গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

মায়ার খেলা

আমরা সবাই নিয়তির হাতে খেলার পুতুল। পুতুলনাচের পুতুল হয়ে বেঁচে আছি। কখন খেলা শেষ হবে সেটাও সেই বাজিগরের হাতে। সেকাল থেকে একাল এ খেলা চলছে নিরন্তর।
চলে যাই মহাভারতের যুগে। পান্ডবদের বিরুদ্ধে শকুনির কোন বিদ্বেষ ছিল না। শকুনির প্রধান শত্রু ছিল ভিষ্ম পিতামহ। তিনি শকুনির পরিবারকে আমন্ত্রণ জানান এবং তাদের ন্যূনতম খাবার দিয়ে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। অপরাধ, গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রর বিবাহের সময় বিশ্বাসঘাতক করেন। রাজা সুবল মিথ্যা রাশিফল দিয়েছিলেন। তিনি জানতে পারেন গান্ধারী বিধবা। বেচারি গান্ধারী! জ্যোতিষীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে গান্ধারীর প্রথম স্বামী মারা যাবে। তাই তাকে একটি ছাগলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই ছাগলটিকে বলি দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাকে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সাথে বিবাহ দেওয়া হয়। যা সে কখনোই আশা করেনি। বেঁধে নিলেন নিজের চোখে পট্টি। চোখ থাকতেও অন্ধত্ব পাট করে গেলেন। এটা কি কম বড় খেলা! এ এক নীরব প্রতিবাদ।
পান্ডবদের কোন দোষ না থাকা সত্বেও চক্রান্তের শিকার হয়ে গেলেন। বনে- জঙ্গলে ঘুরে,যুদ্ধ করে জীবনের অর্ধেকটা সময় কাটিয়ে দিলেন। এর কঠিন ফল ভোগ করল আরো এক নারী। তিনি দ্রৌপদী। পাঁচটি স্বামীর সাথে ঘর করতে হল। অথচ তিনি মনে প্রাণে ভালোবাসতেন অর্জুনকে। ভর্তি সভায় পণ রাখলেন যুধিষ্ঠি। ভাগ্যিস দীনবন্ধু ছিলেন, না হলে যে কি হত! সব ই তো খেলা।
মহাকাব্যের খলনায়ক শকুনি মামা। তিনি তার সমস্ত ভাইদের থেকে চর্তুর ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। তাইতো ভাইদের সামান্য খাবার তার বাবা তাকে তুলে দিতেন। যাতে তিনি প্রতিশোধ নিতে পারেন। কুরুবংশ ধ্বংস করতে পারেন। ভাগ্নে দুর্যোধনকে নানান কু বুদ্ধি দিতেন। কালকূট বিষ প্রয়োগ করে ভীমকে হত্যা, জতুগৃহে কুন্তী সহ পান্ডবদের পুড়িয়ে মারা,সব চক্রান্তের পান্ডা হলো শকুনি মামা। যেমন ছিল তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তেমন ছিল পাশা খেলায় সিদ্ধহস্ত। সুবলের কোন এক পাপের কারণে দেবতাদের অভিশাপে তার বংশে শকুনির জন্ম হয়। শকুনির জন্ম কলির অংশ থেকে তাই তিনি ধূর্ত ও কপট। তিনি পাশা খেলার সময় পাশাকে তার মন অনুযায়ী চালনা করতে পারতেন। যুধিষ্ঠি শকুনির পাশা খেলায় দুর্যোধনের কাছে সবকিছু হারিয়ে ছিলেন। এটাই হয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রধান কারণ।
কলির অংশে জন্মে শকুনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সৃষ্টি করেছিলো আর এখন তো ঘোর কলি চলছে। পৃথিবীতে শকুনি চরিত্র সবসময় বিরাজমান। তাই যুদ্ধ খেলা চলছে সব সময়। তবে এ কথা ভুললে চলবে না—
যখনই পৃথিবীতে ধর্ম সংকট নেমে আসে তখনই তিনি আবির্ভূত হন। ধর্মের জয় হয় আর অধর্মের বিনাশ হয়। এসব তাঁরই মায়ার খেলা। আমরা তো নিমিত্ত মাত্র।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।