গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

এ কোন সকাল

সদ্য অবসর নিয়েছেন অরবিন্দ স্যার। যদিও স্কুলে ক্যামিস্ট্রির টিচার ছিলেন,তবুও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ তার বরাবরই। বাজার করে ফেরার পথে দেখলেন পূজাবার্ষিকী বেরিয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলেন। এক কাপ চা খেয়েই পত্রিকা আনতে ছুটলেন। বাসস্ট্যান্ডের কাছে যেতেই দেখলেন পাড়ার একটি যুবককে কয়েকজন ছেলে মিলে বেধড়ক পেটাচ্ছে। সবাই দেখছে। কেউ ছবি তুলছে। যুবকটিকে কেউ সাহায্য করছে না। একেবারে যেন দক্ষিনী চলচ্চিত্রের শুটিং চলছে। মাস্টারমশাই তো থাকতে পারলেন না। আহতকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কানে শব্দ ভেসে এল- মাস্টারমশাই রিটায়ার্ড হয়ে গেছেন কেন এসব লাফড়াতে জড়াচ্ছেন। চুপচাপ বাড়ি চলে যান।
ততক্ষণে ধাক্কায় অরবিন্দ স্যার রাস্তায় চশমা হাতড়াচ্ছেন। বেগতিক দেখে বাইক বাহিনী চম্পট – –
ছেলেটিকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তার বাড়িতে খবর দেন। ভাঙা চশমা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। সন্ধ্যায় কানাঘুষো শুনতে পেলেন ছেলেটির অবস্থা ভালো নয়। টিভি চালিয়ে খবরটা একটু দেখছেন ঠিক তখনই বাড়ির দরজায় বেল। পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন স্যারের স্ত্রী সরমা। মিঃ বোস বেলেঘাটা থানার ওসি। স্যার নিজেই তাড়াতাড়ি করে নীচে নেমে এলেন। এতক্ষণ ব্যাপারটা চেপে রেখেছিলেন কিন্তু এবার সরমা জেনে যাবে। শুধু শুধু টেনশন করে প্রেসার বাড়াবে। বাইরের ঘরে বসলেন কথাবার্তা হল। যাবার সময় মিঃ বোস বলে গেলেন,“ কাল একবার থানায় আসবেন।”
“ নিশ্চয়ই।”
এদিকে সরমা ব্যাঙ্গালোরে মেয়েকে ফোন করে দিয়েছেন। ফোন রাখতেই স্ত্রীকে বললেন,
“ ভয়ের কোন কারণ নেই,আমি কোন ক্রাইম করিনি। পাড়ার একজনকে মারছিল দেখে ছাড়াতে গিয়েছিলাম। ধাক্কাধাক্কিতে চশমাটা ভেঙেছে। ক’জনকে অ্যারেস্ট করেছে। তাদেরকে চেনার জন্য থানা থেকে এসেছেন। এছাড়া কিছু নয়। মেয়ে-জামাইকে ফোন করার মত কিছুই হয়নি। প্রতিবাদটা দরকার সরমা। না হলে যে শিরদাঁড়ার অস্তিত্ব থাকবে না। অন্যায় যেই করুক না কেন দেশে আইন কানুন পুলিশ আছে। এইভাবে কাউকে মারে? তাছাড়া যা শুনলাম। ছেলেটির বাড়ির পাশেই একটা বাড়ি প্রমোটিং হচ্ছে। প্রোমোটার চার ফুট জায়গা ছাড়েনি। তাই জন্য প্রতিবাদ করেছে বলে ওকে এভাবে রাস্তায় ফেলে মেরেছে। এ কোন সকাল সরমা!”
“ তুমি বুঝতে পারছ না ওরা গুন্ডা। তোমার যদি কোন ক্ষতি করে!”
“ কেউ মায়ের পেট থেকে গুন্ডা হয়ে জন্মায় না। এই সমাজ গুন্ডা বানায়। প্রতিবাদটা তাদের বিরুদ্ধে যারা ১৮ থেকে ২৫ বছরের ছেলেদের সামান্য মাসে ৫০০০ টাকা আর রাতে ফ্রি মদ,গাঁজার টোপ দিয়ে ক্রিমিনাল তৈরী করছে। ভাবো,যুবসমাজ যদি নষ্ট হয়ে যায় দেশ এগোবে কি করে? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে এলাম। এদেশ নেতাজির,এদেশ ক্ষুদিরামের,এদেশ বিনয়-বাদল-দীনেশের। এদেশ আঠারোর। ”
দেখুন স্যার,“ এরা ছিল তো?”
“ না,এরা আমার দেশের ভবিষ্যত। আমার চশমাটা ভেঙে গিয়েছিল। আমি কাউকে চিনতে পারিনি। শাস্তি তাদের দিন যারা এদের স্বপ্ন চুরি করেছে।”
ক’জোড়া নবীন চোখে বৃষ্টি নামল—

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।