ক্যাফে গদ্যে ঋদ্ধিমা দে

অন্যত্রাণ

সেদিন বিকেল হতে না হতেই আকাশটা কালো করে এসেছিল। আমি তখন আমাদের দরমার ঘরটায় বসে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়া তৈরি করছিলাম। লকডাউনের জন্য পরীক্ষাটাও বন্ধ হয়ে গেল। তবে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, এর জন্য পড়া তৈরি করার আরও বেশ খানিকটা সময় পেলাম।
এইবার দিনের আলো এতটাই নিভে এলো যে বইয়ের অক্ষরগুলো আর ঠিক ঠাহর করতে পারছিলাম না। তাই রান্নাঘর থেকে হেরিকেনটা আনতে গেলাম। ওটা হাতে তুলে নিয়ে আসতে গিয়ে দেখি ওতে তেল নেই। তাই অগত্যা অনেক খুঁজে পেতে একটা মোমের টুকরো জ্বালিয়ে পড়তে বসলাম। মনে মনে ভাবলাম এই মোমটা শেষ হয়ে যাবার আগে আজ পড়াটা শেষ করতে হবে। কাল তো রেশন তোলার দিন। তেলটা তুলে আনতে হবে না।
সবে মাত্র এই পৃষ্ঠার শেষ অক্ষরটায় চোখ পড়েছে কি, একটা দমকা হাওয়া এসে মোমটা নিভিয়ে দিল। চারিদিকে কেমন যেন একটা গা ছমছমে ব্যাপার। তখনও বাবা- মা ক্ষেত থেকে ফেরেনি। একটু ভয় ভয় করছিল। যদিও আমার ভূতে ভয় নেই তবুও কেমন যেন একটা কু গাইছিল মনে। আমার এই ভয় আর একাকীত্ব দূর করতেই আমার ছোট্ট রেডিওটার কাছে গিয়ে বসলাম। রেডিও শুনতে আমার বরাবরই খুব ভালো লাগে। রেডিওর নব ঘোরাতেই শুনতে পেলাম–
” এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় খবর সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে এবং অন্যান্য গাঙ্গেয় ভূমিতে আজ আছড়ে পড়বে আমফান ঝড়। তাই ওইসব এলাকার মানুষদের সতর্ক থাকতে অনুরোধ করা হচ্ছে। খুব শিঘ্রই বাড়তে পারে জলের স্রোত। তাই মাঝিদের….”
রেডিওর এই কথাগুলো শোনার পর আমার ভয়টা যেন আরও চেপে বসলো। হঠাৎই শুনতে পেলাম একটা খটখট শব্দ। চালের দিকে চোখ পড়তেই দেখি বাইরে ঝড়ের হাওয়ায় দুলছে গোটা ঘর। দেখে মনে হচ্ছে চালটা বুঝি এক্ষুনি উড়ে যাবে। এমন দৃশ্য এর আগে কখনও দেখিনি। আমি তাড়াতাড়ি আমার বইপত্র ইস্কুলের ব্যাগে গুছিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়লাম ক্ষেতের দিকে বাবা-মাকে খুঁজতে। ঘরের বাইরে পা রাখতেই দেখি আমাদের বাড়ির ছোট আমগাছটা হাওয়ায় উপড়ে গেছে গোড়া থেকে। আর আমার সবুজ সাথির সাইকেল অমনি উঠোনে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে। সাইকেল ঠিক করতে করতে দূর থেকে কার যেন গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। তাকিয়ে দেখি মাধব কাকা–
” এই মরিসে…! এই মরিসে! এ তো বিরাট ঝড় এইছে! কানাই রে! ও ফুলির মা! ঘরে চল! জল বাড়তিছে। জোয়ার হলো বোধহয়! ঘরবাড়ি সব ভেসি যাবে রে….!”
দেখলাম মাধব কাকার সাথে এদিকেই ছুটে আসছে গ্রামের বাকিরাও। কিন্তু আমার বাবা মা কে এখনও দেখতে পেলাম না। ওরা কোথায় একথা মাধব কাকাকে জিজ্ঞেস করবো ভাবছি কি, একটা বিরাট শব্দ কানে এলো। কিসের শব্দ? এত ভয়ঙ্কর! পেছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের ঘরের চালটা যেন কাক চিলের মতোই উড়ে যাচ্ছে কালো আকাশের পানে।
এরপর যখন চোখ খুলল আমার, আমি তখন একটা পেয়ারা গাছের ডালে ঝুলে আছি। আমার গলা পর্যন্ত কাদা নোনা জল। এক গলা জলে ডুবে থেকেও পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু পরেই কাশি শুরু হলো। সেই কাশি আর থামতেই চায় না। শেষে বাধ্য হয়েই নীচু হয়ে সেই নোনা জলই খেয়ে ফেললাম অনেকটা। আমার পাশের ডালেই কোনোরকমে ঝুলেছিল মাধব কাকা। কাকাকে এবার জিজ্ঞেস করলাম,
— কাকা! আমার বাপ- মাকে তো দেখছি না! ওরা কোথায়?
কাকা তার উত্তরে বলল,
— এই অবস্থায় তোর বাপ মায়ের চিন্তা করিস! তারা কোথায় ভেসি আছে তা কি আমি জানি রে মা! অরা বেঁচে থাকলি কাল দিনের আলো ফুটলি ঠিকই দেখতে পাবি ওদের।
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। তারপর গাল বেয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগলো। মনে হলো আমার চোখের জলে বুঝি জমা জল আরও খানিক বেড়ে গেল। যেদিকে চোখ যায় শুধু জল আর জল। আমাদের ক্ষেত, ঘর কিছুই আর নেই। পুরো গ্রামটাই যেন মাঝ সমুদ্দুর। সেই মূহুর্তে আমার শুধু মনে হচ্ছিল তবে কি এখানেই শেষ আমার জীবন? করোনায় না হোক খিদের জ্বালায় আর জলে পচেই কি শেষে আমায় মরতে হবে? আমার ইস্কুল? পরীক্ষা? দশ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আর কি কখনও যাওয়া হবে না ওই ক্লাসঘরটায়। আর আমার ব্যাগটা? এ প্রশ্নগুলো যেন আমার গলাটা চেপে ধরছিল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
এই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ভোর হয়ে এলো। চারদিকটা দেখে মনে হচ্ছিল ঠিক যেন মৃত্যুপুরী। দূরে বাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখি কারা যেন শুয়ে আছে। আমরা যারা গত রাতে গাছে ঝুলে ছিলাম তারা সবাই হাত ধরে বুক দিয়ে জল ঠেলে এগিয়ে গেলাম বাঁধের দিকে। ওইটুকু বাঁধে এত মানুষ আঁটবে? আমরা যখন বাঁধের কাছাকাছি তখন দেখি চারদিক থেকে গ্রামের সবাই ওইদিকেই এগিয়ে আসছে। সবাই যে কাল রাতটা কেমন করে কাটিয়েছে! জলের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করতে পারছিলাম পায়ের তলায় ফসলগুলো সারারাত কাদা নোনাজলের তলায় থেকে এবারে পচতে শুরু করেছে। ওই জলের ভেতর দিয়েই দেখি চলে গেল কয়েকটা বিষধর সাপ।
বাঁধে উঠে বুঝলাম আমার বাবা- মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ইকবাল চাচা দেখেই বলল,
— এই মরিসে! এরা তো দিকি লোনা জল খেয়ে ফেলিসে! প্যাট চেপে বের করতি হবে এই জল। এ বাবু, ইদিক পানে আয় তো দিকি!
এই বলে ইকবাল চাচা ও গ্রামের আরও অনেকের চেষ্টায় মা বাবার জ্ঞান ফিরলো। এভাবেই কাটলো আমাদের প্রায় বিশটা পরিবারের আরও তিনদিন ওই সরু বাঁধের ওপর। ভিজে কাপড় তার ওপর আরও খানিক বৃষ্টি, মশার কামড়, খিদেতে নাড়িভুড়ি মোচড় দিয়ে উঠছিল।
এরপরেই শুরু হলো আসল সমস্যা। আমার আর ফুলির শুরু হলো ঋতুস্রাব। পেটে খিদে, তার ওপর মাসিকের ব্যাথা। মনে হচ্ছিল প্রাণটা বুঝি বেরিয়ে যাবে।
পাঁচ নম্বর দিন থেকে একে একে আসতে লাগলো টিভিওয়ালা, কাগজওয়ালারা। আর এলো ত্রাণের খিচুড়ি। সবাই কত্তো ছবি তুলল আমাদের। আমাদের মতো গরীবেরা কখনও ভেবেছিলাম, আমাদেরও টিভিতে দেখাবে! ইন্টারভিউ নেবে ওরা! এই তো গেল টিভির কথা।
আর ত্রাণ? কত মানুষ এলো ত্রাণ দিতে। ওই সরু বাঁধে আমাদেরই ঠাঁই হচ্ছিল না, এবার এলো অঢেল খাবার। কত রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক দল এলো। মুড়ি, চিঁড়ে, গুড়, বিস্কুট দিল।
ফুলির বুড়ি ঠাকুমা ওদের জিজ্ঞেস করলো,
— ও বাবারা! তোমরা পুরানো কাপড় আনিছো? নাকি সবই নতুন?
তারা বলল,
— কেন পুরানো কাপড় দিয়ে কি হবে?
ঠাকুমা বলল,
— আমার এই নাতনিদের জন্যি বলছি গো বাবারা! জানো তো মাসিক হলে লাগে! সবই তো আমাদের ভেসি গেছে।
ওরা কেমন না বোঝার ভান করে চলে গেল। অথচ তখন এটাই ছিল তখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ত্রাণ। আমাদের লজ্জা থেকে ত্রাণের একমাত্র উপায়! এছাড়া সে সময় আর কিছুই যেন এত দরকারি মনে হচ্ছিল না।
এরপর এলো আরও কিছু দাদারা। আমি অবাক! এদের ত্রাণসামগ্রীতে এতো কিছু। এরা কি করে বুঝলো আমাদের মনের কথা! এরাই কি তবে ভগবান! এরা খাবার দিল, মশারী, ত্রিপল আর…. আর দিল সেই মহার্ঘ স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।