গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

রিফিউজি

ছেলেটা ঘন্টার পর ঘন্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, নিজের মনেই বিরবির করে কথা বলে,মাঝরাতে চিৎকার করে ওঠে!সবাই ওকে পাগল বলে।
ওর মা জানে ও পাগল না।
এই দ্বীপে আসার আগে ও খুব ভাল ছাত্র ছিল। চোখের সামনে দেখেছে কি ভাবে দিনের পর দিন অত্যাচারীত হয়েছে ওর পরিবার। কোনো রকমে মা আর ছেলে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছে এক অজানা দ্বীপে যেখানে জোয়ার-ভাটার খেলা প্রতিনিয়ত। প্রকৃতির সাথে লড়াই—কে জিতবে মানুষ না প্রকৃতি।

ছোট্টো একটা দ্বীপে ঠাসাঠাসি করে একগাদা মানুষ বেঁচে থাকার লড়াই করে চলেছে। ওরা রিফিউজি।কেউ ধর্মের শিকার, কেউ জাতপাতের তো কেউ চামড়ার রঙে।আজ এরা সবাই বিতাড়িত। ঠিকানা এই কুহকিনী দ্বীপ। মা আর ছেলে এই দ্বীপে এসেই উঠেছে।অসহায় মা এর শেষ ভরসা ছেলে রোহন।

শীতে গাছের শেষ পাতাটাও ঝরে গেছে। মানুষগুলোর শীতের জামা-কাপড় নেই।হাড় কাঁপান শীত,স্যাঁতস্যেতে কাঠ জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতা পাওয়ার চেষ্টায় সবাই যখন ব্যস্ত রোহন তখন একলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলে চলছে। ওর মা পিঠে হাত রাখতেই চমকে ওঠে!
মা-“ এখানে একা কি করছিস?”
—প্রশ্ন
—কাকে
— ঈশ্বর,আল্লা,গড কে
—আবার শুরু করলি?
—তুমি তো বলো দারিদ্রতা নাকি ভগবানের অভিশাপ,ঐ নদীটার দিকে তাকাও দেখছো কতগুলো ছোটো ছোটো রক্তাক্ত হাত!ওরা সিরিয়ার, ওদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে চলন্ত রাইফেলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।ওই হাতগুলো ইউরোপের, ওইগুলো আমেরিকার, ওটা লন্ডনের- ওদের কাউকে চলন্ত ট্রাকের চাকার তলায় পিসে, কাউকে এলোপাথারি গুলি করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ওরা কি পাপ করেছিল মা?
—চুপ কর! আয় আমার কাছে
—মা,যারা আমাদের নিরাশ্রয় করেছে, দু-মুঠো খাবার ছিনিয়ে নিয়েছে, জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছি তাদের কি শাস্তি জানো?
—না
—ওই দেখো আকাশে, সে আসছে দূরন্ত গতিতে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে। সামান্য একটু ধাক্কাতেই চূর্ণ হয়ে যাবে এই লোভি মানুষ গুলোর অহংকার। ধ্বংসস্তূপে পোড়া পৃথিবীতে তৃষ্ণার্ত, ক্ষুদার্থ ওরাও হবে। এ কালের শেষ রিফিউজি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।