ঋতব্রত গুহের গল্প

বিচ্ছেদ
১
“ আমি যে কি বলে তোমাকে ধন্যবাদ দেব ! “
“ এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কি আছে !”
“ না প্রতিদিন আমাকে এতটা সময় দাও ! আচ্ছা তোমাকে দেখতে কেমন বল ত ! না মানে কখনো তো তোমাকে দেখিনি , আর প্রোফাইলে তোমার তো একটিও ছবি নেই ! ”
“ যেমন একটা মানুষ কে দেখতে হয় আমি তেমনটাই দেখতে । ”
তিয়াসা র সারাদিনের সঙ্গী বলতে একমাত্র বিনায়ক । কোন কাজকম্ম বোধহয় করে না । না হলে সবসময় অনলাইন থাকে কি করে ! কিছু লিখলেই সাথে সাথে উত্তর । তিয়াসা র কাছে বিষয়টি বেশ উপভোগ্য । তিয়াসার জীবনটা যেন হঠাৎ থমকে গিয়েছে । শরীর টা মাঝে মাঝে অসুবিধে করত , কিন্তু ভেতরে যে এমন ভীষণ রোগ বাসা বেধেছে তা তিয়াসা স্বপ্নেও ভাবেনি । কি ভাবে পালটে যায় জীবন ! কি ভাবে বদলে যায় পারিপার্শ্বিক ! জন্মসূত্রে পাওয়া অসাধারণ সৌন্দর্য তিয়াসাকে সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছিল , তার সাথে যোগ হয়েছিল একটা সুন্দর ব্যক্তিত্ব আর মেধা । স্বভাবতই স্কুল লাইফ থেকেই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তিয়াসা । ঝড় টা আরও প্রবল হয় , কলেজে এসে । প্রেম প্রস্তাবের সংখ্যা ও বাড়তে থাকে । সবার কাছে এমন বিশেষ হয়ে ওঠাটা কিছুটা অহংকারেরও জন্ম দেয় । তিয়াসার মধ্যেও সে রকম একটা বোধ কাজ করত । কলেজ লাইফ শেষে ক্যাম্পাসিং এ চাকরি পায় তিয়াসা । সবকিছু বেশ ভালোই চলছিল । কিন্তু জীবন যেমন অপ্রত্যাশিত তেমনই কঠোর । যখন প্রথম ক্যান্সার ধরা পড়ল তখন হইচই কিছু কম হয় নি । অজস্র ফোনকল , বন্ধু বান্ধবদের বাড়ি আসা , সহমর্মিতা ইত্যাদি নিয়ে যেন একটা আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল । কিন্তু এ সবই বড় সাময়িক । সবাই ফিরে গিয়েছে নিজের বৃত্তে । নিয়মিত খোঁজ আর কেউ তেমন নেয় না । সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ মাঝে মাঝে শারীরিক অবস্থা সম্বন্ধে খোঁজ খবর নেয় । নিজের রূপ নিয়ে অহংকার টাও কেমোর আঁচে পুড়ে গিয়েছে । একপ্রকার ডিপ্রেশনেই চলে গিয়েছিল তিয়াসা । সব উন্মাদনাই সাময়িক । আজ উপলব্ধি করতে পারে তিয়াসা । তারপর কোত্থেকে এ ছেলেটা এল ! সব কিছু জেনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
কথা বলে তিয়াসার সাথে । কত ধরনের গল্প প্রেম , পলিটিক্স , সাহিত্য প্রায় সর্বক্ষেত্র জুড়েই চলে আড্ডা । ছেলেটার জ্ঞান নেহাৎ মন্দ নয় । যে কোন বিষয়েই দিব্যি কথা বলা যায় ।
“ কি কথা বলছ না যে !”
বর্তমানে ফিরল তিয়াসা ।
“ না এমনি । বিকেলে থাকবে তো ! এখন একটু ঘুমোব ।”
তিয়াসা ল্যাপটপ টা বন্ধ করে বালিশের পাশে রেখে দিল । মা দেখলে বকাবকি করবেন । ব্রতের কথা বড় মনে পড়ে তিয়াসার । সম্পর্কটা আর এগোল না । সে ত জানে তিয়াসার অসুস্থতার কথা । একবারও খোঁজ নেয় নি । মাঝে মাঝে ওর প্রোফাইল খুলে ওর ছবি দেখে তিয়াসা । আমেরিকায় গিয়ে বেশ মজায় দিন কাটাচ্ছে সে । বিয়েও করেছে । ব্রতের অতিরিক্ত পজেসিভনেস আর ভালো লাগছিল না তিয়াসার । একটু একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছিল । ব্রতের কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল তিয়াসা ।
ঘুম থেকে উঠেই অভ্যাসবশত ল্যাপটপ টা খুলল তিয়াসা ।
“ কি ঘুম হল ! উঠলে পিং করো একবার ।”
ছেলেটার সারাদিন কোন কাজই কি নেই ! তিয়াসা উঠে বসল । কাল থেকে তো আবার কিছুদিনের জন্য যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে । আর কেমো নিতে ভালো লাগে না তিয়াসার । যন্ত্রণা হয় খুব । সবাই বলে তিয়াসা ভালো হয়ে যাবে । তিয়াসার আজকাল আর বিশ্বাস হয় না । ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে যে ভেতর টা শেষ হয়ে যাচ্ছে । চোখের জল মুছল তিয়াসা ।
“ কি রে মা , উঠে পরেছিস । ওষুধ টা নিয়ে আসছি ।”
মা এর কড়া নজর ।
“ একটু বোস না !”
“ কি রে ! তু কাঁদছিস ।”
“ আমি আর বেশিদিন বাঁচব না । তাই না মা !”
তিয়াসা কে জড়িয়ে ধরলেন মা ! মুখে বললেন বটে সব ঠিক হয়ে যাবে তবে নিজেও জানেন যে তিয়াসা খুব একটা ভুল বলে নি ।
২
আবার বম্বে যেতে হবে তিয়াসাকে । পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে । শরীরটাও ভেঙে গিয়েছে অনেক টা । এবারের কেমো টা নেওয়ার পর থেকেই কেমন যেন বিশ্বাসঘাতকতা করল শরীর টা । আজকাল সারাদিন ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে । মৃত্যুভয় তীব্রতর হচ্ছে ।
“ আমি ভালো নেই জানো । তুমি কোথায় ! দুদিন ধরে অনলাইন হচ্ছ না যে ! এবার কিন্তু আমি রেগে যাব ! ” কোন প্রতিক্রিয়া এল না । একেই শরীরের এই অবস্থা তার ওপর বিনায়কও অফলাইন । এই ক মাসে বিনায়কের ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে তিয়াসা । তবে কি বিনায়কের প্রেমে পড়ে গেল তিয়াসা ! ধুর কাউকে না দেখে প্রেমে পরা যায় না কি ! তবে ছেলেটা খুব ভালো কথা বলতে জানে ! শুধু কি তিয়াসার সাথেই চ্যাট করে ও , না কি অন্য আরও মেয়ের সাথে কথা বলে ! নিশ্চয় বলে । নইলে প্রোফাইল টা এমন রহস্যজনক বানিয়ে রেখেছে কেন । না আছে কোন ছবি , না আছে নিজের সম্বন্ধে কিছু লেখা ।
“ কোথায় তুমি !”
এইবারও কোন উত্তর নেই ।
মাঝখানে বাকি দুটো মাত্র দিন । একদম যেতে ইচ্ছে করছে না মুম্বই তে । এবার হয়ত আর ফেরা নাও হতে পারে । বহুদিন ডায়েরি লেখা হয় না তিয়াসার । এককালে নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যেস ছিল । অনেক অভ্যাসের মত এ অভ্যাসও নির্বাসিত হয়েছে । ডায়েরিটা খুলে তিয়াসা লিখল “ শেষের কদিন । ” বিনায়ক নেই । কারোর কথা বলবার সময় নেই । অথচ কথা বলে ইচ্ছে করছে খুব । ডায়েরি তেই তিয়াসা লিখতে থাকল মন খারাপের গল্প ।
দুদিন বাদে অবশেষে উত্তর দিল বিনায়ক ।
“ আরে রাগ কোরো না প্লিজ । আসলে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম । সে এমন জায়গা যেখানে নেট কানেকশন প্রায় নেই । তাই উত্তর দিতে পারিনি ।” মন প্রফুল্ল হলেও কোন উত্তর দিল না তিয়াসা ।
“ রাগ করে থেকো না ! তোমার অভ্যাস আর বদলাল না ।”
আগে হলে তিয়াসা রাগ টা ধরে রাখত । কিন্তু এখন আর পারছে না ।
“ তুমি কি গো ! তুমি জান আমার এই অবস্থা , জানতেও তো চাইলে না আমি কেমন আছি !”
“ আমি জানি তুমি ভালো নেই ! দুদিন বাদে মুম্বই যাচ্ছ । আমি সবই জানি ।” অত্যন্ত অবাক হল তিয়াসা । বিনায়ক আসলে কে ! ও এত সব জানল কি করে ।
“ তুমি কে বল তো !”
“ বিনায়ক ! “
“ আসলে কে তুমি ! দেখ আর নাটক করো না । আমি একদম ভালো নেই । হয়ত মুম্বই থেকে আর ফিরব না ! প্লিজ বল !”
“ আমি বিনায়ক , তবে তোমাকে আমি চিনি । তুমি আমাকে চেন না । তোমার জন্য অনেকেই তো পাগল ছিল । ধরে নাও আমি সেই পাগল দের ই একজন । আর প্রশ্ন করো না । প্লিজ ।”
“ আমি তোমাকে সত্যি চিনি না ? ”
“ না !” হতেই পারে বিনায়ক আশেপাশেই থাকে । হয়ত কখনও তিয়াসা কে পছন্দ করত ! তবে সে যেই হোক কোথাও যেন একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে । হতে পারে ভার্চুয়াল , কিন্তু যথেষ্ট দৃঢ় ।
৩
স্বাভাবিক ছন্দেই আবার চলতে লাগল দুজনের কথা। কিন্তু আজকাল আর শরীর টা সায় দেয় না তিয়াসার । টানা কথা বলতে পারে না বিনায়কের সাথে । তবে বিনায়ক যেন সারাক্ষণ বসেই থাকে তিয়াসার জন্য ।
“ তুমি আমাকে বিয়ে করবে !”
“ মানে !”
তিয়াসা বুঝল অস্বস্তি হচ্ছে বিনায়কের । আরেকটু মজা করলে মন্দ হয় না । “ কেন ক্যান্সার হলে কি বিয়ে করা যায় না ! “
“ ভালোবাসার জন্য এত নামের কি দরকার ! “
“ তুমি ভালোবাস আমায় !”
“ এত দিন ধরে আমি কি করছি এখানে ! ” বিনায়কের উত্তর পেয়ে হঠাৎ কেমন হারিয়ে গেল তিয়াসা । ভালোবাসা এত সহজ ! হয়ত তাই , এতটাই সহজ । তিয়াসা কি ভালবাসে বিনায়ককে !
“ আচ্ছা তোমার জানতে ইচ্ছে করে না , আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না !”
উত্তর দিতে বিন্দুমাত্র দেরি করল না বিনায়ক “ সেটা জানাটা অপ্রয়োজনীয় । ” বিনায়কের এমন সহজ সরল কথা গুলোতেই মন ভরে যায় তিয়াসার । ওর সাথে আগে পরিচয় হলে কি ভালোই না হত ।
ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে । আর কিছু করা সম্ভব নয় । বেশ বুঝতে পারছে তিয়াসা শেষের সে দিন খুব দূরে নয় । শেষটা মুম্বই এ না হয়ে শিলিগুড়ি তে হলে ভালো হত । বেড থেকে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে তিয়াসা । প্রচণ্ড যন্ত্রনায় চিৎকার করতে ইচ্ছে করে । বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না সে । কখন যে দিন আর কখন যে রাত হয় ! মা , বাবা দুবার করে নিয়মিত আসেন । মা এখন আর তিয়াসার চোখের দিকে তাকাতে পারেন না । সব কিছু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলেই ভালো । বিনায়কের কথা খুব মনে পড়ে , ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে তিয়াসার । এভাবে নিঃস্বার্থ ভাবে তো কেউ ভালোবাসেনি আগে । চোখ ক্রমশ বুজে আসছে , শরীর জুড়ে যেন বহ্নিশিখা । নিশ্বাস আটকে আসছে তিয়াসার ।
খবর টা পেয়েছে ব্রত । যদি মৃত্যু পরবর্তী জীবন বলে কিছু থাকে , তবে তিয়াসা নিশ্চয় জেনে গিয়েছে ব্রত আর বিনায়ক অভিন্ন । নিশ্চয় রাগ করবে না ও । ব্রত তো খারাপ কিছু করেনি । তিয়াসাই তো ব্রতের সাথে থাকতে চায় নি , দুটো পথ আলাদা হয়ে গিয়েছিল । কিছু ভালোবাসা নিঃশর্ত থাকে । যেমন ছিল ব্রতর । বিচ্ছেদের পর সেই অনুভূতি টুকু থেকে গিয়েছিল । ব্রত যখন তিয়াসার ক্যান্সারের খবরটি পেল তখন সে আমেরিকায় । ফেরা হয়ত সম্ভব ছিল না । কিন্তু দূরে থেকেও তো সাহায্য করা যায় । শেষ কমাস তিয়াসার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল ব্রত । শুধু মাত্র পরিচয়টা পালটে দিয়েছিল ব্রত , যা মেজাজ ছিল তিয়াসার । সঠিক পরিচয় টা জানলে নিশ্চয় খুব রাগ করত । তবু বিনায়ক তিয়াসার শেষ সময়ের একমাত্র আশ্রয় । একজীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য সে যথেষ্ট ।