|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় ঋতশ্রী মান্না

অথমূষিককথা

গত ক’দিন ধরে গৃহে অনুপ্রবেশকারী একটি ইঁদুরের উপদ্রবে জেরবার হচ্ছিলাম।গতকাল রাত্রে Rat Catcher পেতে তাকে ধরা গেছে।সকালে উঠে দেখলাম,Rat Catcher এর আঠায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত হয়ে সে ভারি বিব্রত,কিচকিচ করে সচকিত করছে চারপাশ।
বইয়ের ছবি,গনেশের পদতল এবং টমজেরির কার্টুনেই এযাবতকাল দৃশ্যমান প্রাণীটিকে বাস্তবের মাটিতে জলজ্যান্ত অবলোকন করে আমার পুত্রকন্যা দু’জনেই ভারি বিস্মিত। ইঁদুরছানাটিকে নিয়ে দু’জনে বেশ গুরুতর আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পর দেখি,পুত্র সিংহের মুখোশ পরে,নানাবিধ অঙ্গভঙ্গি সহযোগে ইঁদুরকে ভয় দেখাতে প্রবৃত্ত হয়েছে।
কন্যা তাকে সমানে হাত নেড়ে সাবধান করে চলেছে—–অ্যাই,দাদা,ভয় দেখাসনা। ও মরে যাবে।

-মরে যাবে কেন? শুধু ভয় দেখালে কেউ মরে যায়?

–ইঁদুরছানা ভয়ে মরে…জানিসনা?

চমৎকৃত হলাম। পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানের এমন বাস্তবপ্রয়োগ আমিও সবসময় করে উঠতে পারিনা!

যাইহোক,ভয়ে না মরুক,এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে ও এমনিতেই মরে যাবে।আঠা থেকে কোনোভাবে ওকে ছাড়িয়ে বাইরে ছেড়ে দেব স্থির করলাম।
এমনিতেই ইঁদুর ছুঁচো এইসব বিজাতীয় জিনিসপত্তরের সম্মুখীন হলে আমি ঘাবড়েই থাকি। ৷ কিন্তু,আপাতত ইঁদুরছানা অপেক্ষা বেশি ভয় যে আমিই পাচ্ছি তার সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে, একথা বুঝতে দেওয়া চলেনা। মানসম্মানের প্রশ্ন।

সুতরাং-মুখে “এ আর এমন কী কাজ”-জাতীয় একখানা তাচ্ছিল্যের হাসি ধরে রেখে,শরীর থেকে যথাসম্ভব দূরত্বে rat catcher খানা রেখে,
ইঁদুর-মুক্তি অভিযান শুরু করা গেল। আমার সুযোগ্য অনুচরেরা আমায় সপ্রশ্ন অনুসরণ করা শুরু করল।

–আচ্ছা,মাম্মা,ইঁদুরটা ভয় পেয়ে এখন কী বলছে?

–ইঁদুর আর কী বলবে,বোধহয় ও মা গো,বাবা গো এরকমই কিছু একটা বলছে।

–আচ্ছা মাম্মা,যখন কেউ ভয় পায়,তখন শুধু ‘ও মা গো,ও বাবা গো’ এই বলেই চিৎকার করে কেন?কেউ তো ‘ও পিসেমশাই গো’-ও বলতে পারত!

সত্যি কথা।আগে তো কখনও ভেবে দেখিনি।বেশ যুক্তি আছে কথাখানায়।

-আচ্ছা, মাম্মা,ইঁদুরের কি পিসেমশাই থাকে?

–ভারী জটিল প্রশ্ন,এর উত্তর তো আমিও জানিনা।ইঁদুর জানলেও জানতে পারে।

যাইহোক এইসব গোলযোগের মধ্যে পাশের বাড়ীর উৎসাহী ছেলেটি পাঁচিলের ধারে এসে উঁকি মারে।তাকে দেখতে পেয়ে আমার ছেলে ইঁদুরের ঠিকুজিকোষ্ঠী সংক্রান্ত প্রশ্নমালা বিস্মৃত হ’ল।আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।তাদের কথোপকথন শুনতে শুনতে ইঁদুরকে আঠামুক্ত করার প্রয়াস চালু করলাম।

আমার পুত্র ইঁদুরের আয়তন নিয়ে ভারি গর্বিত, দেখেছ,বাবু দাদা, কত্ত বড় ইঁদুর !

–এটা আর এমন কী..আমাদের বাড়ীতে সেদিন এর থেকেও অনেক বড় একটা ইঁদুর ধরেছিলাম।তার এতবড় লেজ !

ইঁদুরের বিশালত্ব সংক্রান্ত গৌরব দাদার হাতছাড়া হতে চলেছে দেখে এবার আমার কন্যা আসরে অবতীর্ণ হয়,-কিন্তু ছোট ইঁদুররাই বেশি কিউট হয়,বাবুদাদা।দ্যাখো,এটা কত্ত কিউট!

বিশালত্বের প্রশ্নে বিপক্ষকে হেসেখেলে দু’গোল দিয়েছিলেন, কিন্তু এহেন অখন্ডনীয় কিউটনেসের তত্ত্বে চারগোল হজম করার পর,বিরসবদন বাবুদাদার হঠাৎ মনে পড়ে গেল,পড়াশোনা নামক গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আশু সম্পন্ন করার কথা। সুতরাং-তিনি রঙ্গমঞ্চ পরিত্যাগ করলেন।

যাইহোক,দর্শকের অভাব নেই। ফুল তুলতে তুলতে পাঁচিলের ধারে ওপাশের বাড়ির ঘোষকাকু দাঁড়িয়ে পড়ে ডিরেকশন দেওয়া শুরু করলেন,–ভয়ের কিচ্ছু নেই।প্রথমে পেছনের পাদু’টো ছাড়িয়ে ফেল…বাহ্,সুন্দর হচ্ছে… হবে হবে…আহা,ওদিকে নয়,পেটের তলাটায় খোঁচা দে এবার… আহা,একটু কাত করে ধরে ছাড়াতে হবে…হাতের সাথে মিনিমাম 45° angle এ রাখ।তবে grip পাবি।

পুত্রকন্যাও সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সোৎসাহে আমাকে cheer up করতে লাগল।

অবশেষে,আমার এহেন অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ইঁদুর আঠামুক্ত হয়ে মাটিতে পড়ল। মুক্তির আনন্দে সে যত না চিৎকার করল, দর্শককুল চিৎকার করল তার দ্বিগুণ, আমি জগঝম্প সহ তার চতুর্গুণ। তারপর,ইঁদুরের সম্মুখগতি অপেক্ষা চতুর্দশগুণ গতিবেগে পশ্চাদ্পসরণ করলাম–ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সমান হলনা।
কিছুই করার নেই। ইঁদুর সংক্রান্ত এমন বিশেষ পরিস্থিতি সর্বদা নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে চলেনা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।