“ কেমন আছে গো ওরা ! নিশ্চই ভালোই আছে বল ! ”
সুরমা আর আদিত্য বহুদিন বাদে বাড়িতে ফিরছেন । তবে সশরীরে নয় । সুরমা মারা গিয়েছেন বছর সাতেক হল । বলা বাহুল্য আদিত্য স্ত্রীবিয়োগের শোকে বেশী দিন বাঁচেননি । একবছরের মধ্যেই মারা যান তিনি । আজ দুজনের বিবাহবার্ষিকী । অনেক রিকোয়েস্টের পর অবশেষে দুজনে অনুমতি পেয়েছেন মর্ত্যলোকে যাবার । তাও আবার মাত্র একদিনের জন্য । তবে এই বাজারে একদিনই বা কম কিসের! স্বাভাবিক ভাবেই দুজন বেশ উৎফুল্ল হয়ে রয়েছেন । আজ অনেকদিন বাদে তারা ফিরবেন সেই বাড়িতে যেখান থেকে পঞ্চাশ বছর আগে শুরু হয়েছিল দুজনের দাম্পত্য । এই সৌভাগ্য তো সকলের হয় না ।
“ ভালোই থাকবে । খারাপ কেন থাকবে ! সারাজীবন ওদের জন্যই তো কষ্ট করে গিয়েছি । নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে ওরা । সংসার করছে । নিশ্চয় খুব ভালো আছে । “
বাড়ির সামনে এসে হঠাৎ থমকে গেলেন সুরমা ।
“ বলছি ! আমারা ঠিক রাস্তায় এলাম তো ! কিছুই যে চিনতে পারছি না । ”
আদিত্য হাসলেন । “ একটু অসুবিধে আমারও হচ্ছে । ফ্ল্যাট হয়ে গিয়েছে চারদিকে । সব কিছুই প্রায় বদলে গেছে । “
ঢুকতে গিয়েই হোঁচট ! সামনের প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো গেটটা আর নেই । আদিত্যর হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল ।
“ আমার কর্মজীবনের প্রথম মাইনে পেয়ে এটা বানিয়েছিলাম । এটা ভেঙে ফেলল এভাবে !”
“ তোমার তৈরি সব জিনিস কি আগের মত রেখে দেবে ! তুমি তোমার বাবার সব কিছু ধরে রাখতে পেরেছ ! যুগের নিয়মই তাই । পুরনো ভেঙে নূতন হবে ! এত অভিমান করলে চলবে । ” আদিত্য বুঝলেন সবই । কিন্তু
ঠিক সন্তুষ্ট হলেন না ।
সুরমা আদিত্যর হাত ধরলেন “ চল ভেতরে ! “
সামনে একটা বাগান । এই বাগানে আদিত্য-সুরমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে । যৌথ পরিবার ছিল আদিত্যদের । এত বড় সংসারে দুজনে প্রথম দিকে আলাদা করে সময় কাটানোর অবকাশ পেতেন না । বাগানটাই ছিল সে অর্থে দুজনের পরস্পরের কাছে প্রাণের কথা খুলে বলবার জায়গা । আদিত্য নস্টালজিক হয়ে পড়লেন ।
“ মনে আছে সুরমা , বিয়ের পর আমরা এখানে কত সময় কাটাতাম । সারা জীবন কত সব মুহূর্ত যাপন করেছি এখানে । ” সুরমা একটু লজ্জা পেলেন ।
“ ওইখানে বসে তোমার কাঁধে মাথা রেখে আমি সূর্যাস্ত দেখতাম ! মনে পড়ে !”
কিছু মুহূর্তের নিস্তব্ধতা । দুজনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বাগানটার দিকে । দুজনের হাতে হাত । কিভাবে সময় চলে যায় !
সেই বসার জায়গাটা আর নেই এখন । বাগানটাও আগের মত নেই । গাছগুলোও প্রায় সব মরে গিয়েছে । সুরমা এই বাগানটিকে খুব ভালোবাসতেন । কত যত্ন করতেন এই বাগানটিকে । সংসারের যাবতীয় কাজ সারবার পর সুরমা এই বাগান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন । আবার বিকেলে এখানে বসেই আদিত্যর জন্য অপেক্ষা করতেন । কত রকমের ফুল ছিল এই বাগানে । কত পাখি আসত এখানে । বাগানের প্রাণটাই আর অবশিষ্ট নেই । থাকবেই বা কি করে ! এখানে তো এখন আর কেউ থাকে না । দুই ছেলে বাইরেই থাকে । আর আদিত্যর ভাইয়েরা আগেই নিজের অংশ বুঝে নিয়ে ফ্ল্যাট বানিয়ে নিয়েছেন । আদিত্যর অংশটাই কিছুটা ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল ।
“ তোমার ছেলেদের বলিহারি ! ওদের তো টাকা পয়সা কম নেই । একটা কাউকে এই বাগান দেখভালের দায়িত্ব দিতে পারত না ! তুমি কত ভালোবাসতে এই বাগানটিকে । এটুকু ওরা করতেই পারত । ” আদিত্য বেশ রেগে গেলেন ।
“ ওদের কিন্তু কোন দোষ নেই । এত দূরে থাকে ওরা । কি করেই বা এই দায়িত্বগুলো সামলাবে ! ওদেরও তো নিজেদের সংসার আছে । ”
“ তুমি কি আর ওদের দোষ মানবে ! কবেই বা মেনেছ !”
দুজনে এগিয়ে গেলেন ।
আদিত্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ” জীবনটা কি অদ্ভুত একটা প্রহেলিকা ! তাই না ! চোখের সামনে সবটাই বদলে গেল । মনে আছে , তখন সবে শোভন জন্মেছে । আমি কাজের প্রয়োজনে বাইরে । কি তীব্র উৎকণ্ঠায় দিন কাটিয়েছি । বাড়িতে তখনও টেলিফোন আসেনি । আজ মনে হয় মোবাইল সে যুগে থাকলে কি ভালোটাই না হত । প্রতিমুহূর্তে তোমার খবরাখবর নিতে পারতাম ! “
সুরমা হাসলেন ,
“ তবে যাই বল , জীবন এতটা সহজ ছিল না বলেই পাওয়ার আনন্দটা কয়েকগুণ বেশী ছিল । তুমি যখন বাড়িতে আসতে তখন আমার কি যে আনন্দ হত ! আমাদের সময়টা সত্যি খুব ভালো ছিল । এত ছোটার প্রয়োজন ছিল না । হয়ত এত সুবিধে ছিল না , তবে শান্তি ছিল অনেক !”
আদিত্যর গলা বুজে আসছে ক্রমে । বাবার পর খুব সাধ করে বাড়িটাকে বাড়িয়েছিলেন আদিত্য । বাবার সারা জীবনের শ্রম মিশে আছে এই ইমারতে । প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছোটবেলার স্মৃতি । অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়িটা ছিল । পেছনে ফাকা জমি ছিল । এই বাড়ির এমন বেহাল দশা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন আদিত্য ।
“ চল ! আর ভালো লাগছে না এখানে । “
সুরমা হাত ধরলেন আদিত্যর “ আজকের দিনটা মনে আছে তো , আমাদের বিবাহ বার্ষিকী । অবুঝের মত কর না । তোমার ছেলেদের নিজেদের জীবন আছে । সবার ওপর অভিমান করে তুমি আমাদের দিনটাকে নস্ট কোরো না । ”
‘ সব বুঝলাম । এখন মনে হচ্ছে এ বাস্তবের মুখোমুখি না হলেই ভালো হত ! এত পরিবর্তন মেনে নেওয়া কঠিন ।”
“ আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে তুমি আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলে । এই বাড়ির এমন অবস্থা আমারও ভালো লাগছে না । তবু এই যে স্মৃতির মধ্যে দিয়ে হাটছি , সেটাও কি কম ! “
সিঁড়ি গুলো ভেঙে গিয়েছে । এবার দুজনের এগিয়ে গেলেন বারান্দার দিকে । এই বাড়ির আরেকটা অতিপ্রিয় জায়গা । দুজনেরই । শেষের দিকটায় সুরমা নীচে নামতে পারতেন না । অতএব এই বারান্দাতে বসেই ঘরবন্দি জীবনের ক্লান্তি দূর করতেন তিনি । সামনের রাস্তা , বলাইদের বাড়ি সব মিলে কেটে যেত দিন । আর স্ত্রী এর এই কঠিন সময়ে যেন ছায়া সঙ্গী ছিলেন আদিত্য । কত ধরনের গল্প হত দুজনের । শেষ বয়সে ওদের বন্ধুত্বটা অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল । দুজন দুজনের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন ।
“ যাদের সাথে কথা বলতাম তারা আর কেউ বেঁচে নেই । তাই না !” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুরমা ।
“ থাকবেই বা কি করে , কম দিন তো হল না , আমরাই কি আর বেঁচে আছি ! এভাবেই একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে যায় ! আমাদের দিন গেছে সুরমা !”
বারান্দা বরাবর একেক করে চারটে ঘর । একদম শেষের ঘরটাতেই থাকতেন আদিত্য ও সুরমা । শোয়ার খাটটা আজ আর নেই । আগের কোন কিছুই নেই । দেওয়ালে শুধু আদিত্য আর সুরমার একটা পুরনো ছবি রয়েছে । ছবিটা ওদের হানিমুনের । সেটায় ধুলোর পুরু স্তর জমেছে ।
“ মনে আছে ছবিটার কথা !”
“ দীঘায় তোলা ! মনে আছে । “
“ কোন কিছুই থাকে না সুরমা । একেকটা ঘর কে শ্মশানের মত লাগছে । পুরো বাড়িটাকে একটা মৃত্যুপুরী মনে হচ্ছে । তোমাকে আমার বাবা লক্ষ্মী বলে সম্বোধন করতেন । লক্ষ্মীর সংসারের কি অবস্থা দেখছ !”
সুরমা বরাবরই খুব গোছানো । এই বাড়ি আগে খুব জমজমাট ছিল । নিয়মিত মালিরা আসত , পূজা হত , রবিবারে গান বাজনা হত । আদিত্য রাজনীতি করতেন । তাই এলাকায় এই বাড়ির একটা আলাদা প্রভাব ছিল । বাড়িটা যেন গমগম করত সেই সময় । সুরমার ব্যস্ততার শেষ ছিল না । দক্ষ হাতে গোটা সংসারটা সামলাতেন সুরমা । তারপর ছেলেরা বড় হল । বাইরে পড়তে গেল । চাকরি পেল । আর ফিরল না । একদম বাইরেই সেটলড । বাড়ির অন্য শরিকরা নিজের অংশ আলাদা করে প্রমোটার কে দিয়ে দিলেন । বারণ করেছিলেন আদিত্য । বাবার স্মৃতি , মা এর স্মৃতি আগলে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি । ভাইয়েরা মানেনি । যে যার মত আলাদা হয়ে গেল । কোথাও যেন তাল কেটে গেল । সময়ের সাথে সাথে বাড়িটাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ততা কমে এল । তারপর এল বার্ধক্য , সাথে কিছু অবধারিত রোগ । সুরমার ক্যান্সার ধরা পড়ল । প্রাণচঞ্চল , প্রায় সর্বদা মেতে থাকা বাড়িটায় তখন মানুষ বলতে দুজন ।
সুরমা চোখের জল মুছলেন ।
“ ভাগ্যিস আমাদের জীবদ্দশায় এসব দেখে যেতে হয় নি ।” হঠাৎ গেট খোলার শব্দ । আদিত্য নীচের দিকে তাকালেন ।
“ আমাদের শেষ বয়স তোমার মনে আছে ! তুমি তখন মৃত্যুশয্যায় । আমিও প্যারালাইসড হয়ে গেলাম । সেদিন আয়া আসেনি । আমরা অভুক্ত ছিলাম । এমন কত দিন কেটেছে বল । কখনও ওদের সন্তান দের পরীক্ষা , কখনও ফ্যামিলি প্রবলেম ! সে কত ধরনের অজুহাত ! কবার এসেছে ওরা ! আর তুমি বলছ চুপ কর !”
দুজন ওপরে আসছে । সাথে আরেকজন । বেশ ষণ্ডামার্কা দেখতে । হাতে দামি সোনার চেন ।
বারান্দায় এসে ওরা দাঁড়াল । সুরমা দেবীর খুব ইচ্ছে করছে একবার ছেলেদের সাথে কথা বলতে । নাড়ির টান ! কিন্তু উপায় নেই । ভূতেদের মানুষের সাথে কথা বলার বারণ আছে যে ! সুরমা দুচোখ ভরে নিজের ছেলেদের দেখছে । মাকে ওদের মনে আছে ! নিশ্চয় আছে ! কেউ নিজের মাকে ভুলতে পারে ! খুব বদলে গেছে ওরা । এমনই হয়তো। সবাই বদলে যায় ।
“ ঠিক আছে । কোন চিন্তা করবেন না দাদা । নেক্সট মাসে পুরোটা ঢুকিয়ে দেব ।”
“ আপনার লোক কখন আসবে !”
“ চলে এসেছে প্রায় । বাড়িটা ভাঙতে দুদিন লাগবে !”
সুরমা অবাক হলেন “ ওরা কি নিয়ে কথা বলছে গো !”
আদিত্য উত্তর দিলেন না ।
শোভন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল “ বাড়ি টা না মাথার ওপর একটা বিশাল চাপ ছিল । আবার এত টাকার প্রপার্টি ছেড়ে দেওয়াও যায় না । তোমাকে দিয়ে বাঁচলাম ।”
দাদার কথায় তাল মেলাল সুদীপ্ত “ ঠিকই ! আপনি শুধু দেখবেন পুরো টাকাটা যেন নেক্সট মাসে ক্লিয়ার হয়ে যায় । “
আজ পুরো দিনটাই বাড়িতে ছিলেন আদিত্য – সুরমা । চোখের সামনে দেখলেন বাড়িটা ভেঙে ফেলা হচ্ছে । সেই বহুবছরের স্মৃতি জড়ানো ঘরগুলো , বারান্দাটা সব ভেঙে ফেলা হল ধীরে ধীরে । মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে দুজনের হানিমুনের ছবিটা । ছেলেদের মধ্যে কোন ভাবান্তর নেই । বেলা শেষ হয়ে আসছে । এবার ফেরার পালা ।
“ এমন দিন দেখব কখনও ভেবেছিলাম !” আদিত্য হাসলেন
“ শুভ বিবাহ বার্ষিকী সুরমা !”
দুজন বেরিয়ে এলেন বাড়ির বাইরে । পেছনে পড়ে রইল জীবনের ধ্বংসস্তূপ।