চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে না পারাটি আমার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। ফলে,আলাপচারিতা জমে ওঠে অচিরেই।
-“বাড়ি কোথায় তোমাদের?”
কাঁচালংকা দাঁড়িপাল্লায় তুলতে তুলতে ঝর্ণার মত কলকল করে বউটি,লালগড়ের বসন্তপুর। সেই কোন সকালে বাসে করে এসেছে তারা।বুড়িটি তার শাশুড়ি।
কত গাছ তাদের বসন্তপুরে! এই লাউশাক,সজনেডাঁটা,লেবু,লংকা,সবই তো তাদের গাছের।
কত ফুলের গাছ,আকন্দ,ধুতুরা!
মনে হয়,কত কথা জমে ছিল তার এতকাল ধরে! প্রাথমিক জড়তার পাথরটি সরে যেতে দুর্বার গতিতে নেমে আসছে অবাধ ঝর্ণাধারা!
সে জানতে চায়,”শিবরাত্রি করো,দিদি?”
তারপর আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে চলে,”আমিও করতাম।তারপর বর যখন অন্য মেয়েকে নিয়ে গেরাম ছেড়ে পালিয়ে গেল,খুব রাগ হল শিবঠাকুরের ওপর,আর করিনি।সেও বছর পাঁচেক হয়ে গেল।
সব জমানো টাকাপয়সা নিয়ে চলে গেছল জানো!কত কষ্ট-ই না গেছে! তারপর শাশুড়ি বৌ মিলে এই ব্যবসা শুরু করলাম।”
সামান্য দূরেই স্টেশনচত্বরের অশোক গাছটায় ফুল এসেছে– লালে লাল গাছটা সদর্পে জানান দিচ্ছে,বসন্ত এসে গেছে।
মেয়েটির লাল টিপ,ঘামে গলে যাওয়া সিঁদুরে লাল হয়ে থাকা কপাল– আমার দৃষ্টি অনুসরণ করতে পেরে সামান্য হাসে মেয়েটি,”ভালোবেসেছিলাম তো একদিন,তাই পরি এখনও…”
আমি কখনও বসন্তপুর যাইনি,যাবওনা হয়ত কখনও।সেখানে কি বসন্ত আসে আদৌ? যদি আসে,তবে কেমন সে বসন্ত? এমন অর্থহীন সিঁদুরের মতই সেও কি নিরর্থক,উদ্দেশ্যহীন?
মেয়েটি হাসে,”শিবরাত্রির দিন সকাল করে চলে এসো দিদি,আমি তোমায় গেঁথে এনে দেব আকন্দফুলের মালা,ধুতুরার ফুল।”
এক অভিমানী নারী তার এযাবৎকালের সঞ্চিত সব অভিমান গেঁথে তুলতে চায় আকন্দের মালায়, তার ভাঙা সংসারের ধার ঘেঁষে ফুটে ওঠা ধুতুরায় সাজিয়ে দিতে চায় বসন্ত-অর্ঘ্য!
হয়ত এ অভিমান তার প্রিয় আরাধ্য দেবতার ওপর,হয়ত বা চারপাশের এই রক্তিম বসন্ত-আয়োজনের ওপর! বহুকালের নীরব অভিমানই কি উদ্বেলিত হয়ে উঠতে চায় পূজায়,প্রেমে ?
সে আবারও প্রশ্ন করে,”আসবে তো?”
আমি হাসি।
তারপর পেছনে ফেলে আসি দুটি অসমবয়সী নারী,তাদের জীবনযুদ্ধ,শহুরে পটভূমি জুড়ে বেড়ে ওঠা একটি পুষ্পিত অশোক,কোন্ এক অচিন বসন্তপুরে ফোটা ধুতুরার ফুল, আকন্দের মালা–এক অচেনা বসন্তকাল।