গল্পেরা জোনাকি -তে ঋতশ্রী মান্না

🍁”মহালয়া” কিম্বা “একটা রেডিওর গল্প”🍁

কলেজ ক্যান্টিনে পা রাখা তিস্তার এই প্রথম।এই একবছরের কলেজজীবনে এমুখো হবার প্রয়োজন পড়েনি তার।তার প্রথম কারণ,টিফিন সে সাথে নিয়েই আসে।আর,দ্বিতীয় কারণ,কলেজ ক্যান্টিন সম্পর্কে তার বদ্ধমূল একপ্রকারের বিজাতীয় ধারণা।

তুমুল হৈ চৈ,সদ্য বানানো এগটোস্ট থেকে আসা ডিমের গন্ধ,উগ্র সিগারেটের ঘ্রাণ-সব মিলেমিশে দিশাহারা লাগছিল তিস্তার।এই ভিড়ে অভ্রকে খুঁজবে বা কোথায়!
-“সব তোর জন্য হল।কি দরকার ছিল তোর রেডিওটা নেবার?”সোহিনীর ওপর ঝাঁঝিয়ে ওঠে তিস্তা।
-“তোরই বা অত ফেরত দেবার তাড়া কেন,কে জানে।কাল মহালয়া শুনে তারপর ফেরত দিলেই তো হত।”
-“চুপ কর।তুই ওকে বলতে গেলি কেন যে আমার রেডিওতে মহালয়া শুনতে ভালো লাগে।”
-“কি মুশকিল,সত্যি কথাই তো বলেছি,প্রব্লেম কোথায়?”সোহিনী হাসছিল,”আর,তুই তো মনখারাপও করছিলি এবছর বাড়ি যাওয়া হলনা,মহালয়া শোনা হবেনা,যদি একটা রেডিও থাকত,কত ভালো হত।বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় চন্ডীপাঠটা মিস করবো।”
-“হাসিসনা।”তিস্তা রেগে যায়,”অভ্রকে খুঁজে দ্যাখ।”
-“ওকে,কাম ডাউন,বেবি।দেখছি…”সোহিনী ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায়।সিগারেটের গন্ধ সহ্য হয়না তিস্তার।মাথা ঝিমঝিম করছে এখনই।একরাশ বিরক্তি নিয়ে সোহিনীকে অনুসরণ করল তিস্তা।

বেশকিছু চেয়ারে ধাক্কা খেতে খেতে,টেবিলের ভাঙা কোণগুলোয় বারংবার আটকে যাওয়া অবাধ্য ওড়নার শেষপ্রান্ত ছাড়িয়ে নিতে নিতে তিস্তা যখন সোহিনীর কাছাকাছি পৌঁছালো,তখন সোহিনী অাড্ডায় বেশকিছুটা শিকড় গেড়ে বসেছে।তাদের ব্যাচেরই প্রায় সবাই,কিছুজন থার্ড ইয়ারের।
-“এদিকে আয়।”সোহিনী হাত নেড়ে ডাকল।
এতজনের সামনে এখন রেডিওটা ফেরত দেবে কি করে,নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছিল তিস্তার।কেন যে সোহিনীটার কথা শুনে এখানে আসতে গেল।এর চেয়ে তো ক্লাসরুমেই কোনো একসময় সুযোগ বুঝে ফেরত দেওয়া যেতে পারত…
তিস্তার বিব্রত অবস্থা দেখেই বোধহয় অভ্র নিজেই উঠে এল।সাথে চেয়ারটাও উঠিয়ে নিয়ে এল,”বসুন,ম্যাম।কি খাবেন,বলুন।”
-“আমি বসতে আসিনি,খেতেও আসিনি।”
-“ওকে।তবে আমিই বসি।”অভ্র অম্লানবদনে বসে পড়ল চেয়ারে।
মিনিমাম সৌজন্যবোধটুকুও নেই,মনে মনেই রেগে যায় তিস্তা,-“রেডিওটা রাখ।”
-“আরে,তোকে একেবারে দিয়ে দিয়েছি।আবার ফেরত দিতে এলি কেন?”
-“আমি নেব কেন তোর জিনিস?”তিস্তা সামান্য রেগে যায়,”আমি কি বলেছিলাম তোকে রেডিও কিনে আনতে,আমাকে একবারে দিয়ে দিতে?”
-“বলিসনি।আমার ইচ্ছে করেছে দিতে,তাই দিয়েছি।”উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা ঠেলে সরিয়ে দিল অভ্র,”পি.কে.বি.স্যারের ক্লাস আছে।আমি আসছি।”
-“আরে সে তো আমারও আছে।”
-“তো ক্লাসে যা।এখানে দাঁড়িয়ে থাকিসনা।”
-“তুই রেডিওটা রাখ।আমি কিন্তু এটা নিতে পারবনা।”
-“এক কাজ কর,ফেলে দিস রাস্তায়।কেউ না কেউ তুলে নেবে ঠিক।”তিস্তার হতভম্ব মুখের সামনে দিয়ে নির্দ্বিধায় বেরিয়ে চলে যায় অভ্র।
সোহিনী কখন উঠে এসে তিস্তার পেছনে দাঁড়িয়েছিল।বলল,”যাহ্,চলে গেল তো।এবার?”
-“সব ঝামেলা তোর জন্য হল,সোহিনী।অসভ্য ছেলে একটা।গটগট করে বেরিয়ে গেল।এখন এই রেডিওটা নিয়ে আমি কি করব?”তিস্তার গলায় রাগ,অসহায়তা মিলেমিশে একাকার।
-“সবাই দেখছে।ব্যাগে ঢোকা এটা।”সোহিনী নিজেই তিস্তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয় রেডিওটা,”নে,চল,এবার।কাল মহালয়াটা তো শোনা হয়ে যাবে।একপক্ষে ভালোই হল,কি বলিস?”
-“এবার তুই সত্যিসত্যিই মার খাবি।”
-“আরে,পুরো মহিষাসুরমর্দিনী লাগছে তো তোকে!”সোহিনী হাসছিল।
হেসে ফেলল তিস্তাও,”চল,নাহলে ক্লাসটা মিস হয়ে যাবে এবার।”
-“কি হল?উঠবে তো,কতক্ষন ধরে ডাকছি।”
-“আরে,আজ একটু ঘুমোতে দাও অ্যাটলিস্ট।”
-“অদ্ভুত তো!আবার পাশ ফিরে শোয়…এবার জল ঢেলে দেব মাথায় কিন্তু…”
-“হে ভগবান!ছুটির দিনেও শান্তি নেই!”হাই তুলতে তুলতে উঠে বসল অভ্র,”বলো,এত সকাল সকাল তুলে দিলে কেন?বাজার যেতে হবে?চিকেন না মাটন?”
-“কিচ্ছু নয়।আজ নিরামিষ,মশাই।মহালয়া আজ,খেয়াল নেই?”
-“যাহ্,তাহলে ডাকলে কেন?কি ঘুম পাচ্ছে…আরেকবার শুয়ে পড়ি বরং…”
-“আরে,আরে,না,না,…এই নাও,বেড টী।ঘুম কেটে যাবে।”
-“বাহ্,আজ তো মেঘ না চাইতেই জল!!দাও তবে।”অভ্র উঠে বসল আড়মোড়া ভেঙে,”ফোনটাও দাও।ইউটিউবে মহালয়া শোনা যাক চা খেতে খেতে।”
-“উঁহু।আজ ফোন নয়।এটায় শুনবো,দু’জন একসাথে।”তিস্তা আলমারি খুলে বার করে আনে একটা রেডিও,”চিনতে পারছ?”
-“আরে,এটা সেই রেডিওটা না,যেটা আমি…”
-“হ্যাঁ,মশাই। এটা সেই রেডিওটাই…সারাতে দিয়েছিলাম,কাল নিয়ে এসেছি।”
-“যত কান্ডের গোড়াপত্তন তো ওই রেডিও থেকেই!দেবীর হৃদয় দুর্বল হল,এই অধমের ওপর কৃপাদৃষ্টি দিলেন!”হেসে ওঠে অভ্র।
-“আরে প্রথম দুর্বলতা তো ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া,সেখান থেকে এল রেডিও…”তিস্তাও হেসে ফেলল।
-“হ্যাঁ,আর সেখান থেকে দুর্বলতা ট্রান্সফার হয়ে গেল এই অধমের ওপর…”অভ্রের উচ্চকিত হাসিতে গমগম করে ওঠে ঘর।
-“মহিষাসুরের মত হাসবেনা একদম।”তিস্তা ধমক দিল।
-“যথা আজ্ঞা,দেবী।এই আমি মুখ বন্ধ করলাম।”
রেডিও অন করল তিস্তা।সামান্য যান্ত্রিক আওয়াজ,ধাতব ঘর্ঘর…শুরু হল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদাত্ত কন্ঠের চণ্ডীপাঠ…সেই বহুযুগ ধরে বয়ে আসা শব্দপ্রবাহ…অভ্রর চোখে চোখ পড়ে যায় তিস্তার…এ দৃষ্টিপাত চিরকালীন…আবর্তন,পুনরাবর্তন পেরিয়ে এসেও চিরপুরাতন মহালয়ার পুণ্য প্রভাতটুকু চিরন্তন হয়ে থেকে যায় কোথাও কোথাও…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।