্র ভাই আর নানীর একমাত্র ‘আলালের ঘরের দুলাল’ মামা অসহায়ের মত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল আমার কর্মকাণ্ড; কিন্তু কিছুই করার ছিল না আমার। কারণ পেটে আমার প্রচণ্ড খিদে তাই গোগ্রাসে ভাতগুলো খেয়ে ফেললাম।
অতি কষ্টে মধ্যাহ্নের ভুড়িভোজন সম্পন্ন করে সময়টা অনুধাবন করার জন্য মুঠোফোন চালু করতেই রিংটোন বেঁজে উঠল। জানি একদিন আমি চলে যাবো সবই……। ফোন নাম্বার আমার মায়ের হওয়াতে বুঝলাম মা টেনশনে আছে, তাই রিসিভ করলাম মা কাঁপা কণ্ঠে বলল তোরা এখন কোথায়? ফোনটা বন্ধ রেখেছিস কেন? আমরাও চট্টগ্রাম যাচ্ছি। এক সাথে মায়ের অতোগুলি প্রশ্নে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়; উত্তরে শুধু বলেছি এইমাত্র আখাউড়া পার হলাম। মা ফোনটা কাটতেই রাজ্যের সহস্র প্রশ্ন আমায় তাড়া করছিল। মা কেন চট্টগ্রাম যাচ্ছে! খালার কোন সমস্যা হলো? না আমাদের বিয়ে? না অধরার কিছু হল? কেন ফোনটা বন্ধ রাখলাম, সব প্রশ্নের অনুচ্চারিত উত্তরগুলোই আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সারাক্ষণ প্রতিটি মুহূর্ত। এমনিতেই পুরোরাস্তা ফকির মিসকিন আর হকারদের চেঁচামেচিতে মাথা ঝিমঝিম করছিল। কুমিল্লা পার হবার পর দিগন্তময় ফসলি জমি ভেদ করে দ্রুত চলছিল ট্রেন। দিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটা তেজস্বী রশ্মিগুলো গুটিয়ে বিশ্রামের সংকেত স্বরূপ রক্তবর্ণ রূপ ধারণ করছে। পরিশ্রান্ত পাখির দল নীড়ে ফেরার প্রত্যয়ে উন্মুখ হয়ে ছুটে চলেছে। নিশাচর পাখিরাও আহারের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েছে ইতোমধ্যেই। ফেনী শহর পিছনে ফেলে “চির উন্নত মম শির” পাহাড়ের পাদদেশে, সেনা অফিসার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিএম ক্যান্ট.) সংলগ্ন ভাটিয়ারী স্টেশনে যখন ট্রেন থামল, তখন রাত দশটা। ব্যাগপত্র আমার কাছে রেখে মামা রিক্সার জন্য ছুটোছুটি করছিল। একটু দূরে একজন বাঁশিওয়ালা সু-মধুর সুরে সুরে পথিকদের আকৃষ্ট করে বাঁশি বিক্রি করছিল। বাঁশিতে বাজছিল ‘তোমাকে হারাতে যদি হয় মনে লাগে এই ভয়…..।’ বাঁশির মর্মস্পর্শী সুর ও হৃদয়ভাঙ্গা শব্দগুলি থেকে বাড়তি দুঃশ্চিন্তার কালোমেঘ জমে জমে আমার স্বপ্নময় ভবিষ্যতের নীলাভ আকাশে কালবৈশাখীর অশনিসংকেত হানা দিচ্ছিল। মুহূর্তেই বুঝি সবকিছু ওলটপালট করে দিবে। মামা ধমক দিয়ে বলল কিরে গম্ভীর হয়ে কি ভাবছিস? ‘ও’ বাঁশি শুনে বাদুলী চাচার কথা মনে পড়েছে। চাচা কি মায়াবী সুরে বাঁশি বাজাতো-। শুনেছি তার বাঁশি শুনে অমাবস্যার রাতে নাকি পরীরাও নাচতে চলে আসতো। আর পুঁথি পাঠেও পুরোগ্রাম মাতাতো ঐ একজনই। করিরাজ পাড়ায় থিয়েটার হতো। কত রকম গান বাজনা হতো রূপবান যাত্রা, নসিমন, বেহুলা লক্ষিন্দরের কিচ্ছা। মামা কথা কেড়ে নিয়ে বলল, একরাতে তুই আর অধরা চুরি করে মহুয়া ও নইদার চাঁদের পালা শুনতে গিয়ে তোর বাপের কাছে ধরা পড়ে খুব মার খেয়েছিলি। সে কথা মনে পড়ে তোর?
মামা- তুমি চুপ করবে..। এমনিতে দুই দিন ধরে জার্নি করছি, তারপরও তুমি বক বক করে রামের জারি গেয়ে যাচ্ছ! খিদে পেটে এতো কথা আসে কোত্থেকে। আমার রাগান্বিত কন্ঠের অমিষ্ট বাণী শুনে মামা নিরাশ হয়ে চুপসে যায়। যখন রিক্সা নিয়ে অধরাদের বাড়ির নিকটবর্তী হলাম, তখন দেখলাম দলে দলে লোকজন ওদের বাড়ি থেকে বিভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। রিক্সা থেকে নেমে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিলো ব্যাংকার সাহেবের একমাত্র মেয়েটা গতরাতে ঝড়ের সময় বজ্রপাতে মারা গেছে…।