সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে রীতা পাল (পর্ব – ১৫)

যাও পাখি দূরে

ট্রেনের আওয়াজে সম্বিত ফিরল নয়নের। সে দিনের স্মৃতিটা ছবির মতো ভেসে উঠেছিল ওর সামনে। সবিতা দেবী মন দিয়ে শুনছিল ওর কথা। আনমনা হয়ে বলল,“ তারপর?”
“ নন্দকুমার হয়ে গাড়ি ছুটলো দীঘার দিকে। যেতে যেতে আমরা খুব মজা করছিলাম। ললিতদা গাড়ি চালাচ্ছিল। আমি ছিলাম সামনের সিটে আর ওরা তিনজন ছিল পিছনের সিটে। ললিতদা জোরে গান চালিয়ে দিয়েছিল। এতোটা লং ড্রাইভিং অমি কনো দিন করি নি। দিগন্ত জোড়া অন্ধকার মাঝে হাইওয়ে দিয়ে ছুটছে গাড়ি। কখন যে দু’ ঘন্টা কেটে গেছিল বুঝতেই পারিনি। ওল্ড দীঘাতে পৌঁছাতেই আমরা আনন্দে লাফাতে লাগলাম। তখনও অন্ধকার কাটেনি। আধো অন্ধকারে সাদা সাদা ঢেউ ভাঙছে বেলাভূমির বুকে।খানিকটা সময় ওখানে কাটিয়ে আমরা নিউ দিঘার দিকে রওনা দিলাম।
নিউ দীঘায় যখন পৌঁছলাম তখন সবে আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। বিচের ধারে সবে কয়েকজন পর্যটক এসে হাজির হয়েছে। সমুদ্রের হাতছানি আমরা কেউই উপেক্ষা করতে পারলাম না। আমরা কেউ জামাকাপড় নিয়ে আসেনি। রঞ্জনার ব্যাগে কিছু জামা কাপড় ছিল,ও বাড়িতে যাবে বলেছিল। আর ললিতদার গাড়িতে কিছু ললিত দার জামা কাপড় ছিল। আমরা অবাক হয়ে দেখছিলাম পূর্ব দিগন্ত রাঙিয়ে সমুদ্রের মধ্য থেকে কেমন সূর্য উঠছে। সমুদ্রের মধ্যে যেন কেউ সোনা গলিয়ে ঢেলে দিয়েছে। বালিগুলোতে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছিল। দূরে কতগুলি মাছ ধরা নৌকা ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে যাচ্ছিল। মাঝিরা জাল টানছিল। নরম সূর্যের আলোয় অপূর্ব লাগছিল। ঝাউবনের দিক থেকে শনশন করে হাওয়া বইছিল। এক কথায় অসাধারণ। আস্তে আস্তে পর্যটকদের ভিড় বার ছিল। আমাদের একটু ফ্রেশ হতে হবে। আমরা হোটেলে একটা রুম ভাড়া নিলাম কয়েক কয়েক ঘন্টার জন্য । তখন ভোর ছ’টা। ললিতদা সারারাত গাড়ি চালিয়েছে ওর একটু রেষ্ট দরকার ছিল। আমরা একটু ফ্রেস হয়ে নিয়েছিলাম। ততক্ষণে ললিতদা একটু ঘুমিয়ে নিয়েছিল। আমি সামনের সিটে বসতে যাব ললিতদা কুমারীকে বলল,‘ আর আমি এফএম চালাবো না। কুমারী সামনে এসে বসো। তোমাকে গান শোনাতে হবে তবে গাড়ির চাকা চলবে।’ কুমারী কি করবে বুঝতে পারছিল না। ললিতদা এদিকে এসে গাড়ির দরজা খুলে কুমারী কে সামনের সিটে বসাল। কুমারী সামনে বসে গান শুরু করল—
হাম রহে ইয়া না রহে কাল
কাল ইয়াদ আয়েগে ইয়ে পল
পল ইয়ে হ্যায় পেয়ার কা পল।
চল আ মেরে সঙ্গ চল।
চল সোচে কেয়া।
ছোটিসি হ্যায় জিন্দেগি – – – – –

আমরা পৌঁছে গেলাম উদয়পুর বিচে। ললিতদা মুম্বই এ থাকা ছেলে, বাবার ব্যবসা সামলায়। ললিতদা অনেক স্মার্ট আমাদের থেকে। আমরা ললিতদার কথা ফেলতে পারলাম না। বাড়িতে ফোন করে দিয়েছিলাম দুপুরের মধ্যে বাড়ি ফিরব। ললিতদা বলল,‘ জমিয়ে ক্রাবস্ খাব। তোরা কাঁকড়া খাস তো!’ আমি বললাম,‘ আমি কিন্তু প্রণ খাব।’ রঞ্জনা কে একটু গম্ভীর লাগছিল। ললিতদা কুমারীকে জিজ্ঞাসা করছিল ক্রাবস্ চলবে কিনা। কুমারী হেসে বলেছিল,‘ উইথ,পমফ্রেট।’ রান্না হতে সময় লাগবে। আমরা আর থাকতে পারলাম না। সমুদ্রের কাছে সমর্পণ করলাম নিজেদের। পায়ের পাতা ভেজাতে ভেজাতে কখন যে শরীর ভিজতে চলেছে আমাদের কারোর খেয়াল ছিল না। ঢেউ ভাঙার উন্মাদনা আলাদা। ললিতদা একটা বিয়ার নিয়ে খাচ্ছিল। আর আমরা বারণ করছিলাম ললিতদাকে। ললিতদা বলেছিল,‘ দুর বোকা! বিয়ার খেলে কিছু হয় না। তোরা খাবি?’ রঞ্জনা আর ললিতদা দু’জনে খাচ্ছিল। সেদিন সমুদ্রের জলে খুব টান ছিল। পায়ের তলা থেকে সরসর করে বালি সরে যাচ্ছিল। কুমারী বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছিল। একটা বড় ঢেউয়ে অনেকটা ভিজে গেছিল।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।