“Religious Process” – বইয়ের আলোচনায় অর্জুন দেব সেনশর্মা

অর্জুন দেব সেনশর্মা একজন গবেষক, দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং লেখক। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি অজানা এই ব্রহ্মান্ড, মানব জীবন, ধর্ম আর দর্শনকে নিরুঙ্কুশভাবে খুঁজে চলেছেন।

অধ্যাপক কুণাল চক্রবর্তীর বঙ্গীয় পুরাণগুলি বিষয়ে ২০১৮ তে প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রকাশ-এ বিখ্যাত গবেষণা বিষয়ে কতিপয় আপত্তি

একটি “সেলিব্রেটেড” বই পড়ে প্রথমে হৃৎকম্প পরে, কম্প দিয়ে জ্বর ছাড়ল।
আমি কিন্তু কুণাল চক্রবর্তীর ২০০১ সংস্করণ পড়িনি। আমার বাড়ীতে যারা যাতায়াত করে, তা তারা জানে।পরে কোনো তরুণ এমন ভাব করছিলেন, যে কুণালবাবুর বইটি পড়লেই আত্মসন্তুষ্টি হারাবো।
তা হারাতেই শুরু করছিলাম। তিনি স্বনামধন্য ঐতিহাসিক। পাতা উল্টিয়েই দেখি, এ তো আমিও একই সিদ্ধান্ত বহুজায়গায় করেছি।
ভাবলুম, গেল, আমার বই। ওঁর কাজ ২০০১ এ।
পরে দেখলুম প্রাথমিক যে উপপাদ্যগুলি উনি এবং আমি করেছি, সুস্থ মানুষ মাত্রেই তা করবে। কিন্তু ওঁর কাজ এবং আমার কাজ উপসংহারের ফিল্ড আলাদা।
ফলে চিত্তে একটু আত্মপ্রসাদ লাভ হল।
ওঁর যে সিদ্ধান্ত এবং আমি ওঁর বই না পড়েও যে সিদ্ধান্ত করেছি – পালরাজ্যে বৌদ্ধদের থেকে হিন্দুরা ঢের সুবিধেতে ছিলেন।
এবং উনি বলছেন, বৌদ্ধতন্ত্রকে হিন্দুব্যবস্থা (আসলে Brahmanical attitude to tantras)র সঙ্গে সন্ধি করতে হয়।
আমি যে দার্শনিক সূত্রটি প্রয়োগ করেছি, উনিও সেটিকে উদ্ধৃত করেছেন, কিন্তু বাড়াননি বা তা থেকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আসেননি।
এছাড়া, ঠিক আমার মতই তিনি একেবারে স্বীকার করে আদিশূরকে এড়িয়ে গেছেন, ভবদেব-প্রসঙ্গে হরপ্রসাদের মতকে আমার মত স্পষ্ট না হলেও, ওভাররুল করেছেন।
আমরা কেউই কারুর কাজ দেখিনি। আমার বই ২০১৫ তে বেরোয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক যখন একই কথা বলেন, তখন আত্মতুষ্টি ঘটে।
আমি পূর্বেই সিদ্ধান্ত করেছি, পরে অন্যকে তার সমর্থন করতে দেখেছি, যারা আমার আগেই তা লিখেছেন, এটি নিয়ে চারটি হল।
১. শশিভূষণ দাশগুপ্ত – ধর্মমঙ্গল। (একটি সিদ্ধান্ত আমি নিজেই করেছিলাম। পরে ওঁর সমর্থন – আমার গ্রন্থে পাদটীকায় সংযোজিত। থিসিসে ছিলনা)
২. মহেশ্বর দাস – পৌরাণিক / লৌকিক দেবতা। (সিদ্ধান্ত আমার পূর্বেই করা। পরে ওঁর মত – এটি আমার গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লিখিত। কাজের পরে দেখেছি।)
৩. জয়দেব গাঙ্গুলী শাস্ত্রী – পৌরাণিক ধর্মসূত্রের ও স্মার্ত ধর্মসূত্রের বঙ্গীয় পরম্পরায় দ্বৈধ। (আমি নিজের সিদ্ধান্ত থিসিসেই করেছিলাম। পরে আমার মাস্টারমশাইর মত, প্রকাশের সময়ে গ্রন্থমধ্যে উদ্ধৃত। কাজে ছিল না)
৪. এবং খুবই অংশত কুণাল চক্রবর্তী।…. পরের সংস্করণ বেরোলে তুলনীয় বলে যোগ করব।
তা বেশ। আমার আত্মসন্তুষ্টিই বাড়ল। ২০১৮ ভারতীয় সংস্করণ। প্রকাশের পর প্রথম সংস্করণ। আমার বইয়ের পরে।
……………
অধ্যাপক কুণাল চক্রবর্তী তাঁর গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় অবধি যে প্রজ্ঞার লক্ষণ দেখিয়েছেন, তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে তা থেকে ভ্রষ্ট হয়েছেন, বলছি না, কিন্তু সূক্ষ্মতা হারিয়েছেন।
অনেক কথাই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দুটি বিষয় আমি প্রথমেই বলে রাখতে চাই। প্রথমত তিনি সাংখ্য ও যোগ এবং কিছু অধিক পরিমাণে বৈদিক অদ্বৈতধারণার সংযোগে তন্ত্রের দার্শনিক ভিত্তি রচিত হয়েছে, তা ধরতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবেই, তন্ত্র সম্বন্ধে সচেতনতা থাকলেও তন্ত্রের প্রকৃতি যে ফেনোমেনোলজিকালি সাংখ্যের প্রকৃতির থেকে পুরোটাই আলাদা তা তিনি বোঝেননি। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই মঙ্গলকাব্যের আখ্যান অংশে অন্টোলজিকাল পুরুষ – প্রকৃতির দ্বৈরথ যে ফেনোমেনোলজিকাল প্রকৃতির অর্থাৎ শাক্তাদ্বয়ে পৌঁছোয়, তা অধ্যাপক চক্রবর্তীর পক্ষে একেবারেই না বোঝা থেকে গেছে। ফলে তিনি সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতি আর পূর্বদেশের(?) দেবীবিষয়কপুরাণগুলির দেবীদের প্রকৃতি-স্বরূপ নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা অনভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।
দ্বিতীয়ত, তিনি ইতিহাসবিদ্যায় কী করেছেন? আমি তো তা করেইছি, তবু বাঙলা সাহিত্যের নির্বোধ, মূঢ়, অশিক্ষিত ইতিহাসবইগুলি মাকু – ঐতিহ্যে যা বলেই যাবে, তাকে তিনিও গোড়া থেকে প্রথমেই কেটে দিয়েছেন। তা বুঝে নিতে হবে। সেটি কী? তুর্কী বিজয়ের সঙ্গে মঙ্গলদেবতাদের কোনো সম্পর্ক নেই।কিন্তু তিনি পূর্বী পুরাণগুলিতে প্রকটিত দেবীদের উৎসকে, হিন্দু-বৌদ্ধযুগ অবধি পিছিয়ে নিয়ে গিয়েও, হিন্দু তন্ত্র ও বৌদ্ধতন্ত্রের মূল পার্থক্যটি আমার মতই আচার্য শশিভূষণ দাশগুপ্তর থেকে গ্রহণ করেও, এই দেবীদের সম্ভাব্য পূর্ব উৎসকে চিহ্নিত করতে গিয়ে বৌদ্ধতন্ত্রে বা সমান্তরাল হিন্দু তন্ত্রে কিম্বা ভাষাতাত্ত্বিক দিক দিয়ে এপ্রোচ করলেন না কেন, তাই আমাকে আশ্চর্য করল এবং বলা ভালো বিষম স্বস্তি দিলো। মূলত হিন্দু, বৌদ্ধ আততির সঙ্গে তৃতীয় চতুর্থ অধ্যায়ের কোনো সম্পর্ক পেলাম না।
কালকেতুর কাহিনিকে তিনি unambiguously অন্ত্যজ উৎস বললেন,কিন্তু কালকেতু নামটিই যে unambiguously তৎসম,এবং শিববাচক এ তিনি দেখলেন না? ফলে তুর্কিবিজয়ের ভ্রম থেকে তিনি মনসা, চণ্ডীকে মুক্তি দিয়েছেন বটে, কিন্তু হিন্দু – বৌদ্ধযুগে তাঁদের বিবর্তনের কোনো ইতিহাস তিনি আঁকতে পারেননি, ফলে abrupt করেই রেখে দিয়েছেন। তিনি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ, তিনি বুঝলেন না, পুরাণকে নিত্য ধরা হয় কেন? সে আত্মপ্রকাশ যবেই করুক, তার মধ্যে যা প্রাচীন এবং নবীন থাকবে, সবই কোনো না কোনোভাবে একবাক্যতার অধীন হবে।
ভারতীয় ঐতিহাসিকরা দর্শন পড়েন না। দার্শনিকরা ইতিহাস পড়েন না। ফলে যথাক্রমে একদল মেটাফর ভেঙে এগোতে পারেন না, আরেকদল মেটাফর বোঝেন কিন্তু বিবর্তন ধরতে পারেননা। এর থেকে মুক্তির উপায় একমাত্র আর্কিটাইপাল সমালোচকরা করতে পারেন, যাঁরা Dianoia এবং Mythos অর্থাৎ দর্শন ও আখ্যানকে পরিপূরকে রেখে পড়তে জানেন।
মঙ্গলচণ্ডী প্রসঙ্গে যথারীতি বৃহদ্ধর্ম এবং ব্রহ্মবৈবর্তের দুটি শ্লোক তিনি উদ্ধার করেছেন। দুটি শ্লোকেরই আশ্চর্য সাদৃশ্য আছে।এবং অধ্যাপক চক্রবর্তী সর্বসাধারণের যে ভ্রম সেই ভ্রমেই নিপতিত হয়েছেন। দুটি শ্লোকেই বেদাচারের বিপক্ষে লোকাচারকে ফলপ্রদ বলা হয়েছে। এবং শ্লোকদ্বয়ে না বলা হলেও, তিনি এই লোকবাদকে এই দেবীপূজার যথা চণ্ডী, মনসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করেছেন। তা করুন, কিন্তু এই লৌকিক মানে কী? অন্ত্যজ? লোয়ার কাস্ট?মানে, সাহিত্যের অধ্যাপকরা যাদের ফোক বানিয়ে ভোটের তাসে বাজি ধরেছেন? তা তো নয়।
দুটি শ্লোকেই বেদের বিরুদ্ধে লৌকিক রাখা হয়েছে। বেদের বিরুদ্ধে লৌকিক কে? লোকবাদ বলতে বিদ্যাপতি কী বোঝান?লোকধর্ম বলতে কী বোঝানো হত? শ্রুতির বিরুদ্ধে লৌকিক স্মৃতি। স্মার্তর বিরুদ্ধে লৌকিক স্ব-পৌরোহিত্যবাদী তন্ত্র।অধ্যাপক চক্রবর্তী ভাবলেন না, স্মার্ত পুরাণ নিজের টেক্সটে যাকে সমর্থন করবে সে সে কখনো স্মার্ত পুরাণ ব্যতিরেকে আর কিছুই হতে পারেনা। ঐ পুরাণই লৌকিক। দুটি কারণে লৌকিক। প্রথমত লোক-অনুরোধে সেখানে শ্রুতিধর্মকে সরল করা হয়, দ্বিতীয়ত একং সদবিপ্রাঃবহুধা বদন্তি – ধরে বিবিধ হ্যাঁ লোকদেবতাকৃত্যকে (পৌরাণিক / তান্ত্রিক / যোগাচারীদের দেবতাকে) এপ্রোপ্রিয়েট করা হয়।
অধ্যাপক চক্রবর্তী, মঙ্গলার উল্লেখকে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে কোন বিচারে প্রক্ষিপ্ত বললেন তাতো বুঝলামই না, এবং মঙ্গলচণ্ডীর স্বরূপবিচারে নিরতিশয় অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।
পরের পোস্টে যাওয়ার আগে, ঐতিহাসিকদের পরময়াশ্রয় গোপেন্দ্র (কেষ্ট) কৃষ্ণর একটি অবসার্ভেসান যেটি আমাকে হিইই হিইই করে হাসায় সেটি বলে বিদায় নিই।
গোপেন্দ্রর এক লৌকিক দেবী বিশালাক্ষী। খুব নাকি লৌকিক।হুগলি, হাওড়ায় তাঁর বর্ণনা দিয়ে ঐ গোপেন্দ্রকেষ্টর কী আত্মপ্রসাদ।
অথচ কাশীর পীঠাধিষ্ঠাত্রীদেবী কে? বিশালাক্ষী।জ্ঞানক্ষেত্র অবিমুক্তক্ষেত্রের পীঠাধিষ্ঠাত্রী folk বটেই, কিন্তু সিপিএমী ফোক হতে পারে না।
কারণ, এপ্রোপ্রিয়েসান আমরা যতই বলি, একটা মূল কথা বলে রাখি। একশো বছর আগেও ব্রাহ্মণগণ, কায়স্থবাড়ীর দুর্গাপুজোয় নমস্কার বা প্রসাদ গ্রহণ করতেন না। কায়স্থরা আবার তাঁদের নিচের জাতের বাড়ীর প্রসাদ নিতেন না।কারণ, যজমানের জাতি, গোত্রই দেবীর জাতিগোত্র।
ফলে এপ্রোপ্রিয়েসানের তত্ত্ব প্রয়োগেও কাল নির্ণয়ে এবং গোষ্ঠী নির্ণয়ে বিশেষ সতর্কতা দরকার। চক্রবর্তী সেই বিষয়েও সচেতনতা দেখাতে পারেননি।
ভারতীয় উপমহাদেশে এবং তৎসংলগ্ন পশ্চিমে এবং উত্তরপশ্চিম পার্থিব ভূমিতে জনজাতির বিমিশ্রণ, বিস্ময়কর। আমাদের অনেকেরই বন্ধু, আজ অবধি আমি যাঁকে একটি কথাও ভুল বলতে দেখিনি, তিনি আমাকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশের আগে ও পরে জনজাতিগুলির মিথ সম্পর্কে আধুনিকতম তথ্যাদি নিরন্তর আপডেট করেন, সেই সৈকত চক্রবর্তী নিষাদ, কিরাত, ম্লেচ্ছ এইসব জনজাতির জেনেটিক কোড,ভাষাতাত্ত্বিক লক্ষণ এবং ধর্মতাত্ত্বিক রিচ্যুয়ালগুলি সম্বন্ধে মিথ ভেঙে যা দেখান, আমি প্রায়ই লক্ষ করি, সাধনতাত্ত্বিক দর্শনগুলির বিবর্তনের সঙ্গে তা আশ্চর্য সমান্তরালতা রক্ষা করে চলে। ফলে, আমি নিজের সিদ্ধান্তগুলিকে তাঁর আলোকে আরো সুপ্রতিষ্ঠা দিতে পারছি।
এই কথা অনস্বীকার্য যে অন্তত পক্ষে খ্রিস্টপূর্ব বারোশোর আগেই কিরাত ইত্যাদি অনার্যবাচী জনজাতিগুলির সঙ্গে আর্যবাচীদের মিশ্রণ হচ্ছিল। স্মৃতিতে যে জাত্যুৎকর্ষের বিধান আছে, বা বিপ্রাচারী হওয়ার জন্য উচ্চবর্ণ – জাতি নির্দিষ্ট হয়েছে, সেগুলির বিবরণ আরো প্রাচীনযুগের বিমিশ্রণের প্রকার, পরিমাণ এবং জেনেটিক কোডের নৈকট্যের উপরে নির্ভর করেই হয়েছে।
বেদের মন্ত্রভাগে শক্তির প্রাধান্য কম,এও একটি বাহিরের তথ্যমাত্র। বেদের রহস্যভাগ সব থেকে জটিল ও গুহ্য। ফলে মন্ত্রভাগের রহস্যমার্গে শক্তির গুরুত্ব, সাবিত্রীক ব্রাহ্মণেরও অজানা থাকার কথা নয়। শিব ও শক্তির যুগনদ্ধ সাধনার মধ্যে অনার্যবাচী উৎস যদি স্বীকার করেই নি, বেদবাহ্য জনজাতিগুলির সঙ্গে সহচারিতা এবং সহবাসের ফলে তার মূল অংশটি অর্থাৎ দ্বৈত সাধনা থেকে সামরস্যময় অদ্বয়উপলব্ধি অবধি যাত্রা, বৈদিক মন্ত্রভাগে বা কর্মকাণ্ডেই যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। অথর্ব সংহিতাতেই কিরাতরমণী দৈবীপ্রজ্ঞার উল্লেখ আছে। কিরাতদের মনু বলেছেন, ব্রাত্যক্ষত্রিয়। ঘুরিয়ে পড়ুন। ব্রাত্যক্ষত্রিয় মানে তাঁদের প্রকারান্তরে আর্যবৃত্তেই প্রবেশ করানো হল। ফলে কিরাতকে মনু consult না করে, unambiguously lower caste এবং তার দেবতাকে পুরাণ এপ্রোপ্রিয়েট করছে, এই মতেই তো, একটা অতিসূক্ষ্ম ব্রাহ্মণ্যবাদ ধরা যায়। একলব্য কিরাত। তাঁর পিতার নাম হিরণ্যধনু। অনার্য নাম তো নয়। কিন্তু ব্রাত্য, তাই গুরুকুলে প্রবেশ্ পাননি। কায়স্থরা সংস্কৃত কলেজে পড়তে পেতেন না। কিন্তু তাঁদের প্রতাপ কম ছিল??
মহাভারতে কিরাতরাজের একাধিকবার উল্লেখ আছে। স্বয়ং মহেশাণী পার্বতী কিরাতী বেশে অর্জুনের কাছে দেখা দিয়েছেন।আরো পরবর্তী কালে বাণে এবং দণ্ডীতে তন্ত্রসংশ্লিষ্ট চণ্ডীর স্পষ্ট উল্লেখ আছে। চণ্ডী নামটির ইতিহাস প্রাচীন এবং বহুস্তরান্বিত। মুণ্ডারি জনজাতির থেকে চণ্ডমারী – চণ্ডশক্তি চণ্ডীর যদি উদ্ভব হয়ও তবুও আসলে শিব – শক্তির দ্বৈতকে ছিন্ন করেই যে তিনি অদ্বয়স্বরূপা চণ্ডী / চণ্ডিকা হিসেবে শ্রীশ্রীচণ্ডিতে গৃহীত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সুতরাং চক্রবর্তীর মতানুসারে খ্রিস্টীয় অষ্টমের পরে যে লোকালিটি থেকে মঙ্গলচণ্ডীর উদ্ভব,তাকে অস্বীকার করার জন্য, নানা প্রমাণ দাখিল করা চলে।
১. তিনি মঙ্গলার উল্লেখকে চণ্ডীতে প্রক্ষিপ্ত বলেছেন। কেন বলেছেন,কোনো কারণ দেখাননি। কিন্তু তিনি লক্ষ করেননি দুটি তথ্য। যথা ক) দেবী সর্বমঙ্গলা একজন ‘নিত্যাদেবী’। নিত্যাদেবীগণ, তান্ত্রিকী তিথিবিশেষে পূজ্যা। খ) পশ্চিমবঙ্গের একটি বিখ্যাত উপপীঠের মঙ্গলচণ্ডিকার মন্দিরের নাম – সর্বমঙ্গলা মন্দির। অপিচ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে এই উচ্চারণে যে মঙ্গল শব্দটি শিববাচক ফলে, সমাসে এখানে সশিবশক্তিকে স্মরণ করা হল, তাও চক্রবর্তী গুপ্তবতীটীকা খুললেই দেখতে পেতেন।ঐতিহাসিকরা সংস্কৃত টেক্সট নাড়বেন, কিন্তু টীকা বুঝবেন না – এ এক ধ্বংসাত্মক প্রবণতা।
২. কালকেতুর চণ্ডী, আমি বিস্তারিত আলোচনা করে দেখিয়েছি (হি.বা.কা।) অবশ্যই কৈরাতচণ্ডী। তিনি যোগিনীপীঠে অর্থাৎ কামরূপে কৈরাতমতে পূজ্যা। অর্থাৎ তা যে প্রকৃতিতে তান্ত্রিকী তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এই চণ্ডীর বিশেষ লক্ষণটি কী?
পশুরক্ষা। শ্রীশ্রীচণ্ডীর অন্তর্গত চণ্ডীকবচে দেখুন দেবীর বিভিন্ন এপ্রোপ্রিয়েসানের নামাবলীর মধ্যে একটি চকিত উল্লেখ – ‘পশুর্মে রক্ষেৎ চণ্ডিকা’। শ্রীশ্রীচণ্ডী খিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠশতকের মধ্যেই সম্পূর্ণ। ফলে মার্কণ্ডেয়পুরাণ সাক্ষ্যে এই বিলক্ষণ লক্ষণে কখনোই পশুপালয়িত্রী কৈরাতচণ্ডীকে পূর্বদেশের পুরাণের ফল বলা যায় না।
অধ্যাপক কুণাল চক্রবর্তী প্রাচীনভারতীয় ইতিহাসের দিগবিজয়ী অধ্যাপক। তিনি কালিকাপুরাণ নাড়িলেন, চাড়িলেন, হাড়িঝি চণ্ডী শুনিলেন, জানিলেন, তিনি একবার বিন্ধ্যাটবীভ্রমণ করলেন না। আমি সালাতোর উল্লেখ করে দেখিয়েছি কিরাতদের প্রব্রজন পূর্ব থেকে পশ্চিম, আসাম, মধ্যভারত এবং পশ্চিমভারতে পাহাড়ের সানুদেশ জুড়ে হয়েছে। প্রত্যেক জায়গাতেই ব্রাত্যক্ষত্রিয় কিরাতসংশ্লিষ্ট তন্ত্রপূজিত চণ্ডিকার পীঠ হয়েছে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা সপ্তশতীচণ্ডীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেছে। এবং শ্রীশ্রীচণ্ডীর চরিত্রত্রয় ত্রয়ীসংহিতার শক্তিভাগকে উন্মোচন করেছে।
চণ্ডীর তিনটি চরিত্র কীভাবে আর্কিটাইপালি মঙ্গলকাব্যের তিনটি আখ্যানে বিবর্তিত হয়েছে, তাও খুবই কৌতূহলোদ্দীপক।(বহুদিন আগেই তা দেখিয়েছিলাম।)
৩. তথাপি মঙ্গলচণ্ডীর সঙ্গে মঙ্গল বা মঙ্গলবারের কী সম্পর্ক, তা অতিগুহ্য। ভারতীয় ইতিহাসের ধর্মচর্চা নিয়ে কাজ করতে গেলে সত্যই বেদাঙ্গসমূহের একটি অভ্যাস থাকা দরকার।
অধ্যাপক চক্রবর্তী কালিকাপুরাণ পড়লেন। একটু ভবদেব, হয়তো রঘুনন্দনও পড়লেন, কিন্তু কীই যে বুঝলেন, তা তিনিই জানেন। রঘুনন্দন স্পষ্টত কালিকাপুরাণ প্রমাণ দিয়ে দেবী ললিতকান্তাকে মঙ্গলচণ্ডীর উপর আপতিত করেছেন। ললিতকান্তার পীঠ, কামাক্ষ্যায়, নীলাচলপর্বতে, তার অদূরে ললিতা ও কান্তা নদীর সঙ্গম। কামাক্ষ্যা পীঠের উল্লেখ, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের এলাহাবাদ লিপিতে আছে বলে দীনেশচন্দ্র সরকার লিখেছেন, ওখানে খাসীদের প্রাচীন তীর্থ ছিল, এইসব চক্রবর্তীর নিশ্চয় জানার কথা।
এবং এও জানার কথা,রঘুনন্দন নিবন্ধকার হিসেবেই পূর্ব-ঐতিহাসিক। তিনি দেবী মঙ্গলচণ্ডীর অর্থাৎ ললিতকান্তার বীজটি কেবল উল্লেখ করেননি। কিন্তু গোবিন্দানন্দ বর্ষক্রিয়াকৌমুদীতে দেবী ললিতকান্তার বীজ দিয়ে মঙ্গলচণ্ডিকার দীর্ঘ ব্রতবিধি উল্লেখ করেছেন।
বীজ আমি লিখবনা।ললিতকান্তার আদ্যবর্ণে অনুস্বর যোগ করে যে বীজটি পাওয়া যাবে,সেইটিই তিনি নিয়েছেন। সেইটি তন্ত্রের পৃথ্বীবীজ। পৃথ্বী – ভূমি। এই ভৌমবাধা দূর করে, ভৌমবারে দেবী ললিতকান্তা তুষ্ট হয়ে শেষত ভৌমমায়া বিদীর্ণ করবেন – এইই হল মঙ্গলাসুরের আখ্যান। মঙ্গল, পৃথ্বীর সন্তান – ভৌম। ভৌমদোষই মাঙ্গলিক দোষ।
সেইজন্যই মঙ্গলবারে শক্তিব্রত যে সারা ভারতে প্রচলিত, দিল্লিতে বাস করেও অধ্যাপক চক্রবর্তীর তা গোচরে এল না?মঙ্গলগৌরী ব্রত, উত্তরভারতে, দক্ষিণে পালিত হয়।ফলে মঙ্গল ও চণ্ডিকার যোগ কেবল লোকাল ট্রাডিসন নয়। কোথাও মায়াবীজে, কোথাও পৃথ্বীবীজে তিনি আরাধিতা হন। এবং “যোষিতামিষ্টদেবতা” বলে, তিনি “লৌকিক” এই সিদ্ধান্তটিকেই মিসোজিনির অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায়। তন্ত্রে সক্রিয়শক্তির আরাধনা যোগিনী – যোষিৎগণ করবেন, এ আর আশ্চর্য কী? অশক্তপক্ষে গুরু – পুরোহিত আসতে পারেন। খুল্লনার তো পুরোহিত এসেছিলেন, সম্ভবত স্মার্তপ্রভাবে।
৪. যেটি চক্রবর্তীর থেকে সব থেকে বেশি প্রত্যাশিত ছিল, সালাতুর এবং সুধীভূষণ ভট্টাচার্য যা দেখিয়েছেন, এবং আমি যা আরো বিস্তারিত করেছি, তা তাঁর নিজেরই লেখা উচিত ছিল। বৌদ্ধ তারার মূর্ত্যন্তর নীলসরস্বতীর সঙ্গে শ্রীশ্রী চণ্ডীর আরেকটি এপ্রোপ্রিয়েসান। দুর্গা ও দ্বিতীয় মহাবিদ্যা তারা ও চণ্ডী এবং বৌদ্ধ চুন্দার ঐক্য সালাতোর দেখিয়েছেন। তারার সঙ্গে মঙ্গলচণ্ডীর সম্পর্ক সুধীভূষণ দেখিয়েছিলেন আমি না হয় পরে বৃহন্নীলতন্ত্র উল্লেখ করে, তা আরো প্রতিষ্ঠা করেছি।
তারা যখন ধ্রুবনক্ষত্র, যখন তিনি নিত্য তখন তিনি ধ্রুবা। তখন তিনি বণিকদের সমুদ্রযাত্রার দিগনির্দেশিকা। যখন তিনি কন্যারাশি রূপে উত্তর গোলার্ধে আকাশে প্রকাশমানা তখন তিনি আকাশমার্গে বৈশাখ থেকে আশ্বিন অবধি চঞ্চলা কন্যাকুমারী।
৫. অপিচ বিশ্বসারতন্ত্র প্রকারান্তরে মহিষমর্দিনী ও আখেটক চণ্ডীর আখ্যানকে অভেদতত্ত্ব বলে ইংগিত করেছেন।
৬. শেষ করি মূল তত্ত্বটির উল্লেখ মাত্র করে। প্রাচীনপুরাণ ও নব্যপুরাণগুলির মধ্যের ফাঁক খুঁজে পাওয়া যাবে ভারত ঐতিহ্যের কোষাগার নাথ ছড়াগুলিতে। সেই ছড়াগুলি একটু ঘাঁটলেই মঙ্গলকাব্যের চণ্ডীমার্গ খোলা যায়। কাহিনির অদলবদল হয়, কিন্তু তা উপাস্যতত্ত্বকে যদি জাস্টিফাই করে যায় তবে বুঝতে হবে সাধনতত্ত্বকে বিবৃত করতেই কাহিনিকে বিবর্তিত করতে হয়েছে।সপ্তশতী চণ্ডীর সঙ্গে মঙ্গলকাব্যের সেই অভেদ-ভেদ বর্তমান।
অধ্যাপক চক্রবর্তীর মঙ্গলচণ্ডী বিষয়ক আলোচনা আমি পরিত্যজ্য বোধ করলাম।আজ জ্যৈষ্ঠের মঙ্গলবার।শ্রীশ্রীমঙ্গলা,তাঁর মঙ্গল করুন।
…………………
খুব লক্ষ করে দেখবেন, বৈশাখে পূর্ববঙ্গে, জ্যৈষ্ঠে পশ্চিমবঙেগ,আষাঢ়ে শ্রীহট্টে, শ্রাবণে অশ্বক্রান্তায় যে মঙ্গলকথাগুলি মঙ্গলবারে পড়া হয়, তার কোনোটিই আখেটক উপাখ্যান সহ দেবখণ্ড, বণিকখণ্ড নয়।
এই মঙ্গলাখ্যানটির একটি নৈমিত্তিক স্বভাব আছে। এটি পাঠের একটি বিধি, বিশ্বসার নির্দেশিত মহিষমর্দিনী বা লক্ষ্মীকবচ পরিধানের সময় অথবা আনুষ্ঠানিক চণ্ডীপূজায় দেবীমাহাত্ম্য পাঠের সঙ্গে (দ্রঃমহেশচন্দ্র বিদ্যারত্নকৃত স্মৃতি নিবন্ধ)।
সেইজন্যই আদাবন্তে তান্ত্রিকী আচারের রূপক-আখ্যান হিসেবে, একে লোকাল, লৌকিক এইসব ছেঁদো বিশেষণ দেওয়া অর্বাচীনতা। এবং এও মনে রাখতে হবে, পাই বা না পাই, কুল্লুকভট্ট যখন বলেইছেন তান্ত্রিকীস্মৃতি বিদ্যমান ছিল,তখন বেদের লুপ্ত শাখাগুলি নেই এ বলাও যেমন একপ্রকার ধৃষ্টতা, তেমনই তান্ত্রিকী প্রমাণ আমি পুরাণে দেখলেও, এড়িয়ে যাচ্ছি, হয় চালাকি নয় অন্ধত্ব।
ভারত নিয়ে কাজ করতে গেলে ভারতের Institution এর কাছে যেতেই হবে, নতুবা তার হার্মিনিউটিক(!) বোঝা কঠিন।
এইবার যে ব্রতকথাগুলি মাসে মাসে চলিত, সেগুলিকে আমি এককালে রূপকথার মত ভাবতুম, এবং রূপকথাগুলির ডেসিফারিং আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি। পরে আমাকে সাতিশয় চমৎকৃত করে ডাক্তার Raktim Mukherjee সেইগুলির একটির পর একটি মুখচ্ছদ উন্মোচন করেন।
সেইগুলির সঙ্গে মঙ্গলকাব্যের মত সপ্তশতীর প্রত্যক্ষ যোগ না থাকলেও, তান্ত্রিকী রূপ যে স্পষ্ট রূপকে আচ্ছাদিত, তা অজানা ব্রতকারদের নিপুণতায় সম্ভব হয়েছে।
এইগুলিকে লোকাল ট্রাডিসন বললেও বলতে পারেন, কারণ সীমাবদ্ধ অঞ্চলে তার প্রয়োগ এবং কবির নাম অজানা এমনকী কোথাও কোথাও সেগুলির বদলে, ঐ নৈমিত্তিক মঙ্গলাখ্যানটিও কেউ কেউ পড়েন। এতো গেল মঙ্গলাখ্যান ও ব্রতকথা বিষয়ে।
এইবার পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই পূর্ববঙ্গেও এমনকী স্বয়ং কামাখ্যাপীঠও বিভিন্ন জনজাতির আরাধনাস্থল ছিল। সেই স্থানগুলি পরে এডাপ্টেসানের ফলে পৌরাণিক ও তান্ত্রিক রূপলাভ করে।
জহুরা চণ্ডী, বুলবুল চণ্ডী, ওমুক চণ্ডী, তমুক চণ্ডীতে বঙ্গদেশ আচ্ছন্ন। এমনকী খাসিয়াদের বলিস্থল আজ যোগিনীপীঠ, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের পর থেকে নিত্যষোড়শীর লীলাভূমি – কামরূপ কামাক্ষ্যা।
এইবার যখনই এই থানগুলি তান্ত্রিক বা পৌরাণিক নাম নিয়ে বিধিমার্গে পড়ে গেল, যদি বলেন, স্যান্সক্রিটাইসড হল (আমি বলিনা। আমি বলি স্মার্ত – তান্ত্রিক হয়ে গেল। কারণ তান্ত্রিকী ব্রত বাংলাতেও হয়। বাংলা মানেই লৌকিক এও এক হীনম্মন্যতার বোধ। এই সব কম্পলেক্স মাকু প্রভাব।) তখন আর এগুলিকেও লোকাল বা অজানা রোগের মত অজানা ফোক বলা যাবে না। কারণ তৎক্ষণাৎ এইগুলি পুরাণ-তন্ত্র ধারায় আত্তীকৃত হয়ে গেল।
যেইমাত্র চণ্ডী নামটিই যুক্ত হল, তৎক্ষণাৎ তা মার্কণ্ডেয়পুরাণের ধারায় সর্বভারতীয় হয়ে গেল। যেমন সাব – অল্টার্ণ কানাই, জে এন্যু তে কানহাইয়া হয়ে গেলে, কদাপি আর সাব – অল্টার্ন থাকে না, সে ভারতের প্রতাপান্বিত অলিন্দরাজনীতির ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, তেমনিই চণ্ডী নামটি যুক্ত হয়ে গেলেই সে আর লোক্যাল থাকেনা। উপমহাদেশের হিন্দুর প্রণম্য হয়ে যায়।
যাইহোক, আর কী বলি! এইসব গ্রন্থপাঠে কিছু লিখতে ইচ্ছে করে এই যা।
অধ্যাপক চক্রবর্তী অনেকগুলি অন্য ব্রতেরও বিধান নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমার কয়েকটি যেন আবছা মনে হল, সেগুলির উৎসেও জটিলতা আছে। অত আর সময়ও নেই, ইচ্ছেও নেই।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।