গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

কেউ কেউ বন্ধু হয়

নকশাল পিরিয়ড চলছে। রাত-বিরেতে পুলিশ রেট করতো আলমারি থেকে আলনা। ভাতের হাঁড়ি থেকে জুতোর বাক্স। সবে থেকে সন্দেহ ভাজনদের বাড়ির উঠোনে জমে উঠত খানাতল্লাশির জিনিসপত্র। বেলেঘাটা মোস্ট ওয়ান্টেডদের বদ্ধভূমি। সুভাষ সরোবর লেক,তার পাশেই বড় বড় সব ভেরি। মধ্যরাতে কখনো ভেরি থেকে তো কখনো বেলেঘাটা লেক থেকে ভেসে আসত শেষ আর্তনাদ “আমাকে মেরো না।”
তারপর গুলির আওয়াজ। আশপাশের বাসিন্দারা ভয়ে কেন্নোর মতো গুটিয়ে থাকত। সকালে পাওয়া যেত লাশ। মাঝে মাঝে দিনেদুপুরে গুলির লড়াই চলত। পুলিশ খুব সক্রিয় নকশাল দমনে। বড় ভাই নকশাল করে,রাত্রিবেলা ছোট ভাইকে গুলি করে মেরে দিল পুলিশ। মুখ দেখে মারার সময় নেই। যখন-তখন পুলিশের এনকাউন্টারে মারা যাচ্ছে বহু নকশালপন্থী। এদের মধ্যে বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত,ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছেলেমেয়ে।
একদিন সকালে ক্যাপ্টেন ভেড়ির মধ্যে দুটো পুলিশের গলাকাটা লাশ পাওয়া গেল। পরিস্থিতি চরমে উঠলো। দিনেদুপুরে আশপাশের পাড়াগুলোতে চলল পুলিশের তল্লাশি। ভেড়ির পাশের পাড়াতেই নকশালের সক্রিয় কর্মী ছিল হরি। হরি খবর পেয়ে অনেক আগেই গা ঢাকা দিয়েছিল। হরির একটা পোষ্য ছিল। নাম ভুলু। ভেড়ির ধার থেকে কুড়িয়ে এনেছিল। সেটা হরির খুব ভক্ত হয়ে উঠেছিল। হরির কুকুর ভুলু কে দেখলেই সবাই বুঝে যেত কাছাকাছি কোথাও হরি আছে। পুলিশ হরির বাড়ি তল্লাশি করে কিছুই পেল না।

মাসখানেক পরের ঘটনা—

মধ্যরাতে ভেরির পাশে ভুলুকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। হরির পাশের বাড়ি থাকে বন্ধু ফনি,তার চোখ এড়ালো না। পুলিশকে খবরটা দিয়ে এল। ফনিকে থানা থেকে বেরোতে দেখে ফেলল হরির আরেক বন্ধু ধনা। ধনা পুলিশের সাসপেক্ট এর তালিকায় রয়েছে। তাই তাকে ঘুরপথে খবরটা দিতে হবে। ফনি কোনো গোপন ডেরাতেই হরিকে পেল না।
ছত্রিশগড় থেকে কয়েকজন এসেছে তাদের নিয়ে গোপন মিটিংএ ছিল হরি।
মিটিং শেষে একবার বয়স্ক মাকে দেখে তারপর বেরিয়ে যাবে ভাবলো – –
এদিকে ধনা কোথাও হরিকে খুঁজে না পেয়ে, ছুটতে ছুটতে হরির বাড়ির দিকে এল। হরির মা দরজা খুলতেই দেখল,হরি বসে ভাত খাচ্ছে। ফনি হাঁপাতে হাঁপাতেই বললো,“শিগগিরই পালা,পুলিশ আসছে। শুয়োরের বাচ্চা ফনি পুলিশকে সব খবর দিয়ে দিয়েছে।”

অনেকটা দেরি হয়ে গেছে – –

হরি ভাতের থালা ফেলে বাড়ির পিছনের ভাঙ্গা পাঁচিলটা দিয়ে লাফ দিল। ছুটে এল ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। বারুদের গন্ধে ভরে উঠলো বাতাস। সঙ্গে সঙ্গে একটা কুকুর আর একটা মানুষের বিকট চিৎকারে কয়েক সেকেন্ড যেন পৃথিবীও থেমে গেল।
পুলিশ ছয় ব্যাটারির টর্চ নিয়ে দেখল – – –
পাঁচিলের পাশে পড়ে আছে দুটো লাশ,একটা ধনার আর আর একটা কুকুর ভুলুর।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।